আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। এই দিবসটিকে আগে শহীদ দিবস হিসাবে আখ্যায়িত করা হত। জাতিসংঘ কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখকে পৃথিবীর সকল ভাষাভাষীর মাতৃভাষার অধিকারকে স্বীকৃতি স্বরূপ আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেয়ায় দিবসটির নাম পরিবর্তিত হয়েছে। মূলত দিবসটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে থাকে। দিবসটির আন্তর্জাতিকীকরণের মধ্য দিয়ে এর ভিতর আমাদের প্রগতিশীল-জাতীয়তাবাদী যে আবেগ লুক্কায়িত ছিল সেটি কেন জানি কিছুটা এখন মলিন হয়ে পড়েছে। একুশের নামে এখন ক’জন বাঙালির বুকে অনুরণন তৈরি করে, আদৌ করে কি-না, সে প্রশ্ন এখন করা যায় অনায়াসে। দিবসটি আমাদের দেশে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার স্মারকচিহ্ন হলেও এর মাধ্যমে মূলত আমাদের আত্ম-জাগৃতির উদ্বোধন ঘটেছিল। আমরা ওই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই নিজেদের জাতিত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করেছিলাম। পাকিস্তান তৈরির সময় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের যে তমসাচ্ছন্ন চেতনার আমদানি করা হয়েছিল সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে আয়নায় নিজের চেহারা দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল ভাষা আন্দোলন। আমরা দেখেছিলাম এক সমৃদ্ধ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী কীভাবে ঐতিহাসিক কাল থেকে নিজেকে ভুলে অধীনতা নামক শামুকের ভিতর আটকে পড়েছিল। শামুক ভেঙে মুক্তো বের করে আনার প্রথম বিকশিত ও পূর্ণাঙ্গ প্রয়াস ছিল এই আন্দোলন। মূলত ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে আমরা স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে চলেছিলাম যা একাত্তরে এসে এক ধরনের পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। এসব হিরন্ময় উত্তরাধিকারিত্বের কারণেই একুশ আমাদের পরিপুষ্ট চেতনার ভিন্ন-নাম হয়ে উঠেছিল। তাই এই দিবস আসলেই বাঙালি মাত্র বিশেষ ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে উঠতেন। সেই ভাবাবেগে যে এখন ভাটা পড়েছে তা বলে বুঝানোর দরকার নেই, বাস্তবতা দেখলেই সম্যক ধারণা হয়।
কেন এই আত্ম-বিস্মৃতি, কেন চেতনার স্রোততধারায় শ্যাওলার আস্তরণ? সময়ের প্রবহমানতার কারণে মানুষের চিন্তা বদলায়, ভাবনার রঙ পরিবর্তন হয়, নতুন ভাবনানুষুঙ্গ সামনে আসে। এই বদলগুলো যদি ইতিবাচক ধারায় ঘটত তাহলে একে আমাদের শাস্বত সেই চেতনার শাণিত অবস্থা বলা যেত। কিন্তু তা তো নয়। সব বদলই যে ঘটে চলেছে অন্য এক রূপে। যেখানে জাতিত্বের অহংকার মিশে গেছে পরাক্রমের আধিপত্যের কাছে। আমরা সকলে মিলে যে বৃহৎ বাঙালি সমাজের রূপ দেখেছিলাম সেখানে অনেক খোপ তৈরি করে ফেলা হয়েছে। একে অপরের নিকট থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আস্তে আস্তে গভীর একাকিত্বের আগ্রাসনে আমাদের সামাজিক সত্তার লয় হতে চলেছে। অন্যদিকে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা যেসব অপআদর্শকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম সেইসব অপআদর্শের প্রবল পুনর্জাগরণ ঘটে চলেছে। জাতির ভিতরকার ভ্রাতৃত্ববোধ তিরোহিত হয়ে সেখানে কেবলই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নিরবচ্ছিন্ন চর্চা দেখে চলেছি। বাঙালি শাসনামলে বাঙালির বৈষম্য বেড়েছে আকাশ প্রমাণ। শাসনের নামে শোষণের তীব্রতা বাড়িয়েছি। নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ বৈষম্য এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছি যার তুলনা করা চলে আকাশের সাথে পাতালের। এমন বাস্তবতায় একুশের দুর্মর চেতনা যে প্রাণের সাড়া নিয়ে সামনে আসবে না তা বলা বাহুল্য।
তবু একুশ আমাদের অহঙ্কার। সালাম-রফিক-বরকত-জব্বার-সফিউর প্রমুখ আমাদের স্বাধীন সত্তার এক একটি রক্তনালী। তাঁদের অমর আদর্শ এখনও আমাদের আশাবাদী করে। আমরা ভীষণভাবে সেই বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশ হবে সবধরনের মন্দ প্রপঞ্চমুক্ত। রাঙা প্রভাতের সবুজ জমিনে দিগন্তজোড়া প্রাণোচ্ছল হাসির মুক্তো ঝরা এই দেশ হবে আমাদের, আমাদের সকলের। এই চিরন্তন প্রত্যাশায় ভাষা আন্দোলনের সকল শহিদানদের অমর স্মৃতির প্রতি আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।

