`আজমিরিগঞ্জের নাম জগৎজ্যোতিগঞ্জ পুনর্বহাল করা হোক’

পি.সি.দাশ.পীযূষ
১৯৭১ সনে স্বাধীনতা যুদ্ধে জগৎজ্যোতি দাসের নেতৃত্বাধীন বিখ্যাত দাস পার্টির অন্যতম সদস্য হিসাবে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলাধীন ভেড়াডহর গ্রামের মৃত ইলক চাঁদ বৈষ্ণবের দ্বিতীয় ছেলে বীর মুক্তিযুদ্ধা বিনোদ বিহারী বৈষ্ণব বহু অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। ৭ ভাই ৩ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় । বিরাট হাইস্কুল থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখা পড়া করেন । তিনি ২২ বছর বয়সে বানিয়াচং উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের মৃত পতাকী বৈষ্ণবের মেয়ে সুভদ্রা বৈষ্ণবের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন।  মুক্তিযুদ্ধের ৩ বছর আগেই তিনি এক ছেলের পিতা হন । ১৯৭১ সনে তার বয়স ৩০ বছর। পরিবারের সবাই বালাট চলে যান । সেখানে গিয়েই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য নিজের ভাইসহ ৭ জন মিলিত হয়ে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে তারা সেন বাবু (সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) এবং গোলাম রব্বানীর সাথে দেখা করেন । নেতৃবৃন্দ তাদেরকে প্রশিক্ষণে পাঠান । বড়ছড়ায় মেজর শিখ, মেজর বাট এবং আব্দুল মোতালেব তাদেরকে প্রায় ১ মাস প্রশিক্ষণ দেন । বিনোদ বিহারী বলেন,  ‘প্রশিক্ষণ করার সময়ে জগৎজ্যোতি দাসের দাসপার্টির যুদ্ধের অনেক কথা আমাদেরকে শোনানো হয়  ।’ প্রশিক্ষণ শেষে  বিনোদবিহারীর দলের ৭ জনকে টেকেরঘাট পাঠানো হয় । এখানে এসে জগৎজ্যোতির সাথে তার পরিচয় হলে তাকে মামা বলে সম্বোধন করেন বিনোদ । সেখান থেকেই তারা বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন । টেকেরঘাটে হঠাৎ এক দিন  বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি এসে মেজর বাটকে বলেন তার দাস পার্টিতে আরো ৬ জন যোদ্ধার প্রয়োজন । তার কথা শুনে প্রায় ৩ থেকে ৪ শত মুক্তিযোদ্ধাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে তাদের মধ্য হতে ৬ জনকে টেনে নেন মেজর বাট । এই ৬ জনের মধ্যে বিনোদবিহারীও ছিলেন । পরদিন দাসপার্টির কমান্ডার জগৎজোতির কাছে তাদেকে তুলে দেন । সে দিন থেকেই তিনি  দাস পার্টির সক্রিয় সদস্য হয়ে সুনামের সাথে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিতে থাকেন । হাওর অঞ্চলে দাসপার্টির নাম শুনলেই পাক-সেনারা অতংকিত হত, সেই দাস পার্টির কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাস আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর কৈয়াগোপি নামক স্থানে  পাক-হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখযুৃদ্ধে শহীদ হলে সহযোদ্ধা বিনোদ বিহারী এই দলে থেকেই যুদ্ধে সক্রিয় থাকেন ।
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে  ভেড়াডহরে তার নিজ বাড়িতে কথা হয় বিনোদ বিহারী বৈষ্ণবের সাথে । এখন তার বয়স ৭৬ বছর ছাড়িয়েছে । শরীরটা তেমন ভাল নেই । তিনি বলেন,  দাস পার্টির মোট ৩২ জন সহযোদ্ধার মধ্যে ৫/৬ জন বেঁচে আছি । সেই ৩২ জন দাসপার্টির সদস্যের নামের তালিকাও রয়েছে  বিনোদ বিহারীর নিকট । সেই উত্তাল মুক্তিযুদ্ধের দিনের  কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন,  বানিয়াচুং, ওয়ারা জয়সিদ, ধনপুর,  ইটনা, আজমিরীগঞ্জ, জয়কলস, দিরাই, শাল্লা, শ্যামারচর, মার্কুলী, তেলঘরি, পিরোজপুরসহ  কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ টি সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন । এই সব যুদ্ধের মধ্যে মার্কুলীর  পশ্চিমে  তেলঘরির পাশে  কুশিয়ারা নদীর পানির ২ ফুট নিচ দিয়ে দুই পাড়ে রশি বেঁেধ  মাইন ফিটিং করে  পাকসেনাদের ৩ টি গানবুট ও ১ টি ট্রিমার ধ্বংস করা ।
