ফসলহারা কৃষকের একরাশ দীর্ঘশ্বাসের হাহাকারে বিদায় নিতে চলেছে বাংলা ১৪২৩ সন। বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত ঐতিহ্য হলো ঘরের লক্ষ্মী অতিথিকে নানা উপচার আর হৃদয়ের ভালবাসা দিয়ে বরণ এবং বিদায় জানানো। একেকটি বাংলা সন আসে বাঙালির এমন সহজাত শুভেচ্ছাসিক্ত হয়ে, বিদায়ও নেয় একইরূপ ভালবাসার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এবার এমন এক দুঃস্বপ্নের ভয়ার্ত পরিবেশে নতুন বাংলা সন বিদায় নিতে চলেছে যখন বুকফাটা কান্না ছাড়া হাওরের বাঙালির দেবার কিছু নেই। এই রিক্ত হাওরবাসী তাই তোমাকে অশ্রুভেজা কষ্টের মাঝেই বিদায় জানাচ্ছে হে ১৪২৩ বাংলা সন।
রাত পোহালে নতুন যে অরুণোদয় হবে সেটি বর্ষপঞ্জির নতুন একটি সনÑ ১৪২৪ বাংলা সন। এই অরুণোদয় হবে একেবারেই নিরবে। হাওরের বাঙালি রমণী-পুরুষ বরণ করে নিবে না তাকে কোন আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে। কেউ নতুন পোশাক পড়ে সকালের মিঠে রোদ্দুর বা ভেজা আকাশের বৃষ্টি গায়ে মেখে গেয়ে উঠবে নাÑ এসো এসো হে বৈশাখ…। ফসলের মাঠে নতুন ধানের গোছা হাতে কোন কৃষক বধূ বিবিধ উপচারে বর্ষবরণের আনন্দ উদযাপন করবে না। কোন জনপদে বসবে না মেলা। জমবে না ষাঁড়ের লড়াই, লাঠি খেলা। বালক-বালিকাদের হুল্লুরে মেতে উঠবে না একটিও গ্রাম। একেবারেই ঘরের নির্জনে প্রাণের স্পন্দনহীন নিষ্প্রাণ আবেগে তোমার আগমন ঘটছে এই হাওরে হে ১৪২৪ বাংলা সন। তারপরেও এই অক্ষম বেদনাহত মানুষগুলো তোমার আগমনের দিকে চেয়ে আছে। জলে ভাসা হাওরের পানে কৃষক-কৃষাণীর দল একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে সোনালী ফসল হারানোর কষ্টে যেমন কাতর হচ্ছে তেমনি তোমার আগমনে নতুন এক চেতনার বিন্দু তাদের মনের ভিতরে নিশ্চয়ই এতটুকু অনুরণন তুলছে। কারণ নতুন মানেই পুরোনো গ্লানি মুছে যাওয়া, পুরাতন হাহাকার পেরিয়ে নতুন আশাবাদে জাগ্রত হওয়া। এই আশাবাদের জায়গাটিকে তোমার অমেয় আশীর্বাদে ভরিয়ে তোল হে নিরবে আসা নতুন অতিথি বুকভাঙা এই জনপদে।
১৪২৩ বাংলা সনটি এই জেলার দুই লাখ কৃষিজীবি পরিবারের কান্নার কারণ হয়ে উঠেছে একেবারেই অল্প কয়েকজন লোভী ব্যক্তির কারণে, অবশ্যই স্মরণকালের ভয়ানক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিধ্বংশী চরিত্র ছাপিয়ে আজ প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে ওইসব হিং¯্র লোভীদের অমানবিকতার কাহিনি। এদের মানুষ ভুলবে না কোনদিন। হাওরের জলে নিজের ফসলের পতনের দৃশ্যের সাথে ওইসব মানুষ নামের দানবরূপী চেহারাটিও তাদের মানসচোখে ভেসে উঠছে। কিছু জাগতিক সম্পদের কারণে ওই ব্যক্তিরা আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের অভিশাপের আগুনে পুড়ছে। অভিশাপের সাথে আজ সর্বহারা কৃষক প্রতিবাদের গর্জনেও কাঁপিয়ে তুলছে জনপদ থেকে জনপদ। বর্ষার প্রমত্ত ঢেউয়ের মতোই প্রবল বিশাল এই গর্জন। আজ বছরের শেষ দিনটি তাই জেলা সদরের রাজপথ প্রতিবাদী কৃষকদের গর্জনে ভরে উঠবে। তারা এক দাবি জানাচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের বিচার..বিচার..বিচার। নতুন বছর কি কৃষকদের মনের ভেতর থেকে উঠে আসা এই দাবি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে? এটিই দেখার বিষয়।
আমাদের সভ্যতা, উৎপাদন ব্যবস্থা, সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি প্রধানত কৃষিজাত। মাটির বুক থেকে অঙ্কুরিত সবুজ চারা থেকে ফসল ফলানো পর্যন্ত সময়ের নানা রূপ আমাদের সংস্কৃতি এবং মনোজগতকে প্রভাবিত করে। এই কৃষি ব্যবস্থার সাথে জলের বিস্তৃতি মিশে তৈরি হওয়া হাওরের সংস্কৃতি আজ নিজের অস্তিত্ব হরণ করে নেওয়া দস্যুর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। এই সোচ্চার প্রতিবাদের আছড়ে পড়া ঢেউ যেন সব দুর্নীতিবাজদের ভাসিয়ে নেয় নতুন বছরে।
- ছাতকের মন্ডলীভোগ স্কুলের দুই শিক্ষিকার বিদায় সংবর্ধনা
- ছাতকে প্রাথমিক সমাপনীতে বৃত্তিপ্রাপ্তদের ফলাফলে বাগবাড়ী স্কুল শীর্ষে

