বিশেষ প্রতিনিধি
শাল্লার যুদ্ধাপরাধ মামলার আলোচিত আসামী জুবায়ের মনিরের জামিন না মঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠিয়েছেন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক আদালত। রোববার জামিন শুনানীর দিনে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট বিচারিক বেঞ্চ এই রায় দেন।
গ্রেপ্তারকৃত আসামি জোবায়ের মনির অসুস্থতা দেখিয়ে ঢাকায়ই থাকবেন এমন শর্তে আদালত থেকে জামিন নিয়েছিলেন। ঈদের আগের দিন সুনামগঞ্জের শাল্লায় বাড়িতে এসে তিনদিন থেকে তিনি নৌবিহার করেছেন। মামলার সাক্ষীদের বাড়ির সামনে এসে বাহিনী নিয়ে আনন্দফূর্তির পাশাপাশি হুমকি ধমকিও দিয়ে গেছেন। এই খবর জাতীয় ও স্থানীয় কয়েকটি দৈনিকে ছাপা হলে গত চার আগস্ট আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম লিখিতভাবে আদালতের শর্ত ভঙ্গ করার বিষয়টি অবহিত করেন আদালতকে।
রোববার জোবায়ের মনিরের জামিন শুনানীর ধার্যদিনে তার আইনজীবী তাকে আদালতে হাজির করলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহীনুর ইসলাম ও বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদারের সমন্বয়ে গঠিত বিচারিক বেঞ্চ জোবায়ের মনিরের জামিন না মঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম জানান, জোবায়ের মনিরকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন আদালত। কিন্তু তিনি শর্ত ভঙ্গ করে শাল্লায় যান এবং মামলার স্বাক্ষীদের নানাভাবে ভয়ও দেখান। আমাদের পক্ষ থেকে কয়েকটি জাতীয় পত্রিকার এই সংক্রান্ত সংবাদ সংযুক্ত করে বিষয়টি লিখিতভাবে আদালতকে অবহিত করা হয়। আদালত পরে জামিনের শর্ত ভঙ্গ করায় জোবায়ের মনিরকে জেল হাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।
ট্রাইব্যুনালে একাত্তরে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে ২০১৬ সনে জোবায়ের মনির, তার ভাই প্রদীপ মনির ও চাচা মুকিত মনিরসহ যুদ্ধাপরাধে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ দায়ের হয়। ওই বছরের ২১ মার্চ অভিযোগের তদন্তকাজ শুরু করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
পেরুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাসের দায়েরকৃত মামলায় ২০১৮ সনের ২০ ডিসেম্বর জোবায়ের মনির, জাকির হোসেন, তোতা মিয়া টেইলার, সিদ্দিকুর রহমান, আব্দুল জলিল, আব্দুর রশিদসহ অভিযুক্ত ৬ যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ দায়েরের পরই আমেরিকায় পালিয়ে যায় অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী জুনেদ মনির, যুদ্ধাপরাধ মামলায় দ-প্রাপ্ত কামরুজ্জামানের আইনজীবী ও ইসলামি ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি শিশির মনিরের বাবা মুকিত মনির। ২০১৯ সালের ১৭ জুন তদন্তসংস্থা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জোবায়ের মনিরসহ ১১ জন জড়িত বলে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করে। এদিকে গ্রেপ্তারের পরেই জোবায়ের মনির নানাছুতোয় জামিনের চেষ্টা করে। অবশেষে গত ফেব্রুয়ারিতে আদালতকে অসুস্থতার সাজানো তথ্য দিয়ে জোবায়ের মনির ‘টাওন জামিন’ মঞ্জুর করিয়ে নেয়। শর্তমতে রাজধানির বাসায় অবস্থানের নির্দেশনা দিয়ে জামিন মঞ্জুর করা হলেও সুস্থ জোবায়ের মনির প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে এলাকায়ও। এবার ঈদুল আজহার আগে শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে এসে ঈদের জামাত আদায়সহ একাধিক পশু কোরবানি দেন জোবায়ের। এছাড়া ঈদের পরদিন স্পিডবোট ও নৌকা নিয়ে নৌবিহার করে আনন্দ ফূর্তি করেন তিনি। তার নৌবিহারের নৌকাটি যুদ্ধাপরাধ মামলার স্বাক্ষীদের বাড়ির কাছে এসে পরোক্ষভাবে হুমকি ধমকি দিয়ে গেছে। অনেককে প্রলোভনও দেখিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে, শর্তসাপেক্ষে পাসপোর্ট জমা দিয়ে জামিন নিয়ে বাইরে এসে নৌবিহার, আনন্দভ্রমণ এবং মামলার স্বাক্ষীদের ভয়-ভীতি দেখানোর খবর পেয়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইনব্যুনালের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারকে বিষয়টি অবগত করেন। পরে দিরাই ও শাল্লা থানার ওসি সরেজমিন পরিদর্শন করে এই বিষয়ে মাননীয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে রিপোর্ট করেন বলে জানিয়েছেন, এই মামলার আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি নূর হোসেন।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম জানান, পুলিশের রিপোর্ট আমরা রোববার পর্যন্ত পাইনি। আমরা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ আদালতকে দেখিয়েছি। আদালত সেটি গ্রহণ করেছেন এবং আসামী জোবায়ের মনিরের জামিন না মঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেনন।
প্রসঙ্গত. ১৯৭১ সনের ৪ ডিসেম্বর উজানগাঁওয়ের আব্দুল খালেকের নির্দেশে পেরুয়া, উজানগাও, শ্যামারচরে ভয়াবহ গণহত্যা, অগ্নিসংযোগসহ যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত হয়। শ্যামারচর বাজারের স্কুলের সামনে ২৭ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। পরে কয়েকটি গ্রামে প্রায় ৩ শতাধিক প্রশিক্ষিত রাজাকার বাহিনী দিয়ে নারীদের ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে। এই গণহত্যায় নেতৃত্ব দেয় আব্দুল খালেকের ভাই মুকিত মনির, কদর আলী, ছেলে প্রদীপ মনির জুনেদ, জোবায়ের মনিরসহ প্রশিক্ষিত রাজাকার বাহিনী। ১৯৭২ সনে কদর আলীকে দালাল আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।


