আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখায়

কোনো সমাজে যখন অন্যায্যতার ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায় তখন একটি অন্যায় কাজকে আরেকটি অন্যায় কাজের উদাহরণ দ্বারা হালকা করার চেষ্টা করা হয়। রাজনৈতিক বাহাস বা তর্ক-বিতর্কের টেবিলে এমন কা- আমরা প্রতিদিন দেখে থাকি। বর্তমান সময়ের অনিয়ম বা বিচ্যুতিকে অতীতে সংঘটিত একই ধরনের অনিয়ম ও বিচ্যুতির উদাহরণ দিয়ে জায়েজ করার প্রবণতা দেখি। এক্ষেত্রে যার গলার জোর যত বেশি, যিনি কথা বলায় কৌশলী ও পটু; তিনি প্রতিপক্ষের তুলনামূলক দুর্বল কণ্ঠকে সহজেই চেপে ধরতে সক্ষম হন। এসব আলোচনায় কখনও অতীত প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সামনের দিনে কীভাবে একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করা যায় সে নিয়ে কোনো কথা হয় না। এই ধরনের আলোচনার উদ্বেগ ও আতঙ্কের জায়গা হলোÑ চলমান সংকটকে গভীর থেকে গভীরতর গর্তে নিক্ষেপ করার এক ধরনের সচেতন প্রয়াস। বলাবাহুল্য বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এই অতীত দিয়ে বর্তমানকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার অপচেষ্টা বহুদিনের পুরনো চর্চা। এ থেকে আশু উত্তরণের কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়।
সম্প্রতি ঋণের দায়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৩ কৃষকের গ্রেফতার প্রসঙ্গটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার উপলক্ষ হয়ে এসেছে। সেখানে ২৫ হাজার টাকা করে ঋণ গ্রহণের পর সেই টাকা পরিশোধে অসমর্থ হওয়ায় সমবায় ব্যাংক নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলার কারণে ৩৭ কৃষকের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। এই বিষয়টি গত দুই দিন ধরে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হচ্ছে। কৃষকদের বিরুদ্ধে মাত্র ২৫ হাজার টাকা ঋণ খেলাপীর জন্য মামলা করা ও গ্রেফতার হওয়াকে অমানবিক বিষয় হিসাবে সামনে এনে কতিপয় লুটেরা কর্তৃক বিভিন্ন ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুপাট করার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অক্ষমতাকে ধিক্কার জানানো হয়েছে। অন্যায্যতার ভরপুর একটি সমাজে এমন সমালোচনা হওয়াটা অসংগত নয়। বরং একেবারেই স্বাভাবিক। এই প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো একইসাথে এই কথা প্রমাণ করে যে সর্বত্র অন্যায্যতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠলেও অন্তত কিছু মানুষ ও প্রতিষ্ঠান এখনও সংবেদনশীল হৃদয় নিয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে ভয় পায় না। আইনত ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সেই টাকা সময়মত পরিশোধ না করাও অপরাধ বটে। সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করার উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে বকেয়া টাকা পরিশোধের গ্রহণযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিলেই কেবল তাকে সুযোগ প্রদান করা যায়। সমস্যা হলো, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার বদভ্যাসটি কেবল উপরের স্তরের গুটিকয় লুটেরাই রপ্ত করেনি এটির যে সামাজিকীকরণ হয়ে গেছে সারা দেশে ছোট ছোট ঋণের খেলাপী হয়ে উঠাও এর বড় প্রমাণ। অর্থাৎ নৈতিকতার অবক্ষয় উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সমান আগ্রাসী চরিত্র ধারণ করেছে।
এই সর্বনাশের জায়গা থেকে উত্তরণের পথ হলো সর্বত্র ন্যায়ানুগ আচরণের দৃষ্টান্ত তৈরি করা এবং ওই কাজটি শুরু করতে হবে উপরের স্তর থেকে। বড় খেলাপী ব্যক্তিদের সাজা নিশ্চিত বা রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় ন্যস্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারলে তার রেশ সমাজের সর্বত্র পড়বে। এজন্য দরকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকার, বিশ্বাস ও প্রয়োগের জায়গায় দৃঢ়তা প্রদর্শন। যারা রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালান আদতে এই দায়িত্ব তাদের। কথায় আছে, আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখায়। এই কথাই মানতে হবে। ক্ষমতা চর্চার প্রতিটি স্তরে নিজেরা সদাচরণ নিশ্চিত করলে কোনো সাধারণ কৃষকও অযৌক্তিকভাবে গ্রহণ করা ঋণ খেলাপী করবেন না। যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সামান্য টাকার জন্য কৃষকের হাতে হাতকড়া পরাতে পারে তারা কবে বিশাল পরিমাণ টাকা মেরে দেয়া কিংবা খেলাপী প্রভাবশালীদের সাথে একই আচরণ দেখাতে পারবে?