আগামী মৌসুমে হাওরের জমি অনাবাদি থাকবে?

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
আব্দুল আউয়াল ২৮ বছর ধরে কৃষি কাজ করছেন। এবার তিনি প্রায় ২৬ একর জমি চাষাবাদ করেছিলেন। যদি তিনি পুরো জমির ধান কেটে তুলতে পারতেন তাহলে দেড় হাজার মণের ওপরে ধান পেতেন। চাষাবাদে খরচ করেছেন চার লাখ ২০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে ৭/৮ লাখ টাকা আয় হতো তাঁর। কিন্তু সবটুকু জমিই পানিতে তলিয়ে গেছে। সেই সাথে তলিয়ে গেছে তাঁর সুন্দর এক আগামী। এ বছর তিনি কিভাবে চলবেন? সংসার কিভাবে চালাবেন? পরের বছর কিভাবে চাষাবাদ করবেন নাকি কৃষি কাজ ছেড়ে দেবেন? এমন প্রশ্ন তাঁর মনে বার বার উঁকি দিচ্ছে।
আব্দুল আউয়াল ধর্মপাশা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দেওলা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘আমার ২৮        
বছরের কৃষি কাজের মধ্যে ফসলহানির এমন অবস্থা কোনোদিন হয়নি। আগামী বছর কিভাবে জমিতে ফসল ফলাবো তা নিয়ে চিন্তায় আছি। একজন কাজের লোককে ৮০ মণ ধান দিতে হয় (এক মৌসুমে)। প্রতিদিন কাজ করানোর জন্য একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হয় ৩শ থেকে ৪শ টাকা। এ বছর ফসল তলিয়ে আমার যে ক্ষতি হয়েছে তাতে আগামী বছর ফসল উৎপাদনের কোনো সুযোগই থাকলো না। কারণ এ বছরের ক্ষতিইতো কয়েক বছরে কাটিয়ে উঠতে পারবো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, বিনামূল্যে সার ও বীজ দেওয়া হয় তাহলে আগামী  মৌসুমে কৃষি কাজ করতে পারবো। এছাড়া আর কোনোদিন কৃষি কাজ করতে পারবো না।’
এমন অবস্থা শুধু আব্দুল আউয়ালের নয়, ধর্মপাশা উপজেলার ৪৩ হাজার কৃষকেরই এমন অবস্থা। যার জমির পরিমাণ বেশি তার ক্ষতির পরিমাণও বেশি। ফসল হারিয়ে নিঃস্বের কোটায় দাঁড়িয়েছেন সকল কৃষক। ফলে আগামী বোরো মৌসুমে তাঁদের কেউই ফসল উৎপাদনে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। গেল কয়েক বছর ধরে হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা তাঁদের সোনার ফসল কাটার আগেই আগাম বন্যায় তা তলিয়ে যায়। কোনো কৃষকই শতভাগ ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। তাই গেল কয়েক বছর ধরে হাওরপাড়ের অনেক কৃষক কৃষি কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যারা কৃষি কাজ ছেড়ে দিয়েছেন তাঁরা ঝুঁকি এড়াতে তাঁদের জমি প্রান্তিক চাষীদেরকে বর্গা দিয়ে দেন।
এবার নির্ধারিত স্থানে বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের চন্দ্র সোনার থাল হাওরের শয়তানখালি ফসল রক্ষা বাঁধ দিয়ে পানি হাওরে ঢুকতে শুরু করে। এরপর থেকে এক এক করে উপজেলার সবক’টি হাওর ডুবতে থাকে। গত ২৩ এপ্রিল নেত্রকোনার কমলাকান্দা ও মধ্যনগর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে বড় গোড়াডোবা হাওরটি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে উপজেলার ৭৮টি হাওরের মোট ২৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসল প্রায় শতভাগ ডুবে যায়। সেই সাথে তলিয়ে যায় কৃষকের স্বপ্ন। এতে কৃষকের পরিবারের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকারগুলো অরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত উপজেলার সকল মানুষের জীবন জীবিকায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এবারের ক্ষতি কৃষক কোনোভাবেই কাটিয়ে ওঠতে পারবেন না। গরু বিক্রি করে কেউ কেউ শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করেছেন। এবার বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং অতি বৃষ্টির কারণে হাওরের ফসল ডুবে কৃষি ও কৃষকের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তাতে আগামী বোরো মৌসুম আসার আগে কৃষকের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে হাওরের শতভাগ জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের জয়শ্রী গ্রামের বাসিন্দা গৌতম চন্দ্র সরকার। তিনি জয়শ্রী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে জমির ফসল পুরোপুরি তুলতে না পারায় আমার ইউনিয়নের অনেক কৃষক কৃষি কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁরা এখন তাঁদের জমি বর্গা দিয়ে দেন। তবে এবার কৃষকের যে ক্ষতি হয়েছে তাতে আগামী মৌসুমে কোনো কৃষক কৃষি কাজ করতে সাহস দেখাবে না।’
মধ্যনগর বাজার বণিক সমিতির সদস্য আলাউদ্দিন বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। হাওরবাসীর দুঃখ দুর্দশার কথা চিন্তা করে সরকারের পক্ষ থেকে যেসকল উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তা প্রশংসনীয়। তবে কৃষকের পুনর্বাসনের বিষয়টিকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে আগামী বোরো মৌসুমে শতভাগ জমি অনাবাদি থাকতে পারে।’
মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, ‘কৃষক যদি ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারায় তাহলে সেটি শুধু হাওরাঞ্চলের জন্য অশুভ হবে না তা জাতীয় অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে।’
ধর্মপাশা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. সেলিম আহম্মেদ বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে কৃষকদেরকে রক্ষা করতে হবে। কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে সার ও বীজের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ঘাটতি সৃষ্টি হবে।’
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফরহাদ আহমেদ বলেন, ‘কৃষকেরা আজ দিশেহারা। ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক এলাকা ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। তাঁদেরকে এবারের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মোসাহিদ তালুকদার বলেন, ‘অনেক কৃষক গোখাদ্যের অভাবে তাঁর গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে আগামী মৌসুমে হালচাষ করার উপাদানের সংকট তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের জন্য ভর্তুকির মাধ্যমে ট্রাক্টরের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ ব্যবস্থায় সুদমুক্ত কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করাও জরুরি।’