তিনি বলেন,  সবচেয়ে স্মরণীয় পিরোজপুরের যুদ্ধ যেখানে জগৎজ্যোতি শহীদ হন । সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে  বীর মুক্তিযুদ্ধা বিনোদ বিহারী কান্নায় ঁেভঙ্গে পড়েন । তিনি বলেন, দিন তারিখ মনে করতে পারছি না তবে স্বাধীন হবার বেশ কিছু দিন পুর্বে এই ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধটি হয়েছিল। সে দিন দাসপার্টির জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে  ১৭ টি নৌকা নিয়ে প্রায় ৭০ জন মুক্তি সেনা মিলিত হয়ে  সকাল ৮ টা থেকে যুদ্ধ শুরু করে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত চলে । পাক-বাহিনী, রাজাকাররা প্রায় দেড়শ থেকে ২ শ’ হবে । ফাঁকা মাঠ এর মধ্যে কয়েকটি ছোট বড় গর্ত রয়েছে, সেখানে একটি গর্তের উঁচু আইলের নিচে জগৎজ্যোতি, বিনোদ এবং কাকাইলচেওয়ের ইলিয়াছ মিয়া সহ বেশ কয়েকজন পজিশন নিয়ে গুলি করছেন । বিরামহীন এ যুদ্ধে দাসপার্টির এক সদস্য জগন্নাথপুরের গোপেন দাস শহীদ হন  । এই সংবাদ জগৎজ্যোতি জানার পর বিনোদ বিহারীকে তিনি বলেন, ভাগনা তুমি নৌকা থেকে আরো গুলি নিয়ে আস । নির্দেশ মানতে হয়, এত গুলাগুলির মধ্যেও খুব কষ্ট করে বিনোদ বিহারী গুলি আনতে যান । এসময় বেলা প্রয় সাড়ে ৩ টা হঠাৎ একটি গুলি এসে কমান্ডার জগৎজ্যোতির ডান কাঁধের নিচে বুকের একটু উপরে লাগে । এর পরও ৫ রাউন্ড গুলি করেন এই বীর কমান্ডার জগৎজ্যোতি । বিনোদ গুলি নিয়ে এগুতে পারছেন না, বৃষ্টির ন্যায় গুলি করছে পাক সেনারা । হঠাৎ সহযোদ্ধা ইলিয়াছ বলল, দাদা সামনে যেওনা জগৎজ্যোতি নেই, তার বুকে গুলি লেগেছে, খুব কষ্ট করে তার এলএমজি টা এনেছি কিন্তু তার লাশ আনতে পারিনি । লাশ পাক সেনারা নিয়ে গেছে । এত গুলি হচ্ছে যে সেখানে থাকা সম্ভব নয় ।   
এসময় আমাদের দিক থেকে ৩টি রকেট বোমা নিক্ষেপ করা হলে পাক সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয় । এই কথাগুলো বলার সময় হাত দিয়ে তিনি বার বার চোখের পানি মুছার চেষ্টা করছিলেন ।  আর বলছিলেন মামা (জগৎজ্যোতি) গুলিতে শহীদ হবার পর তার এলএমজি টি ইলিয়াছ আমায় দিয়ে বলেছিল, দাদা এখন এই হাতিয়ার আপনি ব্যবহার করবেন । সত্যি আমি সেই সময় থেকেই মামার কথা মনে রেখে এটি ব্যবহার করতাম।
জগৎজোতি শহীদ হওয়ার পর দাস পার্টির ৩০ জন সদস্য নিয়ে মাদনা, ধনপুর, বানিয়াচুংসহ বেশ কয়েকটি অপারেশন পরিচালিত হয় । এরই মধ্যে দেশ স্বাধীন হয় । বীর মুক্তিযোদ্ধা বিনোদ বিহারী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দেশটি খুব কষ্ট করে অর্জন করা হয়েছে । কিন্তু এই স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও চোখের সামনে এলাকার কয়েকটি রাজাকার ঘুরছে দেখে খুব খারাপ লাগে ।  এই নরপশুদের বিচার  কবে হবে, মরার পূর্বে দেখতে পারলে মরেও শান্তি পাইতাম । তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশ স্বাধীন হবার পর বর্তমান আজমিরীগঞ্জের নাম রাখা হয়েছিল জগৎজ্যোতিগঞ্জ । কিন্তু  জগৎজ্যোতিগঞ্জ আবারও হয়ে গেল আজমিরীগঞ্জ, এটিই দুঃখ । একজন সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দেশের জন্য প্রাণ দিলেন কিন্তু তার নামে জগৎজ্যোতিগঞ্জ নামটি রাখতে পারলাম না, কেমন মানুষ আমরা। দাসপার্টির সদস্যদের পক্ষথেকে বিনোদ বিহারীর দাবী, আজমিরীগঞ্জের  নাম পরিবর্তন করে পুর্বের  জগৎজ্যোতিগঞ্জ করা হউক ।
লেখক: সাংবাদিক।