উজানধল ঘুরে এসে ইয়াকুব শাহরিয়ার
আনন্দের বাজার যেন। যে দিকে তাকাই শুধু মানুষ। মেলায় দোকান বসেছে বেশ। ঘুরে ঘুরে দোকানগুলো দেখছি। উজানধলের ধল গ্রামের মাঠ দু’দিনের জন্য আলোক সজ্জায় সেজেছে। দোকানপাট বসেছে শহরের মতো। খুব প্রয়োজন ছাড়া যে গ্রামের মানুষ সাধারণ সময়ে রাত দশ এগারোটা অবধি জেগে থাকেন না, সে গ্রামে সারারাত কয়েক শ’ দোকানের বেচাবিক্রি চলছে। চারদিকে মানুষ, হৈ-হুল্লোড়, ক্রেতা, দর্শনার্থী এবং গানবাজ বা গান পাগল কিছু মানুষের ভিড়। প্রতি বছরের ১৫ ও ১৬ মার্চের প্রতীক্ষায় থাকেন উজানধল গ্রামের মানুষ। শুধু যে উজানধলের মানুষদের জন্যই এ সময়টা বিশেষ তা কিন্তু নয়, গানপ্রিয় শিল্পী শ্রোতা-দর্শকদের জন্যও প্রতীক্ষার।
বলছিলাম, গীতিকবি, সুরসাধক, ভাটির মহাজন, নতুনধারার গানের ¯্রষ্টা, গানপাগল মানুষ, অসংখ্য জনপ্রিয় গানের লেখক বাউল স¤্রাট শাহ আবদুল করিমের বাড়ি উজানধলের লোকউৎসবের কথা। এবছর বাউল স¤্রাটের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশাল আয়োজন ছিলো। ছিলো অনেক রকমের আনন্দের ব্যবস্থা। আনন্দের ঝর্ণাধারা যেন খেলে বেড়ায় আয়োজনের প্রতিটি পরতে পরতে। দোকানগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় আনন্দের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। ভালোবাসার মিষ্টিপানের দোকানগুলো যেনো বস্তুত ভালোবাসাই বিলিয়ে দেন মানুষের মাঝে। আর বগুড়ার স্বর্ণ বেচা মামারা যেন আক্ষরিক অর্থে অতি দরিদ্র, সাধারণ মানুষের মাঝে ছয় মাসের গ্যারান্টি দিয়ে বিক্রি করেন ‘আনন্দধারা।’ দাম ৩০ টাকা।
দিরাই উপজেলার উজানধলে যাওয়ার জন্য আমার প্রস্তুতি দু’সপ্তাহ ধরে। আঞ্চলিক একটি প্রবাদ আছে যে, ‘আফসোসের ভাত ফুটিচাউলা হয়।’ ঠিক তেমনি এত আগে থেকে প্রস্তুত থাকার পরও করিম লোকউৎসবের প্রথম দিন ইচ্ছা থাকা সত্বেও যেতে পারিনি। জানা যায়, এদিন বাংলাদেশের অত্যন্ত সুপরিচিত শিল্পী সৈয়দ আশিকুর রহমান আশিক ও পাগল হাসানসহ অনেক গুণী শিল্পীরা গান করেছেন। মানুষও ছিলেন প্রচুর। প্রথম দিন না গেলেও সমাপনীর দিন গেলাম। মোটরসাইকেল যোগে সন্ধ্যায় যাত্রা শুরু করি পাগলা বাজার থেকে। উজানীগাঁও পয়েন্টে গিয়ে মনস্থির করি প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে দেখে হাওরের বুকের উপর দিয়ে যাবো। হাওরের রাস্তা দিয়েই চললাম। কী চমৎকার দৃশ্য। আমার যাত্রা সঙ্গী রাজু। মির্জাপুর হয়ে নোয়াখালী বাজারের গিয়ে উঠলাম। তাড়াতাড়ি হলো না, পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করলে ৫/১০ মিনিট দেরি হয়েছে। তবে একটা জিনিস খুবই নজর কাড়লো। জামলাবাজ-নোয়াখালী সেতুটি। খুব দ্রুত ব্রিজের কাজটি হচ্ছে। কোন রকমের যাত্রা বিরতি না দিয়ে কর্ণগাঁও পয়েন্টে গিয়ে থামি। ক্যালসিয়াম নামক অসাধারণ স্বাদযুক্ত গরম পানীয় পান করলাম আমরা। এতো স্বাদ রাজু ভুলতে পারছিলো না। দ্রুত উঠে পড়ি এবং ধলের উদ্দেশে রওয়ানা দেই।
