আইন মানেন না তিন চাকার যানের চালকরা

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জে সিএনজি চালিত তিন চাকার গাড়িতে যাত্রী পরিবহনে কোনো শৃঙ্খলা নেই। অন্যান্য জেলায় সিএনজিতে ৩ জনের অধিক পরিবহন না করলেও সুনামগঞ্জে এসব পরিবহনে যাত্রী তুলছেন ৫ জন। কোনো কোনো সময় ৬ জন যাত্রীও পরিবহন করতে দেখা যায়। সংশিষ্টরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৩ জনের অধিক যাত্রী পরিবহন বন্ধ করতে হবে সিএনজিতে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ আছে স্থানীয় বিশিষ্টজনের।
গেল মাসের ৭ তারিখ সুনামগঞ্জ থেকে জাউয়াবাজার যাওয়ার জন্য সিএনজিতে উঠেন কবি ও প্রাবন্ধিক কুমার সৌরভ। পুরাতন বাস স্টেশন থেকে সিএনজিতে উঠেন তিনি। সিএনজিতে তিনি সহ মোট ৫ জন যাত্রী ছিলেন। পেছনে ৩ জন ও সামনে চালকের দু’পাশে ২ জনকে বসানো হয়। কুমার সৌরভ বসেন চালকের বাম পাশে।
কিছুক্ষণ চলার পর সুনামগঞ্জ সিলেটের আঞ্চলিক মহাসড়কের জানিগাঁও এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা পিকআপ থেকে ধানের বস্তা তাকে বহনকারী সিএনজির সামনে পড়ে গেলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারায়। সিএনজি উল্টে তিনি গুরুতর আহত হন।
পরে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে মাথা ও পায়ে দু’দফায় অস্ত্রোপচার হয় তাঁর। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কবি কুমার সৌরভের সঙ্গে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে আলাপ হয় এই প্রতিবেদকের। দুর্ঘটনার স্মৃতি কিছুই মনে নেই তাঁর। এখন শুধু সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষা তাঁর।
শুধু কবি ও প্রাবন্ধিক কুমার সৌরভ নয়, সুনামগঞ্জ সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক কিংবা জেলা শহর থেকে উপজেলার সড়কগুলোতে যতগুলো দুর্ঘটনার শিকার হয় তার বেশিরভাগ সিএনজি চালিত তিন চাকার যানবাহনের সম্পৃক্তা রয়ে যায়।
যাত্রীরা বলছেন, যাত্রী পরিবহনে এসব যান কোনো বিধি নিষেধ মানে না। পাঁচ থেকে ছয় জন করে যাত্রী পরিবহন করেন চালকরা। বিকল্প পরিবহন সুবিধা না থাকায় বাধ্য হয়েই চলাচল করতে হচ্ছে পথযাত্রীদের।
তাহিরপুরের বাসিন্দা লিমন আহমেদ বললেন, সিএনজি তিন চাকার একটি বাহন। পেছনে দ্ইু থেকে তিনজন বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সামনে চালক বসার কথা থাকলেও চালকদের দুপাশে আরও দুজন নেয়ার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে এসব পরিবহন।
জামালগঞ্জের ফেনারবাক ইউনিয়নের গঙ্গাধরপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রভাকর সরকার বললেন, সুনামগঞ্জ একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। প্রতিদিন জামালগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ শহরে আসতে হয়। যে বেতন পাই, তা দিয়ে অন্য পরিবহনে চলাচল করা যাবে না। তাই ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন সিএনজি চালিত তিন চাকার যানে চলাচল করি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্যান্য জেলায় সিএনজিতে ৩ জনের বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয় না। সিএনজির দু’পাশে নিরাপত্তার জন্য গ্রীল ব্যবহার করা হয়। এতে সড়কে যাত্রীরা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলেও বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পান। এসব দেখভাল করেন ট্রাফিক পুলিশ।
সিএনজি- পেট্রোলচালিত ৪-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার সার্ভিস নীতিমালা, ২০০৭ এর অনুচ্ছেদ- খ. সিএনজি/পেট্রোলচালিত ৪-স্ট্রোক থ্রি-হুইলারের নীতিমালায় বলা আছে, সিএনজি অথবা পেট্রোলচালিত তিন চাকাবিশিষ্ট, ৮-স্ট্রোক ইঞ্জিন দ্বারা পরিচালিত, চালকসহ মোট ৪ জন পরিবহনের নির্দেশনা। দু’পাশে গ্রীল লাগানোর কথাও বলা হয়েছে।
সিএনজির দু’পাশে মালিকের নাম, ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর (যদি থাকে) থাকতে হবে এবং পিছনে দৃশ্যমান স্থানে অভিযোগ জানানোর জন্য পুলিশ কন্ট্রোল রুমের অভিযোগ কেন্দ্রের টেলিফোন নম্বর সর্বসাধারণের প্রদর্শনের উপযোগী করে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে।
সিএনজি অটোরিকশা চালক সংগঠনের নেতারা অবশ্য বলছেন, সিএনজিতে ৩ জন যাত্রী পরিবহনের বিধি নিষেধ থাকলেও তা মানা সম্ভব নয়। তিন জন যাত্রী নিলে ৫ জনের ভাড়া দিতে হবে যাত্রীদের। অতিরিক্ত দু’জনের ভাড়া অন্য যাত্রীরা দিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত যাত্রীদের নিতে হয়।
শাল্লা উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বলেন, আমরা সাধারণ যাত্রীরা এখনও পরিবহনের কাছে জিম্মি হয়ে আছি। দেশের কোথাও সিএনজিতে ৫ জন পরিবহন করতে দেখি নি। শুধু সুনামগঞ্জে বিভিন্ন সড়কে পাঁচ থেকে ছয় জন যাত্রী পরিবহন করতেও দেখা যায়। এটি সরকারের আইন প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মতো ঘটনা। এবিষয়ে আইন প্রয়োগকারী বাহিনী সরকারের আইন বাস্তবায়ন করার কোনো তৎপরতা আমরা দেখি না।
সুনামগঞ্জ জেলা সিএনজি চালিত অটোরিকশা মিশুক ও টেক্সীকার চালক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ছুরত আলী বললেন, আমরা সিএনজি চালকদের ৩ জন করে বহনকরতে বলে দিয়েছি। যদি যাত্রী বেশি হয়, তাহলে চালকের বাম পাশে একজন যাত্রী নিতে বলেছি।
তিনি আরও বলেন, তিনজন করে পরিবহন করলে আমাদের পুষায় না। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২ জনের ভাড়া বাকী ৩ জন যাত্রী দিতে চায় না। তাই কোনো চালক এসব বিধি নিষেধ মানেন না। গ্রীল লাগানোর মতো অবস্থা সুনামগঞ্জে হয় নি।
ট্রাফিক পুলিশের ইন্সিপেক্টর মহিবুল ইসলাম বলেন, চালকরা আর্থিকভাবে অনেক দুর্বল। তাই আমরা মানবিক কারণে সিএনজিতে ৫ জন করে যাত্রী পরিবহনে বাঁধা দেই না।