আদালত অবমাননার দায়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে দোষী সাব্যস্ত করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করে অনাদায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের আট সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ আদেশ দেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এ রায় নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক।
গত ৫ মার্চ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির আদেশ পাওয়া মীর কাসেম আলীর আপিল মামলা পুনরায় শুনানির দাবি জানান। ওই শুনানিতে প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন।
দুই মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। তাদের বক্তব্যকে অসাংবিধানিক বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেওয়াকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবীরা। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে একজন যুদ্ধাপরাধীর মামলা নতুন করে শুনানির দাবি করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দুই মন্ত্রীর ওপর বিরক্ত হয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, দুই মন্ত্রী দোষ স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির যে আবেদন করেছেন তা তারা গ্রহণ করতে রাজি নন। তবে অভিযুক্ত মন্ত্রীরা প্রথম সুযোগেই নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ায় শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত উদারতা দেখিয়েছেন বলে আদেশে বলা হয়েছে। দুই মন্ত্রীকে সাত দিনের মধ্যে দুটি হাসপাতালে জরিমানার টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এই রায় রিভিউ করার জন্য আবেদন করছেন বলে জানিয়েছেন। মন্ত্রীর এই রিভিউ আবেদন দাখিল করার বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। তবে কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন এবং সে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এর আগে ঘটেছে কি না তার উদাহরণ পাওয়া কঠিন।
আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। এখানে কারও হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই। রবিবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত দুজন মন্ত্রীকে তাদের মন্তব্যের জন্য আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে যে রায় দিয়েছেন, তাতে কয়েকটি দিক পরিষ্কার হয়েছে। প্রথমত, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান, সবাই দেশের আইন মেনে চলতে বাধ্য-এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে মন্ত্রীদের জন্য বিশেষ কোনো মর্যাদা নেই, এটি প্রমাণ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিচারাধীন মামলা নিয়ে (অবাঞ্ছিত) মন্তব্য করা যে আদালত অবমাননার শামিল, সে সত্যটি সবাইকে পুনরায় কঠোরভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আদালতের বিচারপতিরা কোনো ব্যক্তি নন, তারা সম্মিলিতভাবে একটি প্রতিষ্ঠান। বিচার বিভাগ এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার শেষ আশ্রয়স্থল। মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে দুই মন্ত্রীকে যদি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হতো, তাহলে বিষয়টি দৃষ্টিকটু নজির হয়ে থাকত। দুই মন্ত্রীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করাটা ঐতিহাসিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচার বিভাগের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব রক্ষা করা দেশের প্রতিটি অঙ্গেরই কর্তব্য ও দায়িত্ব। এ বিষয়টি সাধারণ নাগরিক ও নির্বাহী বিভাগের সবাই মেনে চলবেন, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
- সদর-দক্ষিণ-দোয়ারা ২৬ ইউনিয়নে ১৫৮৮ প্রার্থীর মনোনয়ন জমা
- সাজাপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের নিয়ে আলোচনার ঝড় সর্বত্র

