স্বপন কুমার দেব
আমাদের এই সুনামগঞ্জ শহরটি প্রাকৃতিকভাবে সৌন্দর্য্যরে ভান্ডার হলেও বিনোদনের জন্য বিশেষত: মহিলাদের বিনোদনের জন্য শহরে উল্লেখযোগ্য কোন সুযোগ সুবিধা বা ব্যবস্থা ছিল না। খেলাধুলা, গান-বাজনা, থিয়েটার, যাত্রা, নাটক, আড্ডা, বাজার-সওদা সবগুলোই ছিলো মূলত: পুরুষ কেন্দ্রীক। মহিলারা কার্য্যত ছিলেন সু গৃহিণী বা গৃহবন্দী। কম বয়সী মেয়েদের অবস্থাও ছিলো প্রায় অনুরূপ। পড়াশুনা পর্ব শেষ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসার অপেক্ষায় বসে থাকা। কিছু কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিলো। তবে এ কারণে যে মহিলারা বা মেয়েরা একেবারে নিরানন্দে ছিলেন তা সঠিক নয়। তাদের নিজস্ব ঘরোয়া বিনোদন ছিলো। আজকের আলোকপাত সেই বিনোদন সম্পর্কিত। সেই সময়ে চাকুরীজীবী মহিলাদের সংখ্যা ছিলো হাতে গোনা কয়েকজন। তাও স্কুল কেন্দ্রীক। বাদ বাকী সবাই সংসার সামলাতে ব্যস্ত। তখনকার সময়ে বেশিরভাগ পরিবার ছিল যৌথ। লোকসংখ্যা অধিক থাকায় পরিবেশ ছিল সার্বজনীন। গৃহিণীদের উপর মূল ভার ছিলো হেঁসেল (রান্নাঘর) সামলানো এবং ছেলেমেয়েদের সামলানো, লালন পালন ইত্যাদি। রাঁধার পর খাওয়া আর খাওয়ার পর রাঁধা এভাবেই কেটে যেতো তাদের বেশিরভাগ দিন রাত্রি। এর মাঝেই ঘরোয়া বিনোদনের ব্যবস্থা করে নিতেন মহিলারা নিজেরাই। বাসায় বাসায় বেড়ানো ছিল অন্যতম এক বিনোদন। তখনকার সামাজিক বন্ধন ছিলো যথেষ্ট অটুট এবং আন্তরিক। ছিল এক পরিবারের সঙ্গে আরেক পরিবারের অলিখিত আত্মীয়তা। বেড়ানোকে কেন্দ্র করে গৃহিনীরা একে অন্যের সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান যেমন করতেন তেমনি সাংসারিক খুঁটিনাটি আলাপ চারিতায় মগ্ন হতেন। এ ধরণের পারিবারিক দেখা সাক্ষাত ছিলো এক ধরণের আড্ডা। এই আড্ডায় চমৎকার সব জলখাবার পরিবেশন করা হতো। তখনকার দিনে মা, মাসী, খালা, চাচীরা ও মেয়েরা যে সব জলখাবার তৈরী করতে পারতেন তা এখনকার দিনে বিরল। আজকের দিনে অনেক কিছুই বাজারে পাওয়া যায়। এখন সবচেয়ে সহজ বা চালু আইটেম হলো নুডুলস। অর্ধেক তৈরী করা প্যাকেট কিনে সামান্য নাড়াচাড়া দিলেই তৈরী হয়ে গেলো বাকিটা। কোল্ড ড্রিংকসের বোতল ও বাজারে অফুরন্ত। চা এখন নিমেষে তৈরী হয়। সেই সময়ে মহিলারা তৈরী করতেন ক্ষিরের সন্দেশ, পাটিসাপটা সহ নানা ধরণের পিঠেপুলি। সঙ্গে পান-সুপারী। ঘরে মজুদ থাকতো এসব। অতিথি আসলে পরিবেশিত হতো এসব মুখরোচক খাবার। এই সন্দেশ পিঠাপুলি বানাতে একে অন্যকে গায়ে গতরে খেটে সাহায্য করতেন। বেড়ানোর সময় ছিলো শেষ বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর অবধি। তখন শহরে ছোট রাস্তাঘাট নির্জন প্রায়ান্ধকার। তবে কোন ছিনতাই, ইভটিজিং ইত্যাদি ছিল না। একপাড়ার মহিলারা অন্য পাড়ায় সন্ধ্যার পর গেলে দল বেঁধে যেতেন। সঙ্গে থাকতেন বাসার কামলা জাতীয় একজন পুরুষ লোক। তিনি লন্ঠন হাতে আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতেন। যে সব গৃহিণীরা লেখাপড়া জানতেন তাদের আরেকটি ভালো দিক ছিলো গল্পের বই পড়া। বাসার স্কুল কলেজ পড়–য়া মেয়েরাও ছিলো গল্পের বইয়ের পোকা। গল্পের বই এক হাত থেকে আরেক হাতে ঘুরতো। লুড়ো খেলা, ক্যারাম খেলা ছিল আরেকটি চমৎকার বিনোদন। অনেক বাসায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান বাজনা হতো। বিয়ে, পার্বন, বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে মেয়েদের বিনোদনের মাত্রাও বেড়ে যেতো। ঘরে ঘরে গৃহিণী ও মেয়েরা সেলাই জানতেন। নানা ধরণের সেলাই কার্য্যে সৃষ্টি হতো অনেক অনুপম সৌন্দর্য্য। শীতের দিনে উল দিয়ে বাড়ির মহিলারা পুরুষদের জন্য সোয়েটার, টুপি, মাফলার ইত্যাদি বুনে দিতেন। এখনকার মতো বাজারে রেডিমেড্ শীত বস্ত্র পাওয়া যেতো না। শহরে সিনেমা হল চালু হওয়ার পর মহিলারা মাঝে মাঝে গিয়ে বাংলা সিনেমা দেখতেন। সিনেমা দেখার দিনটি ছিলো মহা আনন্দের। মহিলা সমিতি ছিলো। তবে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে তা ছিলো সীমাবদ্ধ। মহিলাদের শাড়ি কেনাকাটার জন্য বাহির থেকে আসা ফেরিওয়ালাদের উপর নির্ভর করতে হতো। বাদশা মিয়া ও পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গির মিয়া নামে ঢাকার দ্’ুজন ফেরিওয়ালা ছিলেন মহিলাদের কাছে জনপ্রিয়। ঢাকা রেডিও ও আকাশবানী কলকাতার কিছু অনুষ্ঠান ছিল আকর্ষণীয়। এগুলি মহিলারা আনন্দভরে উপভোগ করতেন। টিভি তখন কল্পনাতেও ছিল না। আমার মনে হয় তৎকালে মহিলাদের বিনোদনের নির্দিষ্ট গন্ডি থাকলেও তা যথেষ্ট আনন্দদায়ক নির্মল ও সুখকর ছিল। এমন দিন আর ফিরে আসবেনা।
লেখক- সিনিয়র আইনজীবী ও কথা সাহিত্যিক
- খাদিজাকে হত্যাচেষ্টায় বদরুলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
- মৌলভীবাজারে হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের বিক্ষোভ মিছিল


