অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর………

ইকবাল কাগজী
পত্রিকার তাগিদ, একটা কীছু লিখে লিখে দিতে হবে। মাথা থেকে এই প্রসঙ্গটা সরছিল না। আর এদিকে পত্রিকা পড়ছিলাম। রোরবার, ১৬ জুলাই ২০১৭-র প্রথম আলোর দ্বিতীয় পৃষ্ঠার একটি সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘এসএসএফের প্রতি প্রধানমন্ত্রী, নিরাপত্তার নামে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন না।’ এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) একটি মু-মাল (অননৎবারধঃরড়হ) অর্থাৎ শব্দসংক্ষেপণ। মনে মনে এই ইংরেজী মু-মালটির বঙ্গায়ন ‘বিনিবা’ (বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী) যখন করে ফেলেছি, অন্যদিকে ঠিক তখনই বিনিবা প্রধানমন্ত্রীকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলবে চিন্তাটা নাছুঁড়বান্দা হয়ে পিছন পড়ে রইলো।
তবে চিন্তার কোনও কারণ নেই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনিবার্যভাবেই জনবিচ্ছিন্ন হতে হতে একরকম বন্দি হয়েই পড়বেন। এটা এসএসএফের কারণেই কেবল অব্যাহত থাকবে, এমন কীছু নয়। বস্তুতপক্ষে দেশের সমাজবাস্তবতাইÑ সামাজিক আর্থনীতিক বিন্যাসটাইÑ এমন, একে খোল-নলচে সমেত বদলে দিতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বার সম্ভাবনাটা বাড়বে বৈ কমবে না। বর্তমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় যে অস্থির রাজনীতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে এবং যে অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্রধানমন্ত্রীকে লড়তে হচ্ছে, তাতে একজন রাষ্ট্রনায়কের জনবিচ্ছিন্ন হওয়াই একমাত্র নিয়তি। ভুলে গেলে চলবে না যে, বঙ্গবন্ধুকেও স্বল্প সময়ের, মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই, পরিকল্পিতভাবেই জনবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল, আরও যথাযথভাবে বললে বলতে হয়, তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। ভুলে গেলে চলবে না যে, এই দেশের সংবিধান রচিত হওয়ার পূর্বেই সংবিধানের হত্যাকারী জন্ম নিয়েছিল এই দেশে, যেমন জন্ম হয়েছিল সংবিধানের প্রণেতাপ্রধানকে জনবিচ্ছিন্ন করার সামাজিক-রাজনীতিক প্রপঞ্চ। বিশ্ববিরল ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার পরিসরে উদ্ভূত সীমাহীন জনসম্পৃক্ততাকে জনবিচ্ছিন্নতায় রূপান্তর করে দেওয়া হয়েছিল। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালিকে সপরিবারে হত্যা করার ষড়যন্ত্রকে বাস্তব করে তোলা হয়েছিল। সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই ভাবনা হয়, বর্তমান রাজনীতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। তিনি তো প্রকৃতার্থে জনবিচ্ছিন্ন আমলাতান্ত্রিকতার দ্বারাই পরিবেষ্টিত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।          
রাষ্ট্রসম্পর্কিত যে কোনও আলোচনায় জনবিচ্ছিন্নতা একটি অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিক বিষয়। এই ধরা যাক, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতির সামগ্রিকতাকে। এখন এখানে কী কী হচ্ছে? এর উত্তরে যে কেউ বলে দিতে পারে যে, রাষ্ট্রপরিচালকরা সমাজ থেকেই উঠে এসেছে এবং তারা সমাজের স্বার্থরক্ষাকারী সংস্থা কিন্তু সমাজসেবক থেকে সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই সমাজের প্রভুতে পর্যবশিত হয়েছে, তারা প্রধান প্রধান রাজনীতিক দলের হয়ে পাল্টাপাল্টি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করছে, এই দলগুলি আবার কতিপয় ব্যক্তি বিশেষের কর্তৃত্বে নিয়ন্ত্রিত-পরিচালিত, তাঁরা রাজনীতি নিয়ে ব্যবসা করেন, প্রচার ইত্যাদি দলীয় কাজ করে জীবন নির্বাহ করেন, জাতীয় সংসদের নির্বাচন নিয়ে ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ করেন, দলের জয় লাভের পর পুরষ্কারস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। অর্থাৎ প্রকারান্তরে দুর্নীতিবাজরা রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারের একমাত্র অধিকারী হয়ে জনগণের উপরিস্থ শ্রেণিতে পরিণত হয়ে উঠেছে। এসবের একটাই সারার্থ যে, রাষ্ট্র সমাজ থেকে উদ্ভূত হয়ে, সমাজের উর্ধ্বে উঠে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই বিচ্ছিন্নতার একটিই অর্থ, সমাজকে আরও বেশি করে শোষণ করে ছিবড়ে করে দেওয়া। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস বলেন, ‘এবং এই যে শক্তি সমাজ থেকে উদ্ভূত হয়ে তার উর্ধ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে এবং ক্রমাগত সমাজ থেকে পৃথক হতে থাকে, এই শক্তি হল রাষ্ট্র।’ (কার্ল মার্কস ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, রচনা সংকলন, দ্বিতীয় খ- প্রথম অংশ, প্রগতি প্রকাশন, ১৯৭২, পৃ : ৩১৭)। রাষ্ট্র নিয়ে এত লম্বা কথার ফিরিস্তি এই জন্য যে, অর্থাৎ বলতে চাই, রাষ্ট্র যেখানে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানও, তিনি যেই হোন, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে এটাই স্বাভাবিক, যদি না বর্তমান সামাজিক- আর্থনীতিক বিন্যাসটা বদলে না যায়।