দিরাই পৌঁছে প্রেসক্লাবে একবার পাঁচ মিনিটের জন্য ঢুঁ মারি। দিরাই প্রেসক্লাবের সদস্য ইমরান হোসেন ভাই তার কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে বসেছিলেন। আথিতেয়তা দেখালেন খুব। রাস্তা চিনবার সুবিধার্থে একজন মানুষ সাথে দিতে চাইলেন। আমরা তাঁর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে চা পান করে উঠে পড়ি। রাস্তা চেনাজানা না থাকায় বার বার মানুষকে জিজ্ঞেস করছিলাম। অত্যন্ত ন¤্রভাবে, বিনয়ী ভাব নিয়ে লোকজন আমাদের সহযোগিতা করলেন। রাস্তা ‘বাতিয়ে’ দিলেন। বিশাল হাওরের কাঁচা সবুজ ধানক্ষেতের উপর দিয়ে গাড়ি চালাতে থাকলাম। ৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম ধল গ্রামের মাঠে। রাস্তা ভালো কিন্তু প্রধান বিপত্তি হচ্ছে ধুলা। যাই হোক, ধুলার সাগর মাড়িয়ে হলেও আমরা পৌঁছলাম উজানধলের মাঠে। দূর দেখে কে বলবে, এটা মেলা? মেলা তো নয় যেন নিশাচর শহরের সব বিজলি বাতি। যেখানে গাড়ি পার্কিং করবো সেখানকার লোকজনও খুব ভালো ব্যবহার করলেন। আমাদের গাড়ির সিরিয়াল নাম্বার পড়েছিলো ৭। নিরাপদে গাড়ি রেখে প্রথমেই মনস্থির করলাম আগে শাহ আবদুল করিমের বাড়ি ঘুরে দেখা যাক।
মেলার ও গানের আসর থেকে বাউল স¤্রাটের বাড়ি পায়ে হেঁটে ৫/৭ মিনিটের রাস্তা হবে। তবে আমরা পথ চিনি না। আমাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে গেলেন পঞ্চাশোর্ধ আবু মিয়া। তাঁর বাড়ি দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামে। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতে অন্ধকারে পথ চলছি আমরা। আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রূপালী চাঁদের আলো। আহা! কী মনোরম দৃশ্য। দূর থেকে চোখে পড়ে করিম শাহের বাড়ির ‘মরিচবাত্তি’। আলোর ঝলমলানি দেখে এগুচ্ছি। লোকের সারি বইয়ে চলেছে ‘সাববাড়ি’ পর্যন্ত। ভক্তদের ভাষায় করিম শাহের বাড়িই হচ্ছে সাববাড়ি। তাঁদের জন্য এ সাববাড়ি হচ্ছে তীর্থস্থান। আমরা পা রাখি করিম শাহের বাড়িতে। কত মানুষ। লোকে গিজগিজ করছে। সবাই চাইছেন করিম পুত্র শাহ নূর জালাল করিমের সাথে দেখা করতে, কথা বলতে। কেউ কেউ পায়ে ধরে সালাম করছেন, কেউ হাতে চুম্বন করছেন। সিলেট, ঢাকা থেকে আগত মেহমানসহ সকলেই চেষ্টা করছেন ছবি তুলতে। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম ভিড়ের এককোণে। কিছুক্ষণ পর তিনি ইশারা করলেন আমার দিকে। যেন কত চেনা, অথচ এই প্রথম উজানধলে যাওয়া আমার। কথা বললাম, পরিচয় দিলাম। তিনি খুব আথিতেয়তা দেখালেন এবং একজন তরুণ বয়সের ভক্তকে ডেকে এনে আমাদের দু’জনকে পাঠালেন সেবাখানায়। খিচুড়ি খেতে। সাব বাড়ির খিচুড়ি। পাশের ঘর। আমরা গেলাম। চোখ ছানাবড়া! এতো