আজ পৌষ সংক্রান্তি

সজীব দে
অবশেষে শীত পড়ল। নেই নেই করে এখন মনে হয় ভেলকি দেখাবেন শীত বুড়ো। কুয়াশা জড়ানো সকালে সূর্য্যি মামা তার মৃদু আলোক রশ্মিগুলোকে ছড়িয়ে দিতে যেমন সময় নিচ্ছেন তেমনি দুপুর পেরিয়ে গেলে টুপ করে বিদায় নিচ্ছেন। সূর্য্যি মামার মৃদু আলোক রশ্মি মিলিয়ে গেলেই কেমন যেন এক শিরশিরানি অনুভূতি। কিছুদিন পূর্বে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অতীতের ন্যায় এবার পৌষ মাঘ মাসে শীত পড়বে না’ শিরোনামে সংবাদ দেখে যারা আতংকিত হয়েছিলেন তারা এবার আশ্বস্ত হতে পারেন। রূপসী বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে না আমাদের ষড়ঋতু। হারিয়ে যাচেছ না আমাদের ষড়ঋতুগত ঐতিহ্য-সংস্কৃতি। ঘড়ির কাঁটা ধরে ছুটে চলা জীবনে বিভিন্ন ঋতুর ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-আচার-অনুষ্ঠানের টুকরো টুকরো ছবিগুলো যে বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে।
শীতের কথা উঠল আর পিঠে-পুলির কথা হবে না, তা তো হয় না। পৌষ মাস বলে কথা। নতুন চাল, খেজুড় গুড় এসব না হলে কি বাঙালির পার্বণ জমে? সময় যতই এগিয়ে যাক, যতই ডিজিটাল হই না কেন আমরা, যতই নানান পদের খাদ্য সম্ভার বাজার দখল করুক, পিঠে-পুলি আছে      
সেই পিঠে-পুলিতেই। আদি ও অকৃত্রিম।
পিঠে-পুলি মানেই আদরের, স্নেহের আর ভালবাসার স্পর্শ। খাওয়ার সঙ্গে মধুর এই পরশটুকু জুড়ে থাকত বলেই যেন তা হয়ে উঠে অতুলনীয়। মায়ের হাতের সেদ্ধ পুলি, পাটিসাপটা, বিভিন্ন ধরণের মালপোয়া, ভাপাপিঠা, দুধপুলি,…..। সবাই মিলে গোল হয়ে বসে পিঠের স্বাদ নেয়া। পৌষ সংক্রান্তির ভোরে ¯œান, আগের দিন বানানো  (মেরামেরির ঘর) আগুন পোহানো, নগর কীর্ত্তন, গীতাপাঠ, তিল দিয়ে তৈরী নাড়–, মিষ্টি, ফল দিয়ে পূজার নৈবেদ্য ……. কত কি। বেড়ানো তো ছিলই। এখনও আগের প্রায় সবই আছে। তবে কিছু যেন একটা হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় কল্পকাহিনীর মতো টাইম মেশিনে চেপে একদিনের জন্য সেই ছেলেবেলাটা যদি আবার ফিরে পাওয়া যেতো। কিন্তু বাস্তবে তো তা হবার নয়।
২  পৌষ সংক্রান্তি নিয়ে আবার একটি পৌরানিক কাহিনীও কাহিনি আছে। কপিল মুনি ছিলেন বিষ্ণুর অবতার এবং মহান সাধক। একসময় সগর রাজা অশ্বমেধ যজ্ঞ করাকালীন সেই যজ্ঞের ঘোড়া ইন্দ্র লুুকিয়ে রাখেন কপিল মুনির আশ্রমের পিছনে। সগর রাজা তাঁর ষাট হাজার পুত্রকে পাঠান ঘোড়ার সন্ধানে। অনেক সন্ধানের পর কপিল মুনির আশ্রমে যখন তারা ঘোড়াটিকে আবিষ্কার করল তখন কপিল মুনির উপরই ঘোড়াচুরির অপবাদ দিল। কপিল মুনি এই অপমান মেনে নিতে পারলেন না। মিথ্যে এই অপবাদের ফলস্বরূপ কপিল মুনির ক্রোধে ভস্মীভূত হল সগর রাজার ষাট হাজার ছেলে। অবশেষে সগর রাজার পৌত্র ভগীরথের প্রার্থনায় শান্ত হন কপিল মুনি। তিনি ভগীরথকে উপদেশ দেন গঙ্গাকে মর্তে আহ্বান করার জন্য। একমাত্র গঙ্গার পুণ্য প্রবাহেই পাপমুক্ত হবে ভগীরথের পূর্বপুরুষেরা। কঠোর তপস্যায় বসলেন ভগীরথ। ভগীরথের একাগ্রতায় ও ঐকান্তিক ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে গঙ্গা শিবের জটামুক্ত হয়ে অবতরণ করেন মর্তে। মোক্ষলাভ ঘটে রাজা সগরের ষাট হাজার পুত্রের। সেই থেকে গঙ্গা মর্তে প্রবাহিত হন এবং সেই পুণ্যতিথিই ছিল এই পৌষ সংক্রান্তি।