অন্য একটি বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য। সম্প্রতি জনবিচ্ছিন্নতা রাজনীতিকে অতীতের যে কোনও সময়ের তুলনায় ভীষণভাবে সহিংস ও জিঘাংসু করে তোলেছে। এখন এখানে রাজনীতিক পরিস্থিতি এমন যে, প্রতিপক্ষকে হত্যা করার লক্ষ্যে উত্তরোত্তর সশস্ত্র হামলার কেবলই অপ্রতিহতভাবে সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছে। মুনতাসির মামুনের সমীক্ষামতে অদ্যাবধি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর উপর আক্রমণের সংখ্যা ৩৫ বারেরও অধিক। তাতে আছে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো সুপরিকল্পিত ভয়ঙ্কর ঘটনা। নিরপেক্ষ বিচারে, যে আক্রমণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে চেষ্টা করেও কোনও উপায়েই অস্বীকার করা সম্ভব হয়ে উঠে না, কারও পক্ষে। সার্বিক রাজনীতিক পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে, এখানে রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে গোষ্ঠীতান্ত্রিক, একনায়কতন্ত্রী, ফ্যাসিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক।  সুতরাং রাষ্ট্রপ্রধানের জনবিচ্ছিন্নতার অনিবার্যতাকে রোধ করার কোনও বিকল্প অন্তত আপাতত নেই। সমাজ বিচ্ছিন্নতাই রাজনীতির একমাত্র ভবিতব্য।  আর তিনি যদি কোনও আমলা হন, তবে তো তাঁকে আরও বেশি করে সেই একই ভবিতব্যের অধীনেই দাসত্ব করে কালাতিপাত করতে হবে। যেহেতু সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই, ১৮৩৫ সালে মেকলের পরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে, এই উপমহাদেশে আমলাতন্ত্রকে পরিকল্পিতভাবে জনবিচ্ছিন্ন করেই গড়ে তোলা হয়েছে। মেকলের নীতি ছিল, ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের পক্ষ থেকে ভারতকে শাসন করার জন্যে এই ভারতেই এমন এক নতুন শ্রেণি গড়ে তোলতে হবে, যারা রক্ত-মাংস-চেহারায় হবে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তা-চেতনা-রুচিতে হবে ব্রিটিশ। আর বর্তমান আমলাতন্ত্র খোল-নলচে সমেত সেই ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রই আছে, তার কোনও পরিবর্তন সাধিত হয়নি। সুতরাং বর্তমান বাংলাদেশে একজন প্রশিক্ষিত  সচিব কেবল জনবিচ্ছিন্নতার আদর্শকেই লালন করতে পারেন, বোধ করি এটাই স্বাভাবিক। এর কোনও ব্যত্যয় হবারও কোনও জো নেই।
তাছাড়া, আর্থসামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদ কিংবা সা¤্রাজ্যবাদের একটা অনিবার্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর অধীনে গড়ে উঠা কোনও প্রশাসন বা শাসনব্যবস্থা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হয়ে উঠে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে যে, স্বয়ং রাষ্ট্রব্যবস্থাটাই জনবিচ্ছিন্ন একটা রাজনীতিক প্রপঞ্চ, কোনও রাষ্ট্রনায়ককে জনবিচ্ছিন্নকরণের, যাকে বলে,  একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র মাত্র। বাংলাদেশে এটাই বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার ঐতিহাসিক বাস্তব পরিণতি।
বিশ্বনিয়ন্ত্রক বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী আর্থব্যবস্থার সমাজবাস্তবতায় সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশের জনগণও তাদের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনে  অনিবার্যভাবেই নিপীড়িত হয়েই নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে। এখানে ভøাদিমির ইলিচ লেনিনের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু একথা ভুলবার কোন অধিকার আমাদের নেই যে, গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রেও মজুরি- দাসত্বই হল জনগণের ভাগ্য। তাছাড়া, প্রতিটি রাষ্ট্রই হল নিপীড়িত শ্রেণিকে “দমনের আলাদা ক্ষমতা।” সেই জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রই অ-মুক্ত ও অ-জন।’ (রাষ্ট্র ও বিপ্øব, রচনা সংকলন, দ্বিতীয় ভাগ, প্রগতি প্রকাশন, পৃ : ১৭২)। অর্থাৎ সঙ্গত বিবেচনায় রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্র কর্তৃক নিপীড়িত হওয়ার বৈশিষ্ট্য অর্জন করেই প্রকৃতপ্রস্তাবে রাষ্ট্র থেকে জনগণ বিচ্ছিন্নই থাকে বা বরাবর থাকছে, যদি না তারা নিজেরা রাষ্ট্রযন্ত্রটা পরিচালনা করে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা সচিব তিনি যেই হোন না কেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা কেউই জনসম্পৃক্ত কেউ নন, তাঁরা প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত সামাজিক-আর্থনীতিক যন্ত্রব্যবস্থায় সরঞ্জাম বা অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একান্তভাবেই জনবিচ্ছিন্ন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই এবং তাঁদের এই জনবিচ্ছিন্নতাকে কোনও যুক্তিতেই অস্বীকার করা যায় না। আর কেউ যদি অস্বীকার করেন, তবে  তা হবে নিতান্তই সত্যের অপলাপ মাত্র। অথবা বলতে হবে, যেহেতু রাষ্ট্রনায়কেরা জনগণকে নিজের থেকে প্রশাসনিক স্বার্থেই বিচ্ছিন্ন করে তোলেন, সেহেতু কেবল ‘জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে তোলেন’ এই অথের্, অর্থাৎ জনগণকে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সূত্রে তাঁরা অবশ্যই জনসম্পৃক্ত বা অজনবিচ্ছিন্ন।
 
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটির চরিত্র কী? এটার গত শতকের শেষার্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝতে কোনও অসুবিধা হয় না যে, এখানে গড়ে উঠা গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রজারা (প্রজার প্রশাসনিক অর্থ কিন্তু রাষ্ট্রের বা জমিদারির শাসনাধীন লোকজন, যাকে বলে রায়ত। মনে রাখতে হবে, প্রজা ধারণাটির মূলে একটি অধীনতা বা পরাধীনতার ব্যাপার আছে, তাতে স্বাধীনতার বালাই নেই।) রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন বিষয়টা সম্যক হৃদয়ঙ্গম করার জন্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যে রাষ্ট্রব্যবস্থা পাওয়া গেল, সেটা থেকেই শুরু করা যাক। সে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকেই তো বর্তমানের বাংলাদেশি রাষ্ট্রব্যবস্থার পত্তন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিন্তক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘কিন্তু ধর্মের ভিত্তিটা তো রয়েই গেলো রাষ্ট্রের মূলে। তাছাড়া পাকিস্তান দ্রুত পরিণত হলো একটি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে। এর সামরিক বেসামরিক আমলারা রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তৃত্ব দখল করে নিল। এবং নিজেরা যদিও মোটেই ধার্মিক ছিলো না, তথাপি তারা ধর্মকে ব্যবহার করতে চাইলো, ঠিক সেই পুরনো কারণেই, শ্রেণিবিভাজনকে অস্পষ্ট করে দেওয়ার জন্য। সেই সঙ্গে উগ্র ভারতবিদ্বেষ সৃষ্টি এবং সংখ্যাগুরু জনগণকে ধর্মচর্চার স্বাধীনতা (আসলে একমাত্র স্বাধীনতা) দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিপীড়নমূলক চরিত্রকে আড়াল করার চেষ্টা করলো।’ অব্যবহিত পরেই তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকা-ের পর রাষ্ট্রব্যবস্থায় যারা এসেছে তারা অনেকেই ছিল পাকিস্তানপন্থী। পাকিস্তানের প্রতি দুর্বলতা ছাড়াও তাদের ভেতরে আরেকটি প্রবণতা  ছিল। সেটি হলো বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা। তাদের প্রভু ও সমমনারা একদা যেমন করেছিল পাকিস্তানকে। তবে প্রয়োজনটা বাইরে থেকে আসেনি। উৎপন্ন হয়েছে ভেতরের প্রয়োজন থেকেই। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রই দেশ শাসন করবে। বিশেষ করে শেখ মুজিবের পর থেকে, তারা রাষ্ট্রকে তাদের মনের মতো করে তৈরি করে নিবে এটাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিক ঘটনাই ঘটেছে বাংলাদেশে।’ (রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি, জাগৃতি প্রকাশন, দ্বিতীয় সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি ২০০৬, পৃ : ১৬, ১৭ ও ১৮।)
এই আমলাতান্ত্রিকতা, যা যে-কোনও রাষ্ট্রনায়ককে নিজের স্বার্থেই জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে। তার  স্বরূপ ও শক্তিমত্তা প্রকটিত হয়, গত কদিন আগে, ১৯ এপ্রিল ২০১৭ বুধবার সন্ধ্যায়। সেদিন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন একজন সচিব। নামোল্লেখের প্রয়োজন নেই। তবে বলে রাখা ভালো যে, তিনি ছিলেন দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। পরের দিন সুনামগঞ্জের প্রতিটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় সে সভার সচিত্র সংবাদপ্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। মনে হয়, ভিডিও রেকর্ডের অনুসরণে সংবাদবিবরণগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল, তাই সেগুলোর প্রত্যেকটি  ছিল প্রায় এক খুড়ে মাথা কামানো। সচিবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তিনি বলেন, সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলি। দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে একটি আইন আছে। এই আইনের ২২ ধারায় বলা হয়েছে,  কোনো এলাকার অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়। না জেনে যারা এমন সস্তা দাবি জানায় তাদের কোন প্রকার জ্ঞানই নেই।’ সচিব আরও বলেন, ‘কিসের দুর্গত এলাকা! একটি ছাগলও তো মারা যায়নি।’
সুনামগঞ্জসহ দেশের ছয় ছয়টি জেলার, বলতে গেলে, শতভাগ বোরো ফসল জলের তলে তলিয়ে গেছে। যে কোন বিবেচনা বা যুক্তিতেই এই বিপর্যয়ের একটাই অর্থ হতে পারে, অচিরেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় না-খেতে-পেয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষজন মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার মতো ভয়াবহ একটা মানবিক সংকট নেমে আসবে। সেটা কাউকে বলে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। উপদ্রুত ছয় জেলার জনসংখ্যা ২ কোটি ধরলে, সচিবের ভাষ্যমতে সে সংখ্যার অর্ধেক, অর্থাৎ বিপর্যয় কবলিত লোকজনের সংখ্যাটা ৭১-য়ের যুদ্ধে ভারতে শরণার্থী হওয়া ১ কোটি মানবসন্তানের চেয়েও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বৈকি। সচিবের তত্ত্বানুযায়ী একমাত্র সুনামগঞ্জেই ১৫ লক্ষাধিক মানবসন্তানকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। কোনওরূপ প্রতিকার ব্যবস্থা না নিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলে, বাস্তবিক পক্ষেই যা হওয়াটাই স্বাভাবিক, ওই অবশ্যম্ভাবী ভয়াবহ অবস্থাটাকে ‘একটি ছাগলও মারা যায়নি’-র মতো একটি উটকো ও মূল ঘটনার সঙ্গে নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করে প্রকারান্তরে একটি নির্মম পরিহাসের আড়াল তৈরি করা ভিন্ন আর কীছু বলা যায় না। বিপর্যয়ের ভয়াবহতাকে পরিহাসের আড়ালে ঢেকে দিয়ে দুর্গত এলাকা ঘোষণার বিষয়টিকে বেমালুম এড়িয়ে যাওয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষা, অথাৎ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের  প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণজাত উচ্চশিক্ষা অর্জন চাট্টিখানি কথা নয়। অর্থাৎ এই শিক্ষা থেকে এক ধরনের ইস্পাৎ কঠিন ও নির্মম নিস্পৃহতার অধিকারী হওয়া একজন সচিব ব্যতীত এ দেশে আর কারও পক্ষে এতটা সাংস্কৃতিক দানবিকতায় নিজেকে পুষ্ট করা একেবারেই সম্ভব নয়। সত্যি, তাঁর এই দাপ্তরিক দক্ষতার প্রশংসা  না করে পারা যায় না।   
সচিবের মানসতার কোনও বিশ্লেষণ নেই কোনও সংবাদ বিবরণীতেই। কেবলমাত্র বলা হয়েছে, ‘দুর্যোগ ও ত্রাণ সচিবের এমন মনগড়া তথ্য শোনার পর উপস্থিত জনপ্রতিনিধি, সুধীজন, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের লোকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।’