মানুষ? সবাই খাচ্ছেন, অধীর আগ্রহ নিয়েই খাচ্ছেন। তরুণ ভক্ত আমাদের বসানোর ব্যবস্থা করলেন এবং আলী হোসেন নামের এক খাদিমের কাছে আমাদের হস্তান্তর করেন। আমরা খাওয়া শেষ করি। সাদ্দাম নামের পাগল কিসিমের এক লোক আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সব সময়। মেহেমানরা খাচ্ছে কী না তা খেয়াল রাখছেন। আমরা মাজারে গেলাম। অতি সরলভাবে যেখানে শুয়ে আছেন বাউল স¤্রাট আর তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী সরলা। মাজারের পুরো ঘরটিকে সাজানো হয়েছে চমৎকারভাবে। ভালো লাগার একটি দৃশ্য। মনটা ভরে গেছে। তারপর দেখলাম শাহ আবদুল করিম স্মৃতি জাদুঘর। ভিতরে ঢুকে মনটা শীতল হয়ে গেলো। করিম শাহের সকল ব্যবহার্য জিনিস, পোষাক, বাদ্যযন্ত্র, ছবিসংগ্রহ, পালঙ্ক, হুইল চেয়ার, ক্রেস্ট, সম্মাননা সনদ প্রভৃতিতে ভরপুর এক ঘর। দশ টাকা করে বিশ টাকায় দুইটি টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করি আমরা। বাহিরে ছবি তোলাসহ বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটে এ জায়গায়।
শাহ আবদুল করিম স্মৃতি জাদুঘর থেকে বেরিয়ে মাটির রাস্তায় দেখা হয় হবিগঞ্জ জেলার জলসুখা গ্রামের বিখ্যাত বাউল আবদুর রহমানের সাথে। তিনি প্রায় ৩৬ বছর সময় কাটিয়েছেন বাউল করিমের সান্নিধ্যে। বাউল স¤্রাটকে কত কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। কত সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনার সময় কেটেছে স¤্রাটের সাথে। তাঁর কাছে জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম- এতোদিন কাছ থেকে তো শাহ আবদুল করিমকে দেখলেন, তাঁর সুখ-দুঃখও উপলব্ধি করেছেন। তাঁকে কেমন দেখেছেন? কেমন দর্শন ছিলো তাঁর লেখায়? প্রশ্ন শুনার পরই চোখমুখ ছলছল করে উঠলো গুণী এ শিল্পীর। তিনি বললেন, কেউ যদি পৃথিবীতে সরলতার সংজ্ঞা খুঁজেন তাহলে তিনি যেনো বাবা করিম শাহকে পাঠ করেন। তাঁর গান শুনেন। তিনি খুবই সরল ছিলেন। তিনি গানে মানুষের কথা বলতেন। নিজেকে ভালোবাসার কথা বলতেন। বাবাজী বলতেন, নিজেকে ভালোবাসো, বিশ্বাস করো। নিজেকে মানতে পারলেই তো আল্লাহ্, ইশ্বর পাওয়া যায়। গানে গানে বাবাজী বলতেন-
আপনাকে ভালোবাসি
বিশ্বাস করে হও সাহসী
আপন ঘরে মক্কা-কাশী
আছে গোপনে।।
এই যে গানের দর্শন তা শুধু মানব জনমের জন্য। তিনি মানুষকে খুব ভালোবাসতেন। জীবন নিয়ে তিনি খুব ভাবতেন। মানুষে মানুষে বিবেধ তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান সব কিছু মানুষের জন্যই ছিলো। তাই তো তিনি এতো সরল গলায় গাইতেন-
মানুষকে ভালোবেসে হোক না জীবন অবসান।
খুব সরল ভাষায় লিখতেন তিনি। তার গানের কোনো কথাই কাউকে জিজ্ঞেস করে উত্তর জানতে হয় না। শুনা মাত্রই বুঝা যায়। খুব সহজ সরল ভাষায় তিনি লিখতেন। গানের সুর ছিলো একবারে মাটি ও মানুষের। আমি দেখতাