স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে বখাটেপনা রোধে এবং শিক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু, সুন্দর ও স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
গত ১১ জুন জেলা আইন-শৃংখলা সভায় ব্যাপক আলোচনা হয় শহরের কিছু বখাটে ও কলেজের গুটিকয়েক ছাত্রের কারণে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। কলেজের অধ্যক্ষও নিয়মিত কলেজে উপস্থিত থাকেন না। সরকারি কলেজের বিষয়টি জেলা আইনশৃংখলা সভায় রেজুলেশন আকারে প্রকাশ হয়।
কলেজের উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে এবং শিক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু, সুন্দর ও স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ শফিউল আলমকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আব্দুছ ছত্তারের সভাপতিত্বে ও শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের ইফতেকার আলমের সঞ্চালনায়
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ শফিউল আলম, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে, সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রসূন চন্দ্র মজুদমার, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক সামছুল আলম, সহকারী অধ্যাপক মো. জমসিদ আলী প্রমুখ।
সভায় অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আব্দুছ ছত্তার বলেন,‘ আমি কলেজে নিয়মত থাকি না এটা সঠিক নয়। সব সরকারি কলেজে অধ্যক্ষের বাসভবন রয়েছে, সেখানে থাকা যায়। কিন্তু সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে কোন বাসভবন নেই। তারপরও আমি কলেজের একটি কক্ষে নিয়মিত থাকছি। সরকারি কাজ ছাড়া কলেজের বাহিরে যাই না। কোন প্রয়োজনে আমি ও উপাধ্যক্ষ কলেজের বাইরে গেলে পাঠদানে সমস্যা হয় না। কলেজে বহিরাগত ও অছাত্রদের ঠেকাতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেশের অন্যান্য কলেজের তুলনায় সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ যথেষ্ট ভাল আছে। অনেক ছাত্র আমাদের কলেজে একাদশ ও অনার্সে পড়তে চায় কিন্তু আসন ও অবকাঠামো সংকটের কারণে আমরা সবাইকে ভর্তি করতে পারিনি। অবকাঠামো সংকট ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে সুনামগঞ্জের ছাত্ররা কলেজে লেখাপড়ার সুযোগ পেত। ’
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সহযোগি অধ্যাপক নুরুল আলম, সহযোগি অধ্যাপক আব্দুর রশিদ খান, সহযোগি অধ্যাপক গাজী মু. ইসমাইল হোসেন, সহযোগি অধ্যাপক আবুল কাশেম আজাদ, সহযোগি অধ্যাপক নাছিমুছছবা, সহযোগি অধ্যাপক আহমদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী, সহকারি অধ্যাপক মো. মোস্তান বিল্লাহ, সহকারী অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির, সহকারী অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক সুকুমার দাস, সহকারী অধ্যাপক কামরুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক আব্দুর রকিব, সহকারী অধ্যাপক ইভা রায়, সহকারী অধ্যাপক শফিকুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক জাকির হোসেন, প্রভাষক সুবীর পাল, প্রভাষক মৌলি মজুমদার, প্রভাষক সারা পারভিন, প্রভাষক হোসনে আরা, প্রভাষক ফাতেমা, প্রভাষক নির্মলেন্দু শর্মা, প্রভাষক তরিকুল ইসলাম, প্রভাষক আহসান শহীদ আনসারী প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, গত ১১ মে বৃহস্পতিবার সকালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে অসামাজিক কাজের প্রতিবাদ করায় কলেজের চতুর্থ শেণির কর্মচারী মো. রাশেদ মিয়াকে মারধর করে কলেজের ¯œাতক প্রথম বর্ষের অনিয়মিত ছাত্র মঈনুল ইসলাম। এ ঘটনায় ১২ মে কলেজের সকল কর্মচারীরা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