এই ‘মনগড়া’ সত্যিকারের অর্থে কি মনগড়া? না কি এর অন্য কোনও গূঢ়ার্থ আছে? তা থাকতেই পারে। এক কবি বন্ধু বললেন, ‘একজন সচিব, তাও আবার দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের, তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন জানেন না, তা হতেই পারে না। কোনও সচিব এতোটা গোমুর্খ  নয়।  আইনটা তাঁর মুখস্ত। আইন নিয়ে করা তাঁর মন্তব্যটি ডাঁহা মিথ্যাচার এবং সেটা শতভাগ সচেতন। আমলাতান্ত্রিক অহংবোধ থেকে জাত কর্তৃত্ববোধে আসুরিক বহিঃপ্রকাশ।’ মনে পড়ল, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আমলাতন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমলাতন্ত্র মানুষকে মানুষ রাখে না। ইতর করে ছাড়ে।’ (রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি/জাগৃতি প্রকাশনী/২য় সংস্করণ/ফেব্রুয়ারি ২০০৬/পৃ-৫৯)। একই পৃষ্ঠার অন্যত্র তিনি লিখেছেন. ‘বিভ্রম সৃষ্টিতে আমলাতন্ত্র অতুলনীয়।’ সত্যি, ১৯ এপ্রিলের সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সচিবের করা এই বিশেষ মন্তব্যটি লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আমলা সংক্রান্ত বিরূপ ভাবনার মূর্ত প্রতিরূপ। মানব মনে বিভ্রম সৃষ্টির এমন মন্তব্য অনন্য ভূমিকা রাখতেই পারে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল মানব প্রকৃতি নিয়ে মিশেল ফুকোর সেই প্রবাদ প্রতিম উচ্চারণ, ‘কিন্তু কেউ ন্যয্যতার পরিভাষায় কথা বলে না, কথা বলে ক্ষমতার পরিভাষায়।’ (মানব প্রকৃতি; ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা, ভাষান্তর আ-আল মামুন, রোদ, জানুয়ারি ২০০৬, পৃ : ৯৬)। সত্যিকার অর্থেই ক্ষমতার এই ভয়ংকর বিশ্বরূপ প্রত্যক্ষ করেই অভিভূত আমরা সুনামগঞ্জবাসী। আপাতত এছাড়া আর তো কিছু করার নেই। আমাদের মহানাগরিকও তো সে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে সশ্রদ্ধচিত্তে কুর্নিশ করে কেবল বসে থাকেননি, যারা ফসলহারা সুনামগঞ্জকে দুর্গত ঘোষণার দাবিতে রাস্তায় নেমে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে চেয়েছিলেন, তাদের সে দেশপ্রেমের প্রকাশ তাঁর (মহানাগরিক) কাছে সরকারবিরোধিতা বলে মনে হয়েছে। তাই তিনি সে দেশপ্রেমকে একহাত দেখিয়েই তবে ছেড়েছেন। ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষাবলম্বন তার কাছে একটি অমার্জনীয় অপরাধ হয়ে উঠেছে। দেশপ্রেম সরকার বিরোধিতার মাত্রা পেয়ে গেছে। অদৃষ্টের পরিহাস আর কাকে বলে? একই বলে রাজনীতি।
একটু আগ বাড়িয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের ডাক সুনামগঞ্জের প্রখ্যাত আইনজীবী শহীদুজ্জামান চৌধুরীর সতর্ক ভাষ্য প্রকাশ করে। সচিব মহোদয়ের কণ্ঠনিসৃত ‘এমন মনগড়া তথ্য’ সন্নিবেশের মাধ্যমে সৃষ্ট  ‘মিথ্যার পর্দা’ বিস্তারের যে প্রচেষ্টা, সেটির রহস্য উন্মোচনকারী তাঁর (শহীদুজ্জামান চৌধুরীর) ভাষ্যটি এখানে সম্পূর্ণ উল্লেখ করছি না। আদত রহস্য উন্মোচনের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, তাঁর বক্তব্যের প্রতিপাদ্যটিকে প্রাধান্য দিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়েছে, ‘দুর্গত ব্যবস্থা আইনের ধারা  ও উপধারায় কোথাও অর্ধেক মানুষ মরতে হবে এমন কথার উল্লেখ নেই।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো উপদ্রুত এলাকায় অত্যাসন্ন অনিবার্য হয়ে উঠা মানবিক বিপর্যয় নিয়ে বিভ্রম সৃষ্টির এই স্বপ্রণোদিত প্রচেষ্টার মানে কী? এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ সন্নিবেশিত করা খুব একটা অসমীচীন হবে বলে মনে হয় না। যদিও একটু দীর্ঘ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রসঙ্গের মর্মনুধাবনের স্বার্থে সেটা সন্নিবেশিত করার লোভ সম্বরণ করতে পারনাম না।
আমলাতন্ত্রের বিভ্রম সৃষ্টির প্রকৃষ্ট একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ এর দেখা মেলে হ্যারল্ড পিন্টারের নোবেল ভাষণে। সেখানে তিনি বলেছেন, “মার্কিন কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল নিকারাগুয়ার বিদ্রোহী দল কন্ট্রাকে আরো আর্থিক সাহায্য করার ব্যাপারে। আমি গিয়েছিলাম নিকারাগুয়ার প্রতিনিধি হিসাবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি সেদিন ছিলেন ফাদার জন মেটক্যাফ। মার্কিন পক্ষে নেতৃত্বে রেমন সিটজ। (সেই সময় দূতাবাসের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, তবে পরবর্তিতে তিনি নিজেই রাষ্ট্রদূতের পদ গ্রহণ করেন)। ফাদার মেটক্যাফ বললেন, ‘স্যার, আমি উত্তর নিকারাগুয়ায় এক ধর্মীয় এলাকার তত্ত্বাবধায়ক। এ এলাকার লোকেরা একটি স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর সংস্কৃতি কেন্দ্র গঠন করেছিল। আমরা শান্তিতেই ছিলাম। কয়েকমাস আগে কন্ট্রাদের একটা দল আমাদের এলাকায় চড়াও হলো। স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সংস্কৃতি কেন্দ্র সবকিছু ধ্বংস করেছে তারা চূড়ান্ত বর্বরতায়। নৃশংসভাবে ধর্ষণ করেছে নার্স আর শিক্ষিকাদের, ডাক্তারদের জবাই করেছে। আপনি দয়া করে মার্কিন সরকারের কাছে দাবি জানান, সরকার যেন এরকম ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকা- থেকে তার সমর্থন তুলে নেয়।’
“রেমন সিটজ একজন দায়িত্বশীল যুক্তিবাদী আর অভিজাত ব্যক্তি হিসাবে প্রশংসিত। কূটনৈতিক মহলেও তিনি বেশ শ্রদ্ধেয়। তিনি শুনলেন, খানিকটা বিরতি নিলেন, তারপর গম্ভীর গলায় কথা বললেন। ‘ফাদার’, তিনি বললেন, ‘আমি একটা কথা বলি, যুদ্ধে নিরাপদ মানুষ সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ এরপর একটা হিম নৈঃশব্দ নেমেছিল ঘরে। আমরা নিষ্পলক তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাঁর কোন ভাবান্তর হয় নাই।
“নিরাপদ মানুষ, অবশ্যই সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  
“শেষ পর্যন্ত একজন বললেন, ‘কিন্তু এক্ষেত্রে “নিরাপদ মানুষ” এমন এক নৃশংস দলের নিষ্ঠুরতার শিকার যার সমর্থন করেছে আপনার সরকার। যদি কংগ্রেস কন্ট্রাদের আরো অর্থ সাহায্য করে এই রকম পাশবিক কর্মকা- আরো ঘটবে। নয় কী? আপনার সরকার কী তবে একটি স্বাধীন আর স্বার্বভৌম দেশে হত্যা এবং বিধ্বংসের সমর্থন-অপরাধে অপরাধী না ?
