স্টাফ রিপোর্টার
দালালদের ফাঁদে পা দিয়ে জমি জমা বিক্রি করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলের মা-বাবা। কিন্তু তাদের কেউ মারা গেছে সাগরে ডুবে, কেউ ঠান্ডায় আবার কেউ মারা গেছে মরুভূমিতে অনাহারে। চলতি বছর সুনামগঞ্জ জেলার ৫ জন অবৈধভাবে ও দালালের মাধ্যমে বিশে^র বিভিন্ন দেশে যেতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
২৯ ডিসেম্বর রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) জানায়, অভিবাসীরা বিভিন্ন দেশে গিয়ে চরমভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। তারা তাদের প্রাপ্য অধিকার পাচ্ছে না। অনেক পাচার ও অদক্ষতার কারণে ঠিকমতো কাজ করতে না পারায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এটা দুর্ভাগ্যজনক এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা মরদেহের সঙ্গে আসা মৃত্যু সনদে অনেক সময়ই অভিবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয় না। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে সুশীল সমাজের পক্ষ হতে এই বিষয়ে আলোচনা ও মানব পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলো প্রসিকিউশনের হার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
সাজ্জাদুর রহমান
গত ২৫ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে যাত্রা করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয় বাংলাদেশিদের বহনকারী একটি নৌকা। এটি গত ২৫ জানুয়ারি ল্যাম্পেডুসা দ্বীপে পৌঁছানোর সময় অতিরিক্ত ঠান্ডায় অভিবাসনপ্রত্যাশী সাত বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে একজন ছিলেন জামালগঞ্জ উপজেলার সাজ্জাদুর রহমান। তিনি উপজেলার ভীমখালি ইউনিয়নের শেখুল মাহমুদপুর গ্রামের নুরুল আমিন তালুকদার ও রহিমুন্নেছার ছেলে।
৮ পুত্র কন্যার (চার ভাই-চার বোন) মধ্যে দ্বিতীয় সাজ্জাদুর রহমান অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। সে বাবার গৃহস্তি কাজে সহযোগিতা করতো। বিদেশ যাবার চেষ্টা ছিল তার ছোট বেলা থেকেই। কর্মঠ ছেলেটিকে বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি-জমা বন্ধক দিয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলার লালুখালি গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী রাসেল আহমদের মাধ্যমে প্রায় দুই মাস আগে লিবিয়া পাঠান বাবা নুরুল আমিন। এজন্য দালাল রাসেল আহমদকে প্রায় চার লাখ টাকা দিতে হয়েছে। টাকা নিয়েছে রাসেলের বাবা ফয়জুর রহমান। এরপর ইতালি পাঠাতে আরও টাকা দাবি করে তারা। পরে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ধনপুরের রফিকুল ইসলামকে (লিবিয়া প্রবাসী) আরও চার লাখ টাকা দেওয়া হয়। এই টাকা রফিকুলের গ্রামে থাকা ভাতিজা শাহাব উদ্দিন নিয়েছে।
সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ৩ জনের মৃত্যু
তুরস্ক থেকে অবৈধভাবে নৌকা যোগে গ্রিস যাবার পথে প্রাণ হারান শান্তিগঞ্জের পাথারিয়া গ্রামের সাইফুর রহমান (২২), দিরাইয়ের কর্ণগাঁওয়ের জুনেদ মিয়া (২২) ও দিরাইয়ের সাকিতপুরের জনি সর্দার (৩৫)। ১ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টায় সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়।
সাইফুরের বাবা আব্দুল জাহিদের ভাই রফিক মিয়া জানান, পাশের গ্রামের রাশেদ মিয়ার কাছে তিন লাখ টাকা দিয়ে ভাতিজা সাইফুর রহমানকে গ্রিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ওখানে পৌঁছানোর পর আরও টাকা দেবার কথা ছিল। মাস খানেক আগে ওমান থেকে ইরান এবং ইরান থেকে তুরস্ক গেছে সাইফুর। সোমবার রাত ১২টা ৫ মিনিটে তুরস্ক থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় সাইফুরদের। মঙ্গলবার রাতে একজন ফোন দিয়ে জানায়, ওদের নৌকা সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়াও একই দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া দিরাইয়ের কর্ণগাঁওয়ের লাল মিয়া ও সোনারা বিবির ৭ সন্তানের এক সন্তান জুনেদ মিয়া (২২) কে টুক দিরাইয়ের দালাল এনামুল হকের মাধ্যমে সাড়ে ১০ লাখ টাকায় গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। একই দালালের মাধ্যমে গ্রিসে যাবার উদ্দেশ্যে ডিসেম্বরে দিরাইয়ের সাকিতপুরের ফুল মিয়া সর্দার ও সাবানা আফসা বিবির ছেলে জনি সর্দার (৩৫) বাড়ি ছাড়ে। দুবাই থেকে ইরান এবং ইরান থেকে তুরস্ক যায় জনি। ওখান থেকে গ্রিসে যাবার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে সেও। গ্রিসে পাঠানোর জন্য টুক চানপুরের এনামুল হক এনামকে চার দফায় ১০ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছেন তিনি।
অনাহারে মৃত্যু আকবরের
অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনতে ৫ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট মো. আকবরকে সৌদি আরবে পাঠায় তার পরিবার। কিস্তি ও জমি বিক্রির টাকায় গত মার্চ মাসে বিদেশ পাড়ি জমান আকবর। একই গ্রামের মো. জালাল উদ্দিনের ছেলে সৌদিপ্রবাসী শহিদ মিয়ার মাধ্যমে গ্রামের ৪ জন যুবক একসাথে বিদেশে যান।
কোম্পানির ভিসায় ৪ লক্ষ টাকার চুক্তিতে সৌদি গিয়ে ৩ মাস পর সেখানে অবৈধ হয়ে যায় তারা। সৌদিপ্রবাসী দালাল শহিদ তাদের আকামা লাগিয়ে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে সবাইকে নিয়ে যায় মরুভূমিতে। কাজ পেতে টাকা লাগবে বলে দেশে তাদের পরিবারের কাছ থেকে আরও অতিরিক্ত টাকা নেয় শহিদের বাবা মো জালাল উদ্দিন। কাজের অভাবে দুর্গম মরুভূমিতে দীর্ঘদিন অনাহারে, অর্ধাহারে, বিনা চিকিৎসায় শনিবার (৫ নভেম্বর) ৪ জনের মধ্যে মো. আকবরের মৃত্যু হয়।
এদিকে একসাথে থাকা রাসেল, নুর আলম সহ বাকি ৩ জনেরও একই অবস্থা। বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় রসদ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছে তারা। দুঃখে-কষ্টে মানবেতর জীবন পার করছে জানিয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে পরিবারের কাছে ভিডিও পাঠিয়েছে ঐ ৩ যুবক। আকবরের মৃত্যুর পর তারা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এই ঘটনায় থানায় মামলা করেন আকবরের বড় ভাই আব্দুস সালাম। মামলায় বিদেশে থাকা দালাল শহিদ মিয়াসহ ৪ জনকে আসামী করা হয়। এই মামলার আসামী ও শহিদের মা রাজিয়া খাতুনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বাকি ৩ আসামী উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। মানবপাচার মামলায় রাজিয়া খাতুন কারাগারে আছেন। আকবরের মৃত্যুর প্রায় দেড়মাস পর ২ ডিসেম্বর আকবরের মরদেহ সৌদিআরব থেকে দেশে আসে।


