অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষাই কোচিংঘরগামীতার কারণ

এ, এন, তালুকদার
গত ২ ডিসেম্বর ২০১৭ একটি জাতীয় দৈনিক এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি ছবি ছিল এরকম-একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জেলার নির্বাহী প্রধানের কার্যালয়ের সামনে অনশনরত। কারণ তার মেয়ের পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। পরীক্ষা খারাপ হলে অনশন করতে হবে তাও আবার বিজয়ের মাসে এটা আমার বোধগম্য নয়। কিন্তু যখন এর বিস্তারিত বিষয়ে জানতে পারলাম তখন একজন শিক্ষক হিসেবে এর দায় এড়াতে পারলাম না। শিক্ষকের প্রধান কর্তব্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান করা। ঐ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ে কোনো পাঠদান হয়নি, তা বিশ্বাস করতে পারছি না। আমাদের পবিত্র সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে লেখা আছে, শিক্ষা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। যে মুক্তিযোদ্ধা তার জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন তাঁর মেয়ে এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ লজ্জা কার? রাষ্ট্র কি এর দায় এড়াতে পারে? একজন শিক্ষক তার শ্রেণিকক্ষে পাঠদান অব্যাহত রেখে বাড়িতে (শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও)কেন কোচিং ঘর তৈরি করেন? তার দুটি কারণ থাকতে পারে: ১। ধাক্কাজনিত ২। টানজনিত। টানজনিত কারণটি লোকে মুখে প্রায়ই শোনা যায় যা অনেকটা মুখরোচক হয়ে গেছে। এতে হয়তো অল্পসংখ্যক শিক্ষক জড়িত যাদের কোচিংবাজ শিক্ষক হিসেবে সমাজ বা গণমাধ্যমে অভিহিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু ধাক্কাজনিত কারণটি এখনও সেই ভাবে আলোচিত হয়নি। আমি এ ব্যাপারে কিছু বলার চেষ্টা করছি। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা হয়ে থাকে তা অত্যন্ত যুগোপযোগী। কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য যে বিধিসম্মত উপাদানগুলো দরকার তা অনেকাংশে অনুপস্থিত। বাংলাদেশের গ্রামীণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে যে পরিমাণ অবকাঠামোগত সুবিধা ও শিক্ষক থাকার কথা তা অধিকাংশক্ষেত্রে নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সফলভাবে পাঠদান করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এত বেশী যে শ্রেণি ব্যবস্থাপনায় অনেক সময় অপচয় হয়। ফলপ্রসূ পাঠদানের অভাবে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয় এসব কোচিং ঘরে যেতে। পাবলিক পরীক্ষার আধিক্যের কারণে পাঠদানের সময় সংকুচিত হয়ে আসছে যা সঠিক সময়ে সিলেবাস শেষ করার পক্ষে অনুকূল নয়। আমি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করছি যেখানে প্রায় সারা বছর পাবলিক পরীক্ষা চলে। ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে এস.এস.সি. পরীক্ষা শুরু হয় যা শেষ হতে প্রায় ৩৫/৪০ দিন লেগে যায়। মাঝে কয়েকদিন পাঠদান চললেও ১লা এপ্রিল থেকে এইচ.এস.সি. পরীক্ষা আরও প্রায় ১৪/১৫ কার্যদিবস পাঠদান বন্ধ থাকে। জে.এস.সি. ও পিইসি পরীক্ষায় আরও ৩০ দিন চলে যায়। অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরিক্ষাসহ বছরের প্রায় ৪ মাস পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নবম    ও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় বিধায় অভিভাবকগণ সন্তানের ভালো ফলাফলের জন্য কোচিং ঘরের দ্বারস্থ হন। পরীক্ষায় বেশী নম্বর পাওয়া এখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক যতীন  সরকার বলেন, “ এখন আর কোনো বিদ্যার্থী বা শিক্ষার্থী নেই, আছে কেবল পরীক্ষার্থী । আরও স্পষ্ট করে বলতে পরীক্ষার্থীও এখন নেই, এখন সবাই নম্বরার্থী” (বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি পৃ-৮৫)।  পরীক্ষায় বেশী নম্বর পাওয়ার উদগ্র বাসনা শিক্ষার্থীদের কোচিং ঘরে আকৃষ্ট করছে। “ কোনো কার্যই কারণ ছাড়া হয় না। কোচিং সেন্টারের  উদ্ভব ও বিকাশও উপযুক্ত কারণেই ঘটেছে। পড়ালেখার জন্য রয়েছে রাষ্ট্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রয়েছে পাঠ্যবই এবং শিক্ষকেরা। তার বাইরে আরেক শ্রেণির বিদ্যাদ্রব্য বিক্রয় কেন্দ্রের প্রয়োজন কেন? ওগুলোর প্রয়োজন হচ্ছে পরীক্ষার জন্য, বিদ্যার্জন না করে কী উপায়ে পরীক্ষায় বেশী নম্বর ছিনতাই করে নেওয়া যায় তার অপুর্ব কলাকৌশল শেখানো হয় সেখানে। বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতিই জন্ম দিয়েছে ওই সব বিদ্যাদ্রব্য বিক্রয় কেন্দ্রের। (সৈয়দ আবুল মকসুদ, দৈনিক প্রথম আলো, পৃ-১০, ১২ডিসেম্বর ২০১৭)। একজন  শিক্ষার্থী যদি বছরে এতগুলো দিন পাঠগ্রহণ থেকে বিরত থাকে তবে তার পক্ষে শিক্ষকের কোচিং ঘর বা বিদ্যাদ্রব্য বিক্রয় কেন্দ্র অথবা গৃহশিক্ষক ব্যতিত কীই বা করার থাকে? তাই শিক্ষার্থীর উপর থেকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষানামক বোঝা নামিয়ে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা হোক যাতে তার আচরণিক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। কোচিং বাণিজ্য রুখতে হলে প্রতিটি মানুষকে সচেতন হয়ে এলাকার বিদ্যালয়টিকে সর্বোত্তমভাবে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করতে হবে এবং তা করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মাধ্যমে।