নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মহান বিজয় অর্জনের ৫১ তম বার্ষিক আজÑ মহান বিজয় দিবস। সভ্যতার পর্যায়ক্রমিক পথপরিক্রমায় উনিশ শ’ একাত্তর এই জাতির জীবনে পূর্ণতার বছর। সুদীর্ঘকালের পরাধিনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার সোপানে পৌঁছে যাওয়ার ঐতিহাসিক সময়কাল ছিলো ওই বছর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এক মহান নেতার আবির্ভাব হাজার বছরের পরাধিনতা থেকে মুক্ত হতে সাহস জুগিয়েছিলো এই জনপদের মানুষকে। তাঁর প্রদীপ্ত আহ্বানে সাহসের বজ্রশিখা জ্বলে উঠে প্রতিটি মানুষের অন্তরে। পাকিস্তান বাহিনির আধুনিক সমরকৌশল আর আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে, দেশের অভ্যন্তরে রয়ে যাওয়া অসংখ্য পাক-প্রেমিকদের গর্জন আর হুঙ্কার উপেক্ষা করে সে সময় ধর্ম-বর্ণ-জাতি-শ্রেণি নির্বিশেষে এই ভূখ-ের মানুষ জেগে উঠেছিলো ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক ক্ষণকে স্বাগত জানাতে। ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ত্রিশ লাখ শহিদের জীবন, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে সবুজ জমিনে লাল সূর্য উঠেছিলো বাংলাদেশের স্বাধীন আকাশের বুকে। বাঙালি ও ভূখ-ের অন্যান্য জাতিসত্ত্বার জীবনের সবচাইতে গৌরবময় অর্জন এই বিজয় দিবস। এই পবিত্র দিনে আজ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেইসব শহিদানদের যাঁদের তাজা রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ নামের দেশটি বিশ্বসভায় নিজের পরিচয়কে উদ্ভাসিত করেছিলো। বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাই স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর অমর স্মৃতির প্রতি, সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের প্রতি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি।
স্বাধীনতার চেতনাগত অবয়বের বাইরে এর দৃশ্যমান একটি বাস্তবতা থাকে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সেই রূপময়তা পরিস্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো। ওই ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছিলো সাম্য, ন্যায্যতা ও প্রগতির ভিত্তিতে মাতৃভূমি পরিচালনার দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার। আমরা বিজয় অর্জনের পর ৫০ বছর অতিক্রম করে এসেছি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক জায়গায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু ওই ন্যায্য, সাম্য আর প্রগতির প্রশ্নে যদি অগ্রগতির হিসাব করি তাহলে স্পষ্টতই হতাশ হতে হবে। সুষম উন্নয়নের পরিবর্তে গোষ্ঠী বিশেষের উন্নয়নের চিত্র আজ হতাশার সাথে লক্ষণীয়। একটি শক্তিমান লুটেরা শ্রেণি কীভাবে দেশের সম্পদ হরণ করছে তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর দরকার নেই। মানুষের মনোজগতে এখনও আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার প্রভাব সেইভাবে লাগতে দেখি না। উল্টো ধর্মীয় উগ্রপন্থা, সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও দুর্বৃত্ত-মানসিকতা প্রকট হয়ে উঠতে দেখি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে আজ হতাশা গ্রাস করে। কিন্তু একথাও সত্যি, দেশটি স্বাধীন হয়েছিলো বলেই আমরা অন্যান্য বহু জায়গায় যেমন উন্নয়নের গর্ব করতে পারি তেমনি একই সাথে আমাদের আকাক্সক্ষার কথাগুলোও দ্বিধাহীনভাবে উচ্চারণ করতে পারছি।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন টালমাটাল। সামনের বছরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন স্পষ্টত দ্বিধাবিভক্ত। সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষমতার পালা বদলের একটি গ্রহণযোগ্য উপায় উদ্ভাবন করতে না পারাটাও আরেক হতাশার নাম। কেউ কাউকে এখন আস্থায় নিতে পারছে না। এরকম পরস্পরবিরোধী অবস্থান স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার পরিবর্তে নিত্যনতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটিয়ে চলেছে। এই রাজনৈতিক বৈরী অবস্থান থেকে সকলকে মুক্ত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি। একটি স্বাধীন দেশে জনগণের ইচ্ছানুরূপ সরকার বাইরের অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করবে, দেশটি পরিচালিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে, এখানে কোনো রাজনৈতিক দলই ধর্ম ও সম্প্রদায়কে বিভক্ত করে রাজনীতি করবে না; এমনটাই ছিলো প্রত্যাশিত। কিন্তু তা হয়নি। অর্ধ শতক পরে এ নিয়ে কথা বলার অর্থ হলোÑস্বাধীনতার মূল চেতনাকে আত্মস্থ করতে না পারার শামিল। আজকের বিজয় দিবস হোক এই বিভক্তি দূর করার অপরিমেয় শক্তির উৎস।
- বর্ডারহাট জমজমাট করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে- ভারতীয় হাই কমিশনার
- স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েও মুক্তিযোদ্ধা নন তাঁরা


