বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট
বাংলাদেশ নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা মামলার রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকলেও সিলেটে এ ঘটনায় বিস্ফোরক মামলার বিচার চলমান রয়েছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিস্ফোরক মামলার বিচার চলাকালে ২০১০ সালের ২ আগষ্ট রাষ্ট্রপক্ষে সিলেটের সরকারি কৌসুলির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। হত্যা মামলায় দ-াদেশ পাওয়া চারজনও এ মামলায় অভিযুক্ত। সিলেটের সরকারি কৌসুলি (পিপি) মিসবাহউদ্দিন সিরাজ এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, বিস্ফোরক মামলার ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ২০ জন সাক্ষ্য গ্রহণের পর আদালতের নির্দেশে সিআইডি মামলার অধিকতর তদন্ত করছে। এ মামলা ছাড়াও সিলেটে মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে আদালতে বিচারাধীন আছে আরও চারটি মামলা। এ চারটি মামলা হলো, ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যার ঘটনায় করা দুটি মামলা, ২০০১ সালে সিলেটে নির্বাচনী জনসভায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলা এবং একই বছর সিলেটের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন কামরানকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলার মামলা।
আনোয়ার চৌধুরী বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলি ইউনিয়নের প্রভাকরপুর গ্রামে তাঁর পৈতৃক বাড়ি। ২০০৪ সালের ১৫ মে বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হলে তিনি দৃষ্টি কাড়েন সাধারণ মানুষের। তাঁর নিজগ্রাম থেকে শুরু করে সিলেটজুড়ে গর্বের সঙ্গে সমাদৃত হন। ২১ মে তিনি সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ) এর মাজার জিয়ারতে আসছেন শুনে দরগাহ জামে মসজিদে সেদিন মুসল্লি বেশি ছিলেন। আনোয়ার চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ ছিল অনেকের। জুমার নামাজ শেষে মাজার জিয়ারত করে বের হওয়ার মূহুর্তে দরগাহের প্রধান ফটকের নিকট পৌঁছালে তাঁকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা হয়।
হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হন। আনোয়ার চৌধুরী, সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল হোসেন, জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত আবদুল হাই খান, স্থানীয় সাংবাদিক মুহিবুর রহমানসহ ৭০ জন আহত হন।
ওই দিন দরগাহ জামে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে মুসল্লিদের সঙ্গে ছিলেন দরগাহের অন্যতম খাদেম মুজাহিদ হোসেন। হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ। এগিয়ে গিয়ে দেখেন ভয়াবহতা। মুজাহিদ হোসেনের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে দরাগাহের মূল ফটকের পাশে। ফটকের কাছেই গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। পরদিন সন্ধ্যাবেলা মুজাহিদকে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। একদিন পর আবার ছেড়ে দেওয়া হয়।
আলোচিত এ ঘটনার রায় সর্বোচ্চ আদালতে বহাল থাকার প্রতিক্রিয়ায় মুজাহিদ হোসেন বুধবার বলেন, ‘এত দিন হয়ে গেছে, কিন্তু মনে হয় সেদিনের ঘটনা। এখনও চোখে ভাসে ভয়াবহতা। ঘটনাটি নিয়ে জল গোলা করার অনেক চেষ্টাও হয়েছে। দেরিতে হলেও প্রকৃত অপরাধী বের করে বিচারের মুখোমুখি করা এবং সর্বোচ্চ আদালতেও দ- বহাল থাকায় স্বস্তি পাচ্ছি। এ স্বস্তি পূর্ণতা পাবে রায় কার্যকরে।’
ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন সিলেটের স্থানীয় একটি পত্রিকার সাংবাদিক মুহিবুর রহমান। পেশায় তিনি একজন আইনজীবীও। সিলেটের আদালতে এ মামলা চলাকালে একজন সাক্ষীও ছিলেন মুহিবুর। তিনি বলেন,‘শরীরে এখনও স্প্রিন্টার আছে। এত বড় ঘটনা, কিন্তু বিচার দীর্ঘ হওয়ায় শরীরের চেয়ে মনের যন্ত্রণা বেশি ছিল। এ যন্ত্রণার অবসান হওয়ার সুযোগ এলো এখন।’
পুলিশ ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার রাতেই সিলেট কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) প্রদীপ কুমার দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন। তদন্তের জন্য তৎকালীন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (পুলিশ পরিদর্শক) এস এ নেওয়াজি। ২০০৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত ঘটনার নয়দিনে তদন্তকালে নয়জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আটকদের মধ্যে বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিতে স্থানান্তর হয়।
সিআইডিও প্রথম দিকে তদন্তে নেমে ঘটনা ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। আ.লীগের নেতা-কর্মীদের আটকের পর এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে প্রবাসী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করতে সিআইডি সিঙ্গাপুর পর্যন্ত গিয়েছিল। এমন কি আনোয়ার চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের সদস্যদের অনুসন্ধান করে সিআইডিসহ গোয়েন্দারা। এ নিয়ে তখন বিরূপ প্রতিক্রিয়ারও হয়েছিল।
গোলাপগঞ্জে কোটালিপাড়ায় বোমা হামলার ঘটনায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ-হুজির শীর্ষ জঙ্গি মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হলে তাঁর দেওয়া স্বীকারোক্তি থেকে আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জঙ্গি সংশি¬ষ্টতার তথ্য উদঘাটন হয়। ২০০৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সিলেট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় হুজির সিলেট অঞ্চলের সংগঠক শরিফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন ওরফে রিপন নামের দু’জনক জঙ্গিকে। আদালতে এ দুজন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে।
২০০৭ সালের ২৯ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের তৎকালীন এএসপি মুন্সী আতিক আদালতে হুজির জঙ্গিদের দায়ী করে আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক দুটো মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। আদালতে মামলার বিচার চলাকালীন সময়ে গত ১১ মার্চ সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) ও সর্বশেষ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জুবায়ের আহমদ আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে অভিযুক্ত চার আসামির সঙ্গে জঙ্গি মইনুদ্দিন ওরফে আবু জান্দালকে অভিযুক্ত করা হয়।
আদালতে ওই সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল হলে পরে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পুনরায় নেওয়া হয়। মোট ৫৮ জনের মধ্যে ৫৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর হত্যা মামলার রায় দেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক শামীম মো. আফজাল।
রায়ে হুজি’র শীর্ষ জঙ্গি মুফতি হান্নান, শরিফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল, দেলোয়ার হোসেন ওরফে রিপনকে ফাঁসি, দুই জঙ্গি মুফতি মইনুদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ও মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়।