“সিটস নির্বিকার, ‘উপস্থাপিত তথ্যর উপর ভিত্তি করে আপনার উক্তির সঙ্গে আমি দ্বিমত প্রকাশ করছি।’ …।” (হ্যারল্ড পিন্টার/ শিল্প, সত্য, রাজনীতি/ অনুবাদ : লুনা রুশদী/নোবেল ভাষণ/ বাক্ থেকে পামুক/সম্পাদনা : হায়াৎ মামুদ/ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশন/ একুশের বইমেলা ২০০৮/পৃ : ১০৭Ñ১০৮)। এরপর মানবিকতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, বিশ্বপ্রেম ইত্যাদি মানুষের মানুষ হয়ে উঠার কোনও বোধের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন আমলাতান্ত্রিকতার নির্লিপ্ততা সম্পর্কে কাউকে বুঝিয়ে বলার আর কোন দরকার আছে কী? মনে হয় না। তবে যিনি বা যাঁরা আমাদের মহানাগরিকের মতো আমলাতন্ত্রের তল্পিবাহকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পছন্দ করেন, তাঁর বা তাঁদের কথা আলাদা।
জাদুকর জুয়েল আইচও বিভ্রম সৃষ্টি করে থাকেন, যাদু প্রদর্শন করতে গিয়ে। সে নির্দোষ বিভ্রম সৃষ্টি পৃথিবীতে আনন্দের বন্যা ছড়ায়, সমাজ পরিসরে হত্যাযজ্ঞের নির্মম প্রপঞ্চ তৈরি করে না। কিন্তু একজন দায়িত্বশীল ও যুক্তিবাদী আমলা সিটস যখন মিথ্যাচারকে আশ্রয় করে বিভ্রম সৃষ্টির মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে অভিভাবন সম্পন্ন করেন, তখন আস্ত পৃথিবীটাই একটা ভয়ঙ্কর বৈধ্যভূমিতে পর্যবশিত হওয়ার অনিবার্য সম্ভাবনা তৈরি করে। সেটা না বুঝার মতো বুদ্ধিজীবী যে তিনি নন, সেটা সকলেই জানে। ত্রাণ ও দুর্যোগ সচিব যখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন নিয়ে, জ্বলন্ত মিথ্যাকে নির্বিকারভাবে ব্যবহার করে, বিভ্রম সৃষ্টিতে নিমগ্ন থাকেন, তখন তিনি কী বুঝতে পারেন যে, প্রকারান্তরে তিনি কোটি লোকের, কল্পনায় হলেও (যেহেতু তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনটিকে কল্পনার শক্তি ব্যবহার করে বদলে দিয়েছেন), মৃত্যুর পরোয়ানা ঘোষণা করছেন। নিকারাগুয়ায় কন্ট্রা বিদ্রোহীরা মার্কিন মদদে গণহত্যা করেছিল। আর এখানে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে সচিব মহোদয়ের বিভ্রম সৃষ্টির কারণে সৃষ্ট খাদ্যাভাব সেটাই করতে পারবে। আর সচিব, তাঁর ভাষ্যমতে, সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না অর্ধেক লোক না-খেয়ে মারা যায়। অর্ধেক লোক মানে সুনামগঞ্জেই কমপক্ষে ১২ লক্ষ। ৬ জেলায় সেটা কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বুঝুন ভয়ঙ্করত্বের বিষয়টি। কোটি মানুষ মারা যাবে কেবল  এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করার অপেক্ষায়। প্রসঙ্গক্রমে কৃষান চন্দরের সেই গল্পের কথা মনে পড়ছে, যে গল্পে একটি লোক ঘটনাচক্রে গাছচাপা পড়েছিল এবং অমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তাকে যথাসময়ে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে অনিবার্যভাবেই মৃত্যুবরণ করেছিল। নির্মমতা আর কাকে বলে। যাকে বলে, যুদ্ধাবস্থা ব্যতিরেকেই একাত্তরের চেয়েও বড় একটি দুর্বিপাক সংঘটিত হতে পারে  এমন একটি খাদ্যাভাবের বিপর্যয় ভাটি অঞ্চলের ২ কোটি মানুষের ঘাড়ে তুলে দেওয়া। অবশ্য সেটা হয়নি। আমাদের জনবান্ধব সরকার দুর্গত এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করেননি বটে কিন্তু উপদ্রুত মানুষের দুর্গতিবিনাশের জন্য যাবতীয় কর্তব্য করে চলেছেন, যদিও স্বার্থান্বেষীরা তা নিয়ে বিভিন্ন লাভ-লোভের ব্যবসা ইতোমধ্যেই ফেদে বসে আছে।  
 একজন সচিব কতটা জনবিদ্বেষী হলে অবলীলায় এমন মিথ্যাচার করতে পারেন, যে-মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হলে ১ কোটির অধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। ভাবতে গিয়ে আক্কেল গুড়–ম হওয়া ছাড়া আর কোনও গত্যন্তর থাকে না, চেতনাসম্পন্ন কোনও মানবসন্তানের। জনমনে এইভাবে মিথ্যার পর্দা বিছানোর এই সচেতন প্রচেষ্টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? এই নির্মম অমানবিকতার মধ্যে ঠা-া মাথার কোনও এক খুনির মতো কতটা হিমশীতল নৃশংসতা লুকিয়ে আছে, তার পরিমাণ করার কোনও যন্ত্র পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয়েছে কী? এই জিঘাংসার কি কোনও যুক্তিসঙ্গত রাজনীতিক ব্যাখ্যা আছে? এর পেছনে কোন মানসিক বাস্তবতা অনুঘটকের কাজ করেছে? এই অশুভ প্রবণতার উৎস কী?
সচিব মহোদয় বলেছেন, ‘কোনো এলাকায় অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা করতে হয়। …জাতিসংঘ ও ইউনিসেফ যদি দুর্গত এলাকা ঘোষণার কথা বলে তা হলে সেই এলাকার প্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানাবে। মন্ত্রণালয় তদন্ত করে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে জানানোর পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি তখন সেই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করবেন।’ এই আমলাতান্ত্রিক ভাষ্যটি বোধ করি বিশ্বে এযাবৎ কাল যত আমলাতান্ত্রিক ভাষণ প্রদত্ত হয়েছে শ্রেষ্ঠত্বে সেগুলোর অন্যতম। উপসাগরীয় যুদ্ধ বাঁধানোর জন্য যখন সাদ্দামের অস্ত্রাগারে জীবন বিধ্বংসী রাসায়নিক মারণান্ত্রের মজুদ আবিষ্কারের মিথ্যাকে সত্য করে তোলা হলো, ‘অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর দুর্গত ঘোষণা’-র এই মিথ্যাচার সে মিথ্যাচরের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও কোটি মানুষের অগ্রিম মৃত্যুদ-ের সম্ভাব্যতাকে নিশ্চিত করার  মত এই ভাষ্যটি কী করে একটি নিরীহ মিথ্যাচার হতে পারে, বাঁকা বড়শির মতো প্রশ্নটি থেকেই যায় কেবল নয়, বরং অন্তরের গহীনে ভীষণ ভয়ংকর হয়ে উঠে। কল্পনা করুন, না-খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের ছয় ছয়টি জেলায়। অর্ধেক মানুষ মারা না গেলে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা যাবে না বলে বিধান দিয়ে দিয়েছেন আমাদের সচিব মহোদয়। এদিকে দুর্গত ঘোষণা করা হয়নি বলে কোন খাদ্যত্রাণ জুটছে না, অনাহারী মামুষের মুখে। আর সারা ভাটির  অর্ধেক জনসংখ্যা মানে, হিসাব মতে, কমপক্ষে ১ কোটি তো হবেই, যে-সংখ্যা একাত্তরের যুদ্ধকালে গণহত্যার তিনগুণেরও বেশি। অবস্থাটা ভাবুন একবার, বিপর্যয়টি একটি সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এটমবোমার আঘাতে হিরোশিমা-নাগাসিকোতেও এত বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যায়নি। ১ কোটি অনাহারী মানুষের মৃত্যু, কোনওরূপ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রকারান্তরে হত্যাকা-, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার চিত্তে প্রত্যক্ষ করতে প্রস্তুত এই সচিব। কেবল এই অজুহাতে যে, জাতিসংঘ ও ইউনিসেফ এখনও দুর্গত এলাকা ঘোষণার কথা বলেনি। তিনি সা¤্রাজ্যবাদের ভীষণ বশংবদ। আর সা¤্রাজ্যবাদের আরও দুই বশংবদ জাতিসংঘ ও ইউনিসেফ না বললে সচিব মহোদয় নিতান্তই নাচার। তিনি তাঁর নিজের দেশের জন্য কুটোটি পর্যন্ত নাড়তে নারাজ। সে যত লোকই না-খেয়ে মারা যাক তার কী? তিনি  আমলাতান্ত্রিক নিয়মানুযায়ী নির্বিকার নিশ্চেষ্ট থাকবেন। মানুষ হতে তার বয়েই গেছে। তিনি তো ¯্রফে আমলাতন্ত্রের একটি যন্ত্রাংশ। জন্মগত জনবিচ্ছিন্ন আমলা থাকাই তার বেশি পছন্দ। জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের ঘোষণা থেকে প্রশাসন, ধরে নিলাম জেলা প্রশাসক, প্রশাসন থেকে মন্ত্রণালয়, ধরে নিলাম সচিব, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত, তারপর মহামান্য রাষ্ট্রপতির অবগতি এবং তারপর দুর্গত এলাকা ঘোষণার ষোলকলা পূর্তি। সত্যিই চমৎকার এক গোলকধাঁধা বটে। তুলনাহীন। জাতিসংঘের অনুমোদন-স্বীকৃতি ব্যতীত কোন দেশে কোন এলাকায় দুর্যোগ অবতীর্ণ হলে সে এলাকাকে দুর্গত বলা যাবে না। চমৎকার নিয়ম। সা¤্রাজ্যবাদী বিশ্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও বিচ্ছিন্নতার পরাকাষ্ঠা আর কাকে বলে।  কোন এলাকাকে দুর্গত ঘোষণার অভিপ্রায়ে এরকম একটি অবিশ্বাস্য জটিল পথ পরিক্রমায় সম্যক পারদর্শিতা প্রদর্শন কেবল একজন আমলার পক্ষেই হয়তো সম্ভব হতে পারে। কারণ তিনি আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনযন্ত্রের একটি নাট বা বল্টু মাত্র। এখানে এই আমলাতন্ত্রের একটি সংজ্ঞা উদ্ধৃত করছি, যেখানে একজন আমলাকে সত্যিকার অর্থেই একটি যন্ত্রাংশ বলে প্রমিত করা হয়েছে। আমলাতন্ত্র হলো, ‘জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং তাদের উপরিস্থিত, বিশেষ বিশেষ কাজ চালাবার ভারপ্রাপ্ত ও সুবিধাভোগী একটা যন্ত্র দ্বারা প্রশাসন চালাবার ব্যবস্থা এবং লোকেদের তৎসংশ্লিষ্ট স্তর। শ্রেণি উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে দাসতান্ত্রিক সমাজেই আমলাতন্ত্র দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিতন্ত্রের পরিস্থিতিতে তা বিপুল আকার ধারণ করে। আমলাতন্ত্রের ধর্ম হলো বাহ্যিক অনুষ্ঠানসর্বস্বতা, নিষ্প্রাণতা, ছলচাতুরী।’ কিংবা একে আমরা বলতে পারি : জনগণকে শাসন-শোষণের একটি সার্বিক ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনাটি আসলে যা কৃত্রিম ভোগের নিরন্তর চাহিদা তৈরি, নিপীড়ন ও ধ্বংস করার কৌশল উদ্ভাবন ইত্যকার যাবতীয় অশুভ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিগণের একটি দক্ষ দঙ্গল বা যৌথতা। আমাদের আলোচ্য চরিত্রটির (মাফ করবেন সচিব মহোদয়গণ। দেশের সব সচিব হয়তো এরকম ষোলকলা বিকশিত সচিব নন। যিনি সচিব শব্দটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদিতার সমার্থক করে তুলেছেন। আর এই বিচ্ছিন্নতা জনবিচ্ছিন্নতার নামান্তর।) মধ্যে উপরোক্ত সংজ্ঞার সবকটি বৈশিষ্ট্য, বলতেই হবে, জ্বলন্ত সূর্যসদৃশ প্রোজ্জ্বল। বিশেষ করে ‘ছলচাতুরী’-র বৈশিষ্ট্যটি বেশি মাত্রায় দেদীপ্যমান। নিছক নয় বরং বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে ছলনা যদি তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য না হতো, তাহলে তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে যে শর্তটি নেই সে শর্তটি সে আইনে আছে বলে নির্দ্বিধায় কল্পনা করতে পারতেন না। মিথ্যাচারেরও একটা সীমাপরিসীমা থাকে। তিনি সেটারও ধার ধারেন না। তিনি ভুলে যান যে, পৃথিবী এখন বৈদুতিক তথ্যপ্রযুক্তির দ্বারা পরিপুষ্ট। আন্তর্জালের (ইন্টারনেট) সহায়তায় যে কেউ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ধারা-উপধারাগুলো তাৎক্ষণিক জেনে নিতে পারবেন এবং তার উল্লেখ করা ‘তাদের কোন প্রকার জ্ঞানই নেই’ আপ্তবাক্যটি মুহূর্তেই একেবারে হাস্যকরভাবে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে, তারা জ্ঞানের অধিকারী হয়ে ওঠে। একটি কথা আছে, জ্ঞানই শক্তি। এই জ্ঞানের অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে রাখাই শাসক শ্রেণির ঘনিষ্ট সাঙাত হিসেবে আমলাতন্ত্রের একান্ত করণীয়, যাকে বলে, কর্তব্য। টলস্টয়ের এই নিয়ে একটি কথা আছে, তিনি বলেছেন যে, জনগণের অজ্ঞতাই সরকারের শক্তির উৎস, সরকার এটা জানে বলেই সর্বদা শিক্ষাসংকোচনের প্রচেষ্টায় থাকে। আমাদের আমলাটি যে সে ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক, আইন নিয়ে মিথ্যার পর্দা বিস্তারে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টাই সে সতর্কতার প্রমাণ। কিন্তু তার ‘জনমনে মিথ্যার পর্দা’ বিস্তারের এবারকার অপচেষ্টাটি বেমালুম মাঠে মারা গেছে। লোকেরা সব কীছু জেনে গেছে।   
‘মিথ্যার পর্দা’ ধারণাটি শ্রীমাণ কাগজীর নিজস্ব কোনও উদ্ভাবন নয়। মিথ্যার পর্দা সম্পর্কে তাত্ত্বিক অবগতি অর্জন করতে চাইলে ২০০৫-য়ে নোবেল বিজয়ী ইংরেজ নাট্যকার হ্যরল্ড পিন্টারকে পাঠ করা জরুরি। তাছাড়া আমাদের জীবনের চারপাশে এইসব মিথ্যার পর্দা বিছানো-টাঙানো আছে, দেদার। যেমন : গোয়ালা তার টক দইকে মিষ্টি বলে, মেয়ে সন্তান জন্মের জন্য মেয়েরাই দায়ী, হরলিক্স খেলে বাচ্চা কয়েক ইঞ্চি লম্বা হয়ে যায়, গায়ে একটু লাক্স সাবানের ছোঁয়া লাগলে ছেলেরা মেয়েদের প্রেমে পড়ে যায়, বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতান্ত্রিকতার স্বীকৃতি, রাজনীতিক দল মানেই গণতান্ত্রিক, রাষ্ট্রেরও ধর্ম আছে, উর্দু একটি ধর্মীয় ভাষা, বাংলা পৌত্তলিক ভাষা, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা নয় উর্দু, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলামিক সমাজতন্ত্র, ইউনুসের ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য মোচনের একমাত্র পন্থা, অমুক বাবার দরবারের সর্বরোগহর পানি-পড়া, ইরাকি সাদ্দামের দেশে রাসায়নিক মারণাস্ত্রের মজুদ আছে, ইসলাম গেল ইসলাম গেল (এই বুলিটি পাকিস্তান আমলে বেশি প্রযুক্ত হয়েছিল) এমনি আরও কত কী।
সত্য মিথ্যা নিয়ে ১৯৫৪ সালে হ্যারল্ড পিন্টারের একটি মন্তব্য এ রকম, ‘কল্পনা ও বাস্তবের ভেতর বাধাধরা কোনও ব্যবধান নেই, যেমন নাই সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে। যে কোন কীছুতেই সত্য বা মিথ্যার দলে ফেলতেই হবে এমন নয়, অনেক কীছুই একই সাথে সত্য ও মিথ্যা।’ (হ্যারাল্ড পিন্টার/ শিল্প, সত্য ও রাজনীতি/ অনুবাদ : লুনা রুশদী/ নোবেল ভাষণ : বাক থেকে পামুক/ সম্পাদনা : হায়াৎ মামুদ/ ইতাদি প্রকাশন ২০০৮/ পৃ-১০৩)। এই মন্তব্য উদ্ধৃত করার পর তিনি লিখেছেন, ‘আমার বিশ্বাস কথাগুলি এখনো অর্থবহ এবং বাস্তবের শৈল্পিক অভিযাত্রায় আজও মানানসই। তাই একজন লেখক হিসাবে এর সমর্থন আমি করি তবে একজন নাগরিক হিসাবে পারি না। নাগরিক হিসাবে আমাকে প্রশ্ন করতেই হবেÑ সত্য কী? মিথ্যা কী ?’ পিন্টারের এই ভাষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বললে বলতে হয় যে, ‘সত্যের ধারণা সম্পর্কে আমাদের সচিব ঠিক লেখক পিন্টারের মতো, নাগরিক পিন্টারের মতো নন। পিন্টার লেখক সত্ত্বা বজায় রেখেও নাগরিক হয়ে উঠতে পারেন কিন্তু সচিব তাঁর সচিবত্ব বজায় রেখে নাগরিক হয়ে উঠতে পারেন না, তিনি সর্বদা ও সর্বত্র নাগরিকতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন। তিনি নিজেকে নাগরিকের উপরিস্থ আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রাংশ হিসাবে জনগণের উপর কর্তৃত্বের অধিকারী ভাবেন। তাই তিনি নিজেকে কর্তৃত্বের প্রতিভু প্রমাণ করে তোলার উদগ্র বাসনায় ডাঁহা মিথ্যাচার করতেও পিছপা হন না, নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারেন, অর্ধেক জনসংখ্যা মারা গেলে পর এলাকাকে দুর্গত ঘোষণার শর্ত সন্নিবেশিত আছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে। তৎপরে স্পষ্টাকারে প্রমাণিত হয় যে, তিনি একটি ‘মিথ্যার পর্দা’ বিছানোর সচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজনে ঐকান্তিকভাবে নিয়োজিত আছেন। আর এভাবে তিনি নিজেকে অনায়াসেই, এমনকি সচেতনভাবেই, একজন নৃশংস হত্যাকারী বলে প্রমিত করেন। পিন্টার বলেন, ‘অবশ্য রাজনৈতিক নেতাদের দখলে যে রাজনীতির ভাষা, তার মধ্যে এসবের বালাই নেই। কারণ এ যাবৎ যা দেখছি তাতে এরকমই প্রমাণিত হয় যে তারা সত্যে আগ্রহী না, ক্ষমতায় আগ্রহী আর আগ্রহী এই ক্ষমতার লালনে। আর ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য মানুষকে অজ্ঞতায় রাখা জরুরী, যাতে তারা সত্য জানতে না পারে, এমনকি তাদের নিজের জীবন বিষয়েও। তাই আমাদের ঘিরে থাকে মিথ্যার পর্দা, তার মধ্যেই বসবাস আমাদের। (হ্যারল্ড পিন্টার/শিল্প, সত্য ও রাজনীতি/অনুবাদ-লুনা রুশদী/নোবেল ভাষণ : বাক থেকে পামুক/সম্পাদনা : হায়াৎ মামুদ/ইতাদি প্রকাশন ২০০৮/পৃ : ১০৬)।
এই সচিবের কাছে বাংলাদেশের মানুষ গ্রামের সেই নারীটির মত, যে নারীটি কেবল মেয়ে বাচ্চা প্রসব করে আর এই মেয়ে বাচ্চা প্রসবের সম্পূর্ণ দোষটি নারীটির, মেয়ে বাচ্চা প্রসবের জন্য যে নারীর পুরুষ সঙ্গী একমাত্র দায়ী এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি নারীটিকে জানানো হয় না। বরং অত্যাচার, অজ্ঞতার অন্ধকারে পিষে মারা হয় নারীটিকে। কোন এলাকাকে দুর্গত ঘোষণা ‘অর্ধেক জনসংখ্যা মরা’-র শর্তের মিথ্যা পর্দা জনগণের চোখের সামনে টাঙ্গিয়ে দিয়ে তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকারে ফেলে রেখে পিষে মারার তথা ভয়ঙ্কর গণহত্যা সংগঠনের এমন বাসনা সত্যি স্বপ্নাতীত এক বিষয়, বিশ্বে তুলনারহিত না হলেও বোধ করি বিরল তো অবশ্যই, একটু ভাবলে বলতে হয়, সেই সঙ্গে মানবতাকে অবজ্ঞা করে একধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রকাশ্য চর্চাও বটে।
