মাহবুবুল হাছান শাহীন
“অমিত রায় ব্যারিস্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী “রয়” ও “রে” রূপান্তর যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন্তু সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসাম্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজী বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেলÑ অমিট রায়ে। ”
“লাবণ্যের বাপ অবনীশ দত্ত একজন পশ্চিমি কলেজের অধ্যক্ষ। মাতৃহীন মেয়েকে এমন করে মানুষ করেছেন যে, বহু পরীক্ষা পাশের ঘষাঘষিতেও তার বিদ্যা বৃদ্ধিতে লোকসান ঘটাতে পারেনি। এমন কি, এখনো তার পাঠ্যনুরাগ রয়েছে প্রবল।
বাপের একমাত্র সখ ছিল বিদ্যায়, মেয়েটির মধ্যে তাঁর সেই শখটির সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি হয়েছিল। নিজের লাইব্রেরির চেয়েও তাকে ভালোবাসতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জ্ঞান চর্চায় যার মনটা নিরেট হয়ে উঠে সেখানে উড়ো ভাবনার গ্যাস নীচে থেকে ঠেলে ওঠবার মতো সমস্ত ফাটল মরে যায়, সে মানুষের পক্ষে বিয়ে করবার দরকার হয় না।”
“অমিত মিশুক মানুষ। প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে তার বেশিক্ষণ চলে না। সর্বদাই নিজে বকা-ঝকা করা অভ্যাস। গাছপালা- পাহাড়পর্বতের সঙ্গে হাসিতামাশা চলে না, তাদের সঙ্গে কোনোরকম উলটো ব্যবহার করতে গেলেই ঘা খেয়ে মরতে হয়; তারাও চলে নিয়মে, অন্যের ব্যবহারেও তারা নিয়ম প্রত্যাশা করে; এক কথায়, তারা অরসিক, সেইজন্যে শহরের বাইরে ওর প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে। কিন্তু হঠাৎ কী হল, শিলং পাহাড়টা চার দিক থেকে অমিতকে নিজের মধ্যে যেন রসিয়ে নিচ্ছে। আজ সে উঠেছে সূর্য ওঠবার আগেই; এটা ওর স্বধর্মবিরুদ্ধ। জানলা দিয়ে দেখলে, দেবদারু গাছের ঝালরগুলো কাঁপছে, আর তার পিছনে পাতলা মেঘের উপর পাহাড়ের ওপার থেকে সূর্য তার তুলির লম্বা লম্বা সোনালি টান লাগিয়েছে আগুনে-জ্বলা যে-সব রঙের আভা ফুটে উঠছে তার সম্বন্ধে চুপ করে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ”
“ঠিক হয়ে গেল, আগামী অঘ্রান মাসে এদের বিয়ে। যোগমায়া কলকাতায় গিয়ে সমস্ত আয়োজন করবেন।
লাবণ্য অমিতকে বললে, “তোমার কলকাতায় ফেরবার দিন অনেককাল হল পেরিয়ে গেছে। অনিশ্চিতের মধ্যে বাঁধা পড়ে তোমার দিন কেটে যাচ্ছিল। এখন ছুটি। নিঃসংশয়ে চলে যাও। বিয়ের আগে আমাদের আর দেখা হবে না।”
“এমন কড়া শাসন কেন?”
“সেদিন যে সহজ আনন্দের কথা বলেছিলে তাকে সহজ রাখবার জন্যে।”
“এটা একেবারে গভীর জ্ঞানের কথা। সেদিন তোমাকে কবি বলে সন্দেহ করেছিলুম, আজ সন্দেহ করছি ফিলজফার বলে। চমৎকার বলেছ। সহজকে সহজ রাখতে হলে শক্ত হতে হয়।”
“সকালবেলায় কাজে মন দেওয়া আজ লাবণ্যর পক্ষে কঠিন। সে বেড়াতেও যায় নি। অমিত বলেছিল, শিলঙ থেকে যাবার আগে আজ সকালবেলায় সে ওদের সঙ্গে দেখা করতে চায় না, সেই পণটাকে রক্ষা করবার ভার দুজনেরই উপর। কেননা, যে রাস্তায় ও বেড়াতে যায় সেই রাস্তা দিয়েই অমিতকে যেতে হবে। মনে তাই লোভ ছিল যথেষ্ট। সেটাকে কষে দমন করতে হল। যোগমায়া খুব সকালেই স্নান সেরে তাঁর আহ্নিকের জন্যে কিছু ফুল তোলেন।তিনি বেরোবার আগেই লাবণ্য সে জায়গাটা থেকে চলে এল য়ুক্যালিপ্ টাস-তলায়। হাতে দুই-একটা বই ছিল, বোধহয় নিজেকে এবং অন্যদেরকে ভোলাবার জন্যে। তার পাতা খোলা; কিন্তু বেলা যায়, পাতা ওলটানো হয় না। মনের মধ্যে কেবলই বলছে, জীবনের মহোৎসবের দিন কাল শেষ হয়ে গেল।”
“অবশেষে অমিত ফিরে এল। শহরে রাষ্ট্র কেতকীর সঙ্গে তার বিয়ে। অথচ অমিতের নিজ মুখে একদিনও যতি এ প্রসঙ্গ শোনে নি। অমিতের ব্যবহারেরও অনেকখানি বদল ঘটেছে। পূর্বের মতোই যতিকে অমিত ইংরেজি বই কিনে উপহার দেয়, কিন্তু তাকে নিয়ে সন্ধেবেলায় সে-সব বইয়ের আলোচনা করে না। যতি বুঝতে পারে, আলোচনার ধারাটা এখন বইছে এক নতুন খাদে। আজকাল মোটরে বেড়াতে সে যতিকে ডাক পাড়ে না। যতির বয়সে এ কথা বোঝা কঠিন নয় যে, অমিতের “নিরুদ্দেশ যাত্রা”র পার্টিতে তৃতীয় ব্যক্তির জায়গা হওয়া অসম্ভব।”
লাবণ্যের লেখা এক চিঠিতে উঠে এলো
‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।’
শেষের কবিতা, বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের মুখপত্র হিসেবে যুগ যুগ ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপূর্ব সৃষ্টি উপন্যাস “শেষের কবিতা”। সৃষ্টির পরেই এর আবেশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে সাহিত্যপ্রেমী সকল বাঙালির হৃদয়ে। ১৯২৮ সালে এ উপন্যানটি লিখিত হয়। মেঘালয়ের রাজধনিী শিলংয়ে অবকাশ যাপনকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ উপন্যাসটি লিখেন। ১৯২৩ সালে প্রথম এবং ১৯২৭ সালে ২য় বার আসাম যাত্রার সময় রবীন্দ্রনাথ শিলংয়ে অবস্থান করেন। এরই প্রেক্ষিতে ১৯২৮ সালে শিলংয়ের পটভূমিতে এ উপন্যাসটি লিখিত হয়। মেঘ-পাহাড়ের মিতালী শেষের কবিতায় এমন ভাবে বিন্যস্ত হয়েছে, তা মনে হয় এখনও আগের মতোই আছে। আট দশক পূর্বে লিখিত শেষের কবিতার শিলং এখনও আগের মতোই সাজানো গুছানো রয়েছে। শেষের কবিতা উপন্যাস না কবিতা এ নিয়ে অনেক হাস্যরস প্রচলিত। আমাদের ভ্রমণ সঙ্গিয় একজন বলেছেন,‘হ্যাঁ বুঝেছি এখানে বসেই তিনি এ কবিতা লিখেন’। হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারিনি।
সম্প্রতি সুযোগ হয়েছিল মেঘালয় রাজ্যর রাজধানী প্রকৃতির সৃষ্টি শহর শিলংয়ে যাওয়ার (আমরা অনেকেই মেঘালয়কে মেঘ পাহাড়ের দেশ বলে জানি)। সেখানেই কোন এক বিকেলে আমরা গিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে উঠে আসা অপূর্ব সৃষ্টি অমিত-লাবণ্যের আতুর ঘর হিসেবে পরিচিত সেই বাংলো টাইপ বাড়িতে। খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে সেই বাড়িটি। ভেতরে যাওয়ার অবশ্য সুযোগ নেই। বাইরে থেকে চারিদিকে ঘুরে দেখলাম। আশপাশে এমন কাউকে পাইনি বাড়ি সন্মন্ধে আরো কিছু জানব। তারপরও নিজস্ব আবেশ নিয়ে বাড়িটির চারপাশে ঘুরলাম। যেহেতু আমরা এখন দেখছি, তবুও পুরনো আবেশ আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কারো কাছ থেকে জানলে হয়তো আরো ভালো লাগতো।
রবীন্দ্রনাথের ১৫০ তম জন্ম বার্ষিকীতে এই বাড়ির সামনে তাঁর শেষ বয়সের একটি প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিকৃতিটি অবশ্য মনে হয়েছে প্রকৃতভাবে রবীন্দ্রনাথকে ফুঁটিয়ে তুলতে পারেনি। বাড়িতে ঢোকার রাস্তাটা চমৎকার। ঢোকার দু’পাশে দেবদারু গাছের সারি। মনে হবে গাছগুলো অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।
ইতিহাস মনে হলো এখানে থেমে গেছে। বইয়ের বর্ণনার সবকিছুই পুরোপুরি মিল পেলাম। ভ্রমণ পিপাসুদের অনুরোধ থাকবে শিলং বেড়াতে এলে অবশ্যই শেষের কবিতা উপন্যাসটি পড়ে আসবেন। কোন এক বিকেলে বাড়ির সামনে বসে অমিত-লাবণ্যের প্রেম ভালোবাসার টানাপোড়েন চিন্তা করে নস্টালজিক হবেন।
শিলং ০১.০৭.১৭ইং


