সজীব দে
১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। আজ সারা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণির শোষণ ও বঞ্চনা শৃঙ্খল ভাঙার শপথ গ্রহণের দিন। সৌভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের দিন। বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির স্বার্থে যে বাজার অর্থনীতি চালু করা হচ্ছে সেখানে পুঁজির মুনাফা ছাড়া শ্রমিক শ্রেণির প্রতি কর্তব্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক ন্যায় বলে কিছু নেই। ওকুপাই ওয়ালস্ট্রিটের আন্দোলন তাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, ‘তোমরা এক শতাংশ, আমরা নিরানব্বই।’
বর্তমানে কৃষি এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। এক দিকে ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি অন্য দিকে গ্রামীণ ক্ষেত্রে ফসলহানি, কর্মহীনতা আজ গ্রাম্য জীবনে অভিশাপ ডেকে আনছে। সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের ৭০ ভাগ কৃষক সমাজকে নিয়ে গঠিত হলেও দেশের অর্থনৈতিক জীবনে তার অংশ ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদনের খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু সে ফসলের দাম পাচ্ছে না। কৃষি আজও প্রকৃতি নির্ভর। তারপর দুর্নীতি, অনিয়ম, খরা, বন্যা নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, প্রতিবছরই লক্ষ লক্ষ কৃষককে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে। সরকারি ঋণের অপ্রতুলতায় সুদখোরের কাছ থেকে অসম্ভব বেশি হারে ঋণ নিয়ে হচ্ছে বিপর্যস্ত। কৃষক সমাজই আজ শুধু আক্রান্ত নয় তাদের কাছে গ্রামীণ সর্বহারা খেতমজুর, অগণিত অকৃষি মজুর গ্রাম্য কারিগর সবাই আজ চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার শিকার। জোতদার-মহাজনী-এনজিও চড়া সুদের শোষণে আরো অনেক কৃষককে ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে শহরে পাড়ি জমাতে হবে। অনেককে পেশা পরিবর্তন করতে হবে বা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবেন। আর হাওর অঞ্চলের জেলেরা তো এমনিতেই মাছ ধরার অধিকার থেকে বঞ্চিত। কারণ বিল-ফিসারী মুনাফা লোভী ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণে। তাই জেলেদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। এ ই সংকটের জন্য দায়ী দুর্নীতি-অনিয়ম আর সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা লুটেরা বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে হবে শ্রমিক, কৃষক ও জেলেদেরকেই।
বর্তমানে জনগণের বৃহত্তম অংশই কৃষক সমাজ যারা গ্রামীণ সমাজের নির্ধারক শক্তি। সেই শক্তিকে জাগরিত করেই গড়তে হবে কৃষি বিপ্লব। তাই কৃষকসমাজকে সামন্তবাদী, চিন্তাচেতনার বেড়াজাল থেকে উদ্ধার করেই তাকে মৌলিক পরিবর্তনের চেতনার আঙিনায় টেনে আনতে হবে। সেই প্রয়াসে শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই মে দিবস পালন করার কর্মসূচিতে শ্রমিকশ্রেণিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে কৃষি সমস্যার প্রতি। রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের সংগ্রামে জনগণের গণতান্ত্রিক দল গঠনের যে রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা সেই ক্ষেত্র শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বেই গড়ে তুলতে হবে। সেই দল যেখানে কৃষক সমাজ হবে তার ঘনিষ্ঠতম মিত্র। শ্রমিক কৃষক মৈত্রীই হবে সংগ্রামের মূল শক্তি। তাই মে দিবসের উদ্যাপনে শ্রমিক শ্রেণিকে সেই শ্রেণি মৈত্রীর কথা মাথায় রেখেই তার সংগ্রামের পরিকল্পনা তৈরি করতেই হবে।
আজ কৃষক সমাজের বাঁচার লড়াই হচ্ছে সর্ববৃহৎ গণসংগ্রামের ক্ষেত্র। এই লড়াইকে বাদ দিয়ে কোনো পরিবর্তনের লড়াই সফল হবে না। নব উদারবাদী নীতির শিকার সমস্ত মেহনতি মানুষের বাঁচার লড়াইকে যুক্ত করাই আজ মে দিবসের আহ্বান। খেতমজুরদের সারা বছর কাজ ও মজুরির লড়াই, গ্রামীণ কারিগরদের জীবন জীবিকার লড়াই, অসংগঠিত অকৃষি মজুরের বাঁচার লড়াই আজ দেশের আন্দোলনের এজেন্ডা। এই লড়াই সমগ্র দেশকে আন্দোলিত করতে পারে, পরিবর্তনের পথ তৈরি করে দিতে পারে, দেশে গণসংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। তাই শ্রমিকশ্রেণীকে রুটি রুজির সংগ্রামের সঙ্গে, মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে খাদ্য সুরক্ষার জন্য সংগ্রামের সঙ্গে, শ্রমিকের অধিকার রক্ষার লড়াই এর সঙ্গে গ্রামীণ জনগণের মহা সংগ্রামকে যুক্ত করতে হবে। শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর বুনিয়াদের উপর এই মহাসংগ্রাম তোলাই হোক আজকের মে দিবসের শপথ।


