আপনাদের দুঃখ-দুর্দশায় আমরা পাশে আছি-প্রধানমন্ত্রী

বিন্দু তালুকদার
হাওর এলাকার মানুষ ফসলহারিয়ে দুঃখ-দর্দশায় আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বৃষ্টি ও বন্যায় তাদের ফসল নষ্ট হয়েছে। আমরা তাদের পাশে আছি। আমি নিজে হাওরে ফসলহানির পর সুনামগঞ্জের শাল্লায় গিয়েছি। মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেছি। সহায়তা দিয়েছি। সরকার হাওরবাসীর পাশে আছে।
গতকাল রবিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুনামগঞ্জে ‘দুর্গম হাওর এলাকায় সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প’র উদ্বোধন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকদের সঙ্গে মতবনিমিয়কালে তিনি এসব কথা বলেন। গণভবন    থেকে তিনি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং ওই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।
হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শুধু ফসলের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। হাওরের ফসল বারবার অকাল বন্যার কবলে পড়ে। ফসলের ঝুঁকি আছে। তাই মাছের উৎপাদন বাড়াতে হবে। ভাসমান সবজির চাষ করতে হবে।
সুনামগঞ্জের সঙ্গে তাঁর নিজের জেলা গোপালগঞ্জের মিল আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ হাওরের জেলা আর গোপালগঞ্জে আছে বাঁওর। এই দুই জেলার মিল আছে। তাই সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার উন্নয়নে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি ঘরকে আলোকিত করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,‘ বিএনপি দেশের মানুষকে বিদ্যুৎ দিয়েছিল ১৬০০ মেগাওয়াট; আমরা এখন বাংলাদেশের মানুষকে দিচ্ছি ১৬ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। দেশের ৮৩ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ পায়। প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে সোলার প্যানেল দিচ্ছি। আমরা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে চাই। তাই দুর্গম, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় সোলার প্যানেলের মাধ্যমে আমরা বিদ্যুৎ দিচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,‘ গত বার বৃষ্টি-বন্যায় মানুষের ফসল নষ্ট হয়েছে। আজকে এখন বৃষ্টি হচ্ছে; আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি কেউ যেন কষ্ট না পায়। বিদেশ থেকে আমরা খাদ্য আমদানী করে সরবরাহ করছি। হাওরের মানুষের জন্য আমরা সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানুষের জীবনটা যেন সহজ হয়। মানুষ যেন সুখে থাকতে পারেন ও উন্নত জীবন পায়। বাংলাদেশের প্রতি মানুষের ঘরে ঘরে আমরা আলো জ্বালাবো। আমরা সুষম উন্নয়নে বিশ্বাস করি। ’
প্রধানমন্ত্রী এর আগে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় ‘দুর্গম হাওর এলাকায় সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প’র উদ্বোধন করেন। শাল্লায় উপজেলা হবিবপুর ইউনিয়নের সাসকাই গ্রামে এই প্রকল্পের অবস্থান। চারটি গ্রামের চারশ পরিবার এই সোলার বিদ্যুতের সুবিধা পাবে। ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে।
প্রকল্পের উদ্বোধনের পর সুনামগঞ্জ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম। জেলা প্রশাসক এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে সুনামগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগের একটি হলো ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া। সেই লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন কাজের অংশ হিসেবে হাওরপ্রধান শাল্লায় ৪০০ কিলোওয়াট সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধনে হাওরকন্যা সুনামগঞ্জবাসী আলোকিত হবে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনে শাল্লাসহ সুনামগঞ্জবাসী উজ্জীবিত হয়েছে। বিজয়ের মাসে সুনামগঞ্জের মানুষ স্বপ্ন দেখছেন ২০৪১ সালের মধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গঠনের।’
 এরপর প্রধানমন্ত্রী দুর্গম হাওরে সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্পের একজন সুবিধাভোগীর বক্তব্য শুনতে চান। তখন বক্তব্য দেন শাল্লা উপজেলার সাসকাই গ্রামের সুবল চন্দ্র দাস।
সুবল চন্দ্র দাস প্রধানমন্ত্রীকে বলেন,‘এক সময় বিদ্যুতের বাতি দেখতে হলে আমাদের সুনামগঞ্জ শহরে আসতে হতো। বিদ্যুত আমাদের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। কোনোদিন ভাবিনি বিদ্যুৎ পাবো। ঘরে বিদ্যুতের বাতি জ্বলবে। আমরা বিদ্যুৎ পেয়ে খুবই খুশি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম. এ মান্নান, সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা, সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমাস মিসবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক যুগ্ম সচিব মোখলেছুর রহমান সরকার, বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব এ.টি.এম মোস্তফা কামাল, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান, পৌর মেয়র আয়ুব বখত জগলুল, পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান, সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম. এনামুল কবির ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামরুজজামান, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম, ছাতক উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাছির উল্লাহ খান, দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মহুয়া মমতাজ, জেলা উদীচীর সভাপতি শীলা রায়, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে, দিলীপ কুমার মজুমদার, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সৈয়দ শায়েক আহমদ, পিপি অ্যাড. ড. খায়রুল কবির রুমেন, অ্যাড. মতিউর রহমান পীর, চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ সভাপতি আমিনুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা হায়দার চৌধুরী লিটন, সিরাজুর রহমান সিরাজ, করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল, মোবারক হোসেন, জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহবায়ক বিন্দু তালুকদার, জেলা শ্রমিক লীগের আহবায়ক সেলিম আহমদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সোয়েব চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহমদ অপু প্রমুখ।
এছাড়াও শাল্লার হবিবপুর ইউপির ওই সোলার বিদ্যুতের উপকারভোগীদের বেশ কয়েকজন সদস্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।  
উল্লেখ্য, ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে শাল্লার হাওরপাড়ের ৪ একর ভূমির উপর ‘দুর্গম হাওর এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানী নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন পাইলট প্রকল্প’ নির্মাণ করা হয়েছে। এই প্রকল্প থেকে ৪০০ জন গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ পাবেন। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান রহিমা আফরোজ এই প্রকল্পের কাজ করছে। এই প্রকল্পে ২৩২২ টি সোলার প্যানেল ও ৫৪০ টি ব্যাটারী ব্যবহার করা হয়েছে। ৬ কিলোমিটার লাইনের মাধ্যমে প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ পাবে হবিবপুর ইউনিয়নের আগুয়াই, শ্বাসখাই বাজার, বিলপুর, সরসপুরসহ ১৬ টি গ্রামের ৪শ’ পরিবার। প্রকল্প থেকে মিটার সংযোগ দেয়া হবে পল্লী বিদ্যুতের নিয়মে। তবে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকায় ঝড়-বৃষ্টিতেও বিদ্যুৎ পাবেন ওই গ্রাহকরা। প্রত্যেক গ্রাহককে সংযোগের জন্য প্রাক্কলন ব্যয় ৭০৩ টাকা ও নিরাপত্তা জমা ৩৭৫ টাকা দিতে হবে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।