অপরিকল্পিত নদী খনন, পাঁচ কোটি জলে

আলী আহমদ. জগন্নাথপুর
জগন্নাথপুরের নলজুর নদী অপরিকল্পিতভাবে খননে নদীটি এখন এলাকাবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুফলের বদলে নানা সমস্যার পাহাড় হয়ে দাঁড়াবে এমন আশঙ্কা স্থানীয়দের। ফলে খনন কাজে সরকারি বরাদ্দকৃত ৫ কোটি টাকা জলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে নদীটি খালের ন্যায় করা হচ্ছে। এতে করে বর্ষায় শত’ শত নৌ-যান চলাচলে চরম বিঘœ ঘটবে। হাওরের বোরো ফসল গোলায় ওঠাতেও ভোগান্তি পোহাতে হবে। এছাড়া খননের মাটি পাশে রাখায় বৃষ্টিতে মাটি আবার নদীতেই পড়বে।
এদিকে নদীতে চলমান খননে কাজ শুরু হওয়াতে বৈধ বাসিন্দাদের বসত ভিটা হারানোর ভয়ে কাটছে রাত দিন। অন্যদিকে বহাল তবিয়তে আছেন নদীর দুই পাড়ের অবৈধ দখলদাররা। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় এলাকাবাসী, জগন্নাথপুর সদর বাজার দিয়ে বয়ে যাওয়া নলজুর নদীটি একসময় ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এ নদী দিয়ে মালবাহী বৃহদাকারের নৌকায় ন্যূনতম যাতায়াত ব্যয়ে রাজধানী ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ, শিল্পনগরী ছাতকসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণ্যিজিক এলাকা থেকে সহজে মালামাল পরিবহন করা যেত। নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নদী ভরাট হয়ে শুধু নাব্যতাই হারায়নি, নদীর দুই পাশে গড়ে ওঠেছে অবৈধ স্থাপনা। এরমধ্যে নামে-বেনামে নদীপাড়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে অফিস, দোকান, আবাসিক হোটেল, বাড়ি-ঘর স্থায়ী-অস্থায়ী বিভিন্ন স্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী নদী খননের দাবি জানিয়ে আসলে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবার নদী খননের উদ্যোগ নেয়। কিন্তুু খননের শুরুই অভিযোগ ওঠেছে দায়সারাভাবে খনন কাজের। বড় নদীকে ছোট করে দেওয়া হচ্ছে। নদীর পথ পরিবর্তন করে মালিকানা বসতভিটার পাশ দিয়ে খনন কাজ শুরু করলে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া জগন্নাথপুর হাসিনাবাদ ও জগন্নাথপুর এলাকার কয়েকজন কৃষকের ফসলি জমি কেটে দেওয়া হয়েছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছেন।
নদীটি ছোট খালের ন্যায় রূপ নেওয়ায় শত শত নৌকা যান চলাচল হুমকির মুখে পড়বে। উপজেলা সদরের পরিষদ এলাকায় নৌকাঘাটে অচল হয়ে পড়বে। নদীটি ছোট হয়ে যাওয়াতে যাত্রীবাহী ইঞ্চিল নৌকাসহ সকল ধরনের বড় নৌ-যান চলাফেলায় ব্যাহত হবে।
নৌকাঘাটের ইজাদার জগন্নাথপুর বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহির উদ্দিন বলেন, বিশাল বড় নদী এখন ছোট খালের মতো রূপ নিয়েছে। এজন্যে বর্ষা মৌসুমে নৌকা চলাচল করতে পারবে না। এঘাটের তিন থেকে চার শতাধিক ইঞ্চিল চালিত যাত্রীবাহী নৌকা আসে। এসব নৌকায় জগন্নাথপুরের হাওরাঞ্চলের চিলাউড়া-হলদিপুর, রানীগঞ্জ, আশারাকান্দি ও পাইলগাঁও ইউনিয়নের লাখো মানুষ নলজুর নদী হয়ে লাখো মানুষ উপজেলা সদর যাতায়াত করেন। এছাড়া জগন্নাথপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহের নেত্রকোনা ও মদন থেকে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে হাওরপাড়ের মানুষ নৌ পথে চলাচলে চরম সমস্যায় পড়বেন।
নলজুর নদীর পাশবর্তী বাসিন্দা পৌর শহরের ইকড়ছই হাসিনাবাদ এলাকার দরিদ্র আজাদ আলী বলেন, নদীর পথ পরিবর্তন করে নদী খননের জন্য হাসিনাবাদ ও জগন্নাথপুর এলাকার ১৫ থেকে ২০টি পরিবারের মালিকাভিটা কেটে দেয়া হয়েছে। হুমকির মধ্যে আছে আমাদের বসতভিটা। সম্প্রতি মাথাগোঁজার বসতবাড়ীর ভিটায় খনন কাজ শুরু করলে স্থানীয়দের বাধা মুখে ঠিকাদার কাজ করতে পারেন নি। বর্তমানে বসতভিটা হারানোর ভয়ে আমাদের চোখে ঘুম নেই।
পিংলার হাওরের কৃষক জলিল মিয়া বলেন, নলজুর নদীর তীরবর্তী এলাকায় জগন্নাথপুরের অন্যতম পিংলার হাওর। নদী খননেন নামে অপরিকল্পিতভাবে খননের মাটি হাওরের যাতাযাত রাস্তায় ফেলে রেখে চলাচলের বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরকম অবস্থা থাকলে হাওরের পাকা ফসল ঘরে তোলা দুরুহ হয়ে ওঠবে কৃষকদের।
এদিকে সাম্প্রতিককালে জগন্নাথপুর উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় স্থানীয় জনপ্রতিধিরা অপরিকল্পিক খনন কাজে ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত এই কাজ বন্ধ করে পরিকল্পিত খননের দাবি তুলেছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, নলজুর নদীতে নতুন নকশা অনুযায়ী ২২০ ফুট প্রস্ত রয়েছে। কিন্তু নকশা অনুযায়ী খনন না করায় নদী খালে পরিণত হচ্ছে। এই খনন কাজে উপজেলাবাসী কোন সুফল পারেননা। উল্টো নানা সমস্যা পড়বেন এলাকাবাসী। তিনি বলেন, সরকারি টাকার অপচয় রোধ করতে অপরিকল্পিত নদী খননের বিষয়টি আমরা জোরালো ভাবে দেখে পরিকল্পিত নদী খননের দাবি জানিয়েছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জগন্নাথপুর উপজেলা কার্যালয় সূত্র জানায়, উপজেলা সদরের বাদাউড়া থেকে এরালিয়া বাজার পর্যন্ত সাড়ে ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৫০ ফুট প্রস্তে নদী খননের উদ্যাগ নেয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশন টেক লিমিটেড ঢাকা সাড়ে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দে কাজ বাস্তবায়ন করছে। গত ১৮ জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জগন্নাথপুর উপজেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হাসান গাজী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী খননের সাথে সম্পৃক্ত প্রকৌশলীর ডিজাইন ও প্রাক্কলন অনুয়ায়ী নদী খনন কাজ হচ্ছে। আমরা কাজ তদারকি করছি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী কামরুজ্জামান খান জানান, প্রাক্কলন অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। নদীর ওপর অংশে ৩৫ মিটার নীচে ১৫ মিটার খনন হবে। নদীর দুইপাশে বাঁধ মতো হবে।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান বলেন, সদ্য অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের সভায় জনপ্রতিনিধিরা নলজুর নদী খনন নিয়ে আলোচনা করে দাবি জানিয়েছি নদীটি নতুন নকশা অনুযায়ী খনন করতে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে জেলা নদী রক্ষা কমিটিতে লিখিত আবেদন করব আমি। এছাড়া নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।