কর্মচারীরা থানায় লিখিত অভিযোগ করে বলেছিলেন, বৃহস্পতিবার এইচএসসি পরীক্ষা চলছিল। সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে কলেজের একটি শ্রেণি কক্ষের দরজা বন্ধ এবং ভিতরে ফ্যান চলতে দেখেন চতুর্থ শেণির কর্মচারী মো. রাশেদ মিয়া। পরে ওই কক্ষের ভিতরে কেউ আছে কিনা জানতে তিনি দরজায় ধাক্কা দেন। কিন্তু দরজা না খোলায় জানালার কাঁচ দিয়ে কক্ষের ভেতরের এক কোণে এক ছেলে ও এক মেয়েকে দেখতে পান। পরে তিনি কলেজের প্রধান সহকারীকে গিয়ে বিষয়টি জানান। এ সময় ওই কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে কলেজের ¯œাতক প্রথম বর্ষের অনিয়মিত ছাত্র মইনুল ইসলাম অফিস সহকারীর সামনেই রাশেদকে মারধর শুরু করেন। তখন অন্য কর্মচারীরা বাধা দিলে চেয়ার নিয়ে তাদেরও মারতে উদ্যত হন মইনুল।
রাশেদ মিয়া বলেন, ঘটনার দিন আমি তাদের কোনো কিছু বলিনি, শুধু প্রধান সহকারীকে এসে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু কথা শেষ করার আগেই মইনুল এসে আমাকে মারধর শুরু করেন। পরে অন্যরা আমাকে তার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু কলেজ ছুুটির পর মইনুল আবার আমাদের ওপর চড়াও হন।’ পরে তারা এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
মইনুল এর আগেও গ্রামের নিরিহ ছাত্রীদের নানাভাবে উত্যক্ত করেছে। মইনুল ইসলাম পৌর শহরের হাসননগর এলাকার কুরিয়ারপাড়ের বাসিন্দা নিদান মিয়ার ছেলে। এখানে তারা ভাড়া বাসায় থাকেন। কলেজের কর্মচারীকে মারধরের ঘটনার কিছুদিন পর অভিযুক্ত মঈনুলের আপন খালাতো ভাই কলেজের ¯œাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র ইব্রাহিম কলেজের সুইপার তাজুল ইসলামকে মারধর করে। এঘটনায় তাজুল ইসলাম কলেজের অধ্যক্ষের কাছে বিচার প্রার্থী হন। কিন্তু ঘটনার অনেকদিন পেরিয়ে গেলেও ইব্রাহিম ও মঈনুলকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
দুইটি ঘটনায় কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক সামছুল আলমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত দুই ছাত্রের কাছ থেকে সঠিক বক্তব্য আদায় করতে পারেনি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় কলেজের অধ্যক্ষ, তদন্ত কমিটির প্রধানসহ শিক্ষকগণ বলেন অভিযুক্ত মইনুল ইসলাম ও ইব্রাহিম কলেজের নিয়মিত ছাত্র নয়। তদন্ত কমিটির সামনে তাদেরকে ডাকা হয়েছিল, তারা আসেনি। তারা নিয়মিত কলেজেও আসে না।
এদিকে কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি রাশেদ মিয়া বৃহস্পতিবার বিকালে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত মইনুল ইসলাম ও ইব্রাহিম আপন খালাতো ভাই। তারা কলেজের ছাত্র। মইনুল ইসলাম অনিয়মিত ও ইব্রাহিম নিয়মিত ছাত্র। মইনুল বৃহস্পতিবারও কলেজে উপস্থিত ছিল।’
অভিযুক্ত দুইজন কলেজের ছাত্র তারপরও কেন ব্যবস্থা নেয়া হয় না, এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুছ ছত্তারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,‘ অভিযুক্ত দুইজনই কলেজের ছাত্র, তারা নিয়মিত কলেজে আসে ও ক্লাস করে। কলেজের কর্মচারীদের সাথে তাদের ঝামেলার ঘটনায় সাত দিনের সময় বেধে দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি আরো কিছুদিন সময় চেয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা আবারো সভায় বসব। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তদন্ত কমিটির প্রধান সহযোগি অধ্যাপক সামছুল আলম বৃহস্পতিবার বিকালে সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘ মইনুল ও ইব্রাহিম দুইজনই কলেজের বিএ পাস কোর্সের ছাত্র। আমার মনে হয় তারা ২০১৪ সালে বিএ ভর্তি হয়েছিল। এর পর তারা পরীক্ষা দিয়েছিল কিনা আমার মনে নেই। তদন্ত কমিটির মিটিংএ ইব্রাহিম একদিন এসেছিল। তবে মইনুল আসেনি। ইব্রাহিম তদন্ত কমিটির কাছে কি বলেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ ইব্রাহিম কি বলেছে তা প্রকাশ করা যাবে না। আমরা তদন্ত রিপোর্ট জমা দেব। তারপরও কর্তৃপক্ষ আইন মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন,‘ কলেজের বহিরাগত ও অছাত্রদের প্রবেশ ছাড়াও আরোও কিছু ঘটনা আছে। বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিচয়পত্র নিয়ে সকল ছাত্রকে কলেজে প্রবেশ করতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে কলেজে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। নিয়মের বাইরে কারো কোন অন্যায় আবদার রাখা যাবে না। কলেজের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রয়োজনে আমরা পৃথকভাবে তদন্ত করব এবং আবারও মতবিনিময় সভায় বসব। ’


