অ্যাড. স্বপন কুমার দাস রায়
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাসত্ব আইন-১৯৫০ আমলে আসার পর ১৯৫২-৫৩ খ্রিষ্টাব্দ সন হতে এস.এ. জরীপি কার্য্যক্রম শুরু হয়। এস.এ জরীপের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন স্তর পার হওয়ার পর খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাসত্ব আইনের চতুর্থ অধ্যায় অনুযায়ী প্রকাশিত চূড়ান্ত খতিয়ানের যে কোন ক্রটি সংশোধনের ঐ আইনের ১৪৩ এ (Seetion 143A) ধারা অনুযায়ী দেওয়ানী আদালতে প্রতিকার লাভের বিধান করা হয়। ঐ ধারার অধীনে আনীত মামলার রায়/আদেশের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতে আপীলের বিধান ছিল। ১৪৩ এ ধারার অধীনে আনীত দরখাস্থ/মামলা/আপীল দায়ের ও বিচারের ক্ষেত্রে দেওয়ানী কার্য্য বিধি আইন ১৯০৮ অনুসরণের বিধান রাখা হয়। অনেক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অশুদ্ধ এস. এ রেকর্ডের বিরুদ্ধে স্টেইট একুইজিশন এন্ড টেনেন্সি এক্টের ১৪৩ এ ধারার অধীনে মামলা দায়ের ক্রমে কাক্সিক্ষত প্রতিকার লাভে সমর্থ হয়েছেন। একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৪৩ এ ধারার বিধান করা সত্বেও ভুল এস.এ রেকর্ড প্রসংগে মূল দেওয়ানী মোকদ্দমা দায়ের ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সিভিল কোর্টের এখতিয়ার ও ক্ষমতা খর্ব করা হয়নি। পবরর্তীতে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৬৪ নং অধ্যাদেশ দ্বারা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাসত্ব আইনের ১৪৩ এ ধারা বিলুপ্ত করা হয়।
এস.এ জরীপের ধকল ও যন্ত্রণা শেষ করতে আমাদের অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রায় পঞ্চাশ বছরের অধিক কাল লেগেছে। তাও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তারপর আবার চেপে বসলো রিভিশন্যাল সার্ভে সেটেলমেন্ট। সরকারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত এক শ্রেণীর অসাধু সেটেলমেন্ট স্টাফ মাঠ জরীপ ও তসদিকের নামে একজনের মালিকানাধীন জায়গা সম্পর্কে অন্যজনের নামে মাঠ পরচা/তসদিককৃত পরচা ইত্যাদি সৃজনের মাধ্যমে দুর্নীতির এক মহোৎসেব শুরু করে। দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী থেকে পিয়ন পর্যন্ত সবাই জানে রিভিশন্যাল সার্ভে সেটেলমেন্ট এর প্রকাশ্য দুর্নীতির বিষয়। কিন্তু অজানা কারণে কেউই প্রতিবাদী হয় না। সেটেলমেন্ট আমলা/কর্মচারীগণ সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালীদের কাজ করে দিয়ে তাদের আর্শীবাদ লাভ করে। পরে শুরু হয় সাধারণ কৃষকের উপর তাদের জুলুম। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে নেই কোন প্রতিকার। দুর্নীতিবাজ সেটেলমেন্ট আধিকারিকদের জন্য আছে আইনী সুরক্ষা। আজকের এ লেখার সূত্রপাত করতে হলো ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুন্যাল নিয়ে। রিভিশন্যাল সেটেলমেন্টের অধীনে প্রস্তুতকৃত চূড়ান্ত খতিয়ানের বিরুদ্ধে প্রতিকার লাভের ফোরাম হলো ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইবুন্যাল।
২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নং আইনের মাধ্যমে স্টেইট একুইজিশন এন্ড টেনেন্সি এ্যাক্ট সংশোধন করা হয় এবং এই আইনের Chapter xvIIA সংযোজন ক্রমে উক্ত আইনের ধারা 145A, 145B, 145C, 145D, 145E, 145F, 145G, 145H ও 145Iএবং আইনের অধীনে কিছু উপধারা সন্নিবেশিত করা হয়। সংযোজিত 145A ধারার অনুযায়ী ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল এবং 145B ধারা অনুযায়ী ল্যান্ডে সার্ভে আপীল ট্রাইবুন্যাল গঠনের বিধান করা হয়। আমাদের সুনামগঞ্জ জেলার ২৬/৮/২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ তারিখযুক্ত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল গঠন করেন। শুরুতে বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুন্যাল হিসাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। ইদানীং একজন বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ কে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুন্যালের বিচারক হিসাবে সুনামগঞ্জে নিয়োগ করা হয়েছে। রিভিশন্যাল সার্ভে সেটেলমেন্টের অধীনে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত কোন রেকর্ড অব রাইটস (অর্থাৎ খতিয়ান) সম্পর্কিত বিরোধ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুন্যাল কর্তৃক বিচার্য্য হবে।
স্টেইট একুইজিশন এন্ড টেনেন্সি এ্যাক্ট এর ধারা 145A (6) অনুযায়ী রিভিশন্যাল সার্ভে রেকর্ডের খতিয়ান চূড়ান্ত ভাবে প্রকাশিত হওয়ার এক বছরের মধ্যে অথবা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল গঠনের তারিখ হতে এক বছরের মধ্যে, যা পরে ঘটবে, সংশ্লিষ্ট এলাকার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যালে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক মামলা দায়ের করতে হবে। যদি উক্ত মেয়াদের মধ্যে মামলা দায়ের করা না যায় তবে এই মেয়াদ উর্ত্তীণ হওয়ার পরবর্তী এক বছরের মধ্যে বিলম্বের সন্তোষজনক কারণ উল্লেখ পূর্বক দরখাস্ত দাখিল ক্রমে মামলা দায়ের করলে মাননীয় ট্রাইবুন্যাল তা গ্রহণ করতে পারেন।
এখন আইনজীবী এবং বিচার প্রার্থী সংক্ষুব্ধ ব্যাক্তিবর্গের নিকট গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রিভিশন্যাল রেকর্ড-অব-রাইটস্ চূড়ান্ত ভাবে প্রকাশের তারিখ কোনটি এবং কি ভাবে একটি খতিয়ান চুড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয় এ নিয়ে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যালে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ আইনজীবী এবং বিচার প্রার্থী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিগণ নানা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ফলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যালে মামলা দায়েরে জটিলতা সৃষ্টি হয়। দ্য টেনেন্সি রুলস ১৯৫৫ এর সপ্তম অধ্যায়ে ষ্টেইট একুইজিশন এন্ড টেনেন্সি এক্টের ১৪৪ ধারার অধীনে রিভিশন্যাল সার্ভে সেটেলমেন্টের পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।
উক্ত রুলস এর ২৭ বিধিতে আর.এস চূড়ান্ত খতিয়ান প্রস্তুত পর্যন্ত মোট দশটি স্তরের বিষয় উল্লেখ আছে। স্তর গুলো হলো: (১) ট্রেভার্স সার্ভে, (২) ক্যাডাষ্ট্রেল সার্ভে (৩) সীমানা চিহ্নিতকরণ (৪) খানাপুরি (৫) বুজারত (৬) তসদিককরণ (৭) খস্ড়া প্রকাশ (ডি,পি) (৮) আপত্তি নিষ্পত্তিকরণ (৯) আপীল দায়ের ও নিষ্পত্তিকরণ ও (১০) চূড়ান্ত রেকর্ড প্রস্তুত প্রকাশ করা। বিধি ২৮ অনুযায়ী তসদিককরণ সম্পন্ন করা হয়। তসদিকরণ কার্যাদি সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রাজস্ব অফিসার বিধি ২৯ অনুযায়ী ড্রাফট রেকর্ড-অব-রাইটস্ (ডি,পি) প্রকাশ করেন এবং ঐগুলি কমপক্ষে ত্রিশ দিন সর্বসাধারণের অবলোকন ও অবগতির জন্য সুবিধাজনক স্থানে ঝুলিয়ে রাখবেন যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংক্ষুব্ধ কোন ব্যাক্তি বিধি ৩০ অনুযায়ী আপত্তি মামলা দায়ের করতে পারেন। আপত্তি মামলার আদেশের বিরুদ্ধে বিধি ৩১ অনুযায়ী আপীল দায়েরের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগণকে নোটিশ প্রদানের পর শুনানী অন্তে আপীল নিষ্পত্তি করা হয়। বিধি ৩১ এর অধীনে দায়েরকৃত আপীল নিষ্পত্তির পর সংশ্লিষ্ট রাজস্ব অফিসার সরকার অনুমতি গ্রহণ পূর্বক বিধি ৩২ এর অধীনে সংশ্লিষ্ট চূড়ান্ত খতিয়ান নির্ধারিত ফরমে ছাপানোর জন্য সরকারী ছাপাখানায় প্রেরণ করবেন। নির্ধারিত ফরমে চূড়ান্তখতিয়ান মুদ্রণের পর সংশ্লিষ্ট রাজস্ব অফিসার বিধি ৩৩ এর অধীনে সর্বসাধারণের অবলোকন ও অবগতির জন্য কমপক্ষে ত্রিশ দিন সংশ্লিষ্ট এলাকার সুবিধাজনক স্থানে ঝুলিয়ে রাখবেন। উল্লেখ্য যে, ছাপানো প্রত্যেকটি চূড়ান্ত খতিয়ানের ফরমের নিচে মুদ্রণের তারিখ উল্লেখ থাকে।