প্রকৃতপ্রস্তাবে, সচিব সেদিন কী করতে চেয়েছিলেন ? কী ছিল তার অন্তরের গভীর গোপনে? সেটা কী গণসম্মোহন সংঘটনের মতো ভয়ঙ্কর  কীছু? এর একটি উত্তর হতে পারে, গণমানুষকে অভিভাবিত করে মিথ্যার জাল বিস্তার করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন তিনি। এই ‘মিথ্যার জাল’ আর পূর্বোক্ত ‘মিথ্যার পর্দা’ এই দুটি শব্দবন্ধই  প্রকারান্তরে সমার্থক। ‘মিথ্যার জাল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশি চিন্তক যতীন সরকার। তিনি বলেছেন, ‘শ্রেণি বিভক্ত সমাজের পত্তন হওয়ার পর থেকেই কর্তৃত্বশীল শ্রেণি তার রাষ্ট্রযন্ত্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্প-সংস্কৃতি ইত্যাদির মাধ্যমে নানাভাবে মানুষকে অভিভাবিত করে আসছে। এই অভিভাবনের ফলেই শাসকশ্রেণির স্বার্থরক্ষক নানা মতাদর্শে শাসিত শ্রেণিও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, শাসকদের ভাবাদর্শেই সমগ্র সমাজের নিয়ন্ত্রক ভাবাদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। যদিও এ ভাবাদর্শ সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসিত-শোষিত মানুষের স্বার্থের অনুকূল নয়, তবুও তারা নিজের অজ্ঞাতেই এর দ্বারা চালিত হয়ে কর্তৃত্বশীল শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করে আসছে এবং এমনি করেই সমাজের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করছে। শাসক শ্রেণি যখন তীব্র সংকটের মধ্যে পড়ে তার কর্তৃত্ব হারানোর পর্যায়ে চলে যায় স্থিতাবস্থা যখন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে, তখন তারা গণমানুষকে অভিভাবিত করার জন্য নানা মিথ্যার জাল বিস্তার করে। বিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতির যুগেও বিজ্ঞানবিরোধী অযৌক্তিক ভাবধারা, বিকৃত যৌনভাবনা, কুসংস্কারপূর্ণ রহস্যবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, বর্ণঘৃণা, জাতিশ্রেষ্ঠতার তত্ত্ব ইত্যাদি দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক কোষকে আছন্ন করে ফেলার সব রকম কুৎসিত উপায় তারা খুঁজে বের করে। ফ্যাসীবাদীরা কেমনভাবে নির্জলা মিথ্যা দিয়ে, কিংবা সামান্য সত্যে প্রচুর পরিমাণ মিথ্যার ভেজাল মিশিয়ে মানুষকে অভিভাবিত করে বিকৃত ও অসুস্থ বানিয়ে ফেলে,  প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানিসহ বহু দেশে তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষও … অনেক সময় এই অভিভাবনের তোড়ে … ভেসে যায় … । (যতীন সরকার, মানবমন মানবধর্ম ও মানবজীবন, ইত্যাদি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি :  ২০১৩, পৃ : ৭৩-৭৪)।
বাংলা অভিভাবন শব্দটি ইংরেজি ঝঁমমবংঃরড়হ শব্দের বাংলা ভাষান্তর। এর একটি অর্থ করা হয়েছে সংবেশন, করেছেন অভিধানকার ধ্রুবজ্যোতি মজুমদার। তিনি যার ইংরেজি প্রতিশব্দ দিয়েছেন ঐুঢ়হড়ঃরংস। এর বহুল প্রচলিত বাংলা প্রতিশব্দ সম্মোহন। সংজ্ঞার্থ করা হয়েছে, ‘সংবেশন কর্তৃক বিশেষ ভঙ্গিতে উচ্চারিত ভাষা প্রভৃতির সাহায্যে সংবেশন পাত্রের মনে কোন ধারনা বা নির্দেশ অনুপ্রবিষ্ট করার কাজ। এই প্রক্রিয়ায় সঞ্চারিত ভাবনা প্রভৃতিকে অভিভাবন বলা হয়।’ এ বছরের সেরা রাজনীতিক অভিভাবনটি বোধ হয়, ‘কোন এলাকার অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়’। এই অভিভাবটি অবশ্যই আমলাতান্ত্রিকতার স্বরূপ প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তবে অভিনব না হলের, নির্দ্বিধায় বলা যায়, তঞ্চকতায় সেরা। অভিনব নয় এজন্য যে, পাকিস্তান আমলে ‘ইসলাম গেল’ ও বাংলাদেশ আমলে ‘বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি’ ইত্যাদি অনেক  ঐতিহাসিক অভিভাবের অস্তিত্ব একটু অনুসন্ধিৎসু হলেই, যে কারও পক্ষে, দৃষ্টান্ত স্বরূপ হাজির করা সম্ভব হবে। বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিভাবগুলির একটি হলো, যেটি উদ্ভাবিত হয়েছিল জার্মানীতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে, এবং স্বয়ং জার্মান ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলার সেটির ¯্রষ্টা। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিবন্ধক ইহুদি খেদাও।’ ইহুদি বিদ্বেষের যুক্তিহীন এই অভিভাবনটি তখন জার্মানীতে ইহুদি নিধনযজ্ঞ সংগঠিত করেছিল। সে মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের নির্মমতা পৃথিবী কখনও ভুলবে না। মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে পুরো দেশ ও পৃথিবীকে বধ্যভূমি করে তোলার সবচেয়ে বড় মাপের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের মূলে ছিল কয়েকটি মাত্র শব্দে গঠিত একটি বাক্যের পরাক্রমী অভিভাবন। আসলে অভিভাবন কি সহ¯্র সূর্যের শক্তির চেয়েও অধিক শক্তিধর?  
একটি অভিভাব প্রক্ষিপ্ত করে রাষ্ট্রেকে কোটি বিপন্ন মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনও অর্থ হতে পারে না, বললে কীছুই বলা হয় না, মনে রাখতে হবে যে, কোনও  একটি অভিভাবের সঙ্গে জনগণের জীবন জড়িত। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের আমলাতান্ত্রিকতাকে অবশ্যই বদলে দিতে হবে, রাষ্ট্রকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার আদর্শ থেকে জনবান্ধব করে তোলার দিকে ফিরিয়ে নিতে হবে। এসএসএফেরও আদর্শ হতে হবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও প্রধানমন্ত্রীকে জনবিচ্ছিন্ন না করে আরও জনসম্পৃক্ত করে তোলা।   
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।