৩৩ বিধি অনুসারে মুদ্রিত চুড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশের পর এতে কোন ভুল বা ত্র“টি বিচ্যুতি থাকলে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনে টেনন্সি রুলের বিধি 42A অনুযায়ী সেটেলমেন্ট অফিসারের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন রেভিনিউ অফিসার ঐ খতিয়ানের ভুল বা ত্র“টি বিচ্যুতি সংশোধন করতে পারেন।
টেনন্সি রুলের বিধি ৩৪ অনুযায়ী চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশ করা হয়। ৩৪ (১) বিধি অনুসারে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিসার বিধি ৩৩ এর অধীনে ইতোপূর্বে চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশের ষাট দিনের মধ্যে নিজের স্বাক্ষর, পদবী ও তারিখ উল্লেখে চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশ করা হলো মর্মে একটি সার্টিফিকেট ঐ খতিয়ানে সন্নিবেশিত করবেন। পরবর্তীতে টেনেন্সি রুলের ৩৪ (২) বিধি অনুযায়ী সরকার সংশ্লিষ্ট এলাকা, মৌজা, বা গ্রাম ইত্যাদির নাম উল্লেখ পূর্বক সরকারী গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশ করবেন। যে তারিখে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবে সে তারিখে চূড়ান্ত খতিয়ান আইনত: প্রকাশিত হয়েছে মর্মে গণ্য করা হবে। সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট একটি দ্বৈতবেঞ্চ হোসেন আলী ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য মামলার (রীট পিটিশন নম্বর ৪৯১২/২০০৩) রায়ে অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করতে সিদ্বান্ত প্রদান করেছেন। নির্দিষ্ট ফরমে মুদ্রিত চূড়ান্ত খতিয়ানে উল্লেখিত মুদ্রণের তারিখ কোন অবস্থাই ঐ খতিয়ানের চূড়ান্ত প্রকাশের তারিখ নয়।
ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যালের রায় আদেশের বিরুদ্ধে আপীল দায়ের করতে হয় ল্যান্ড সার্ভে আপীলে ট্রাইব্যুন্যালে। স্টেইট একুইজিশন এন্ড টেনেন্সি এক্টের ধারা 145B (3) অনুযায়ী মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি সমন্বয়ে আপীল ট্রাইব্যুন্যাল গঠিত হওয়ার কথা। অদ্যাবধি উক্ত আপীলেট ট্রাইবুন্যাল গঠন করা হয়েছে মর্মে জানা যায়নি। উক্ত আইনের ধারা 145A(4) অনুযায়ী আর .এস. ফাইন্যাল খতিয়ান সম্পর্কে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল ব্যতীত অন্য কোন দেওয়ানী আদালত মোকদ্দমা করা যায় না। দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী দেওয়ানী প্রকৃতির সকল মোকদ্দমা দেওয়ানী আদালতের বিচার্য্য। এ ক্ষেতে সুস্পষ্টভাবে বিধি-নিষেধ আরোপ করলেও দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার খর্ব করা যায় না।
পরিশেষে আমি মনে করি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইবুন্যাল গঠন সরকারের একটি অপ্রয়োজনীয় ও অদূরদর্শী পদক্ষেপ। রেকর্ড সংশোধন সহ সকল ক্ষমতা দেওয়ানী আদালতে ন্যাস্ত করা জনস্বার্থে উচিৎ ছিল। হয়রানীমূলক ও দুর্নীতিগ্রস্ত রিভিশন্যাল সার্ভে সেটেলমেন্ট কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে যে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে এর কুফল সাধারণ মানুষকে বহন করতে হবে পরবর্তী কয়েক যুগ ধরে। এ দুর্ভোগের অবসান নেই। সরকারের কি শুভ বুদ্ধির উদয় হবে না?
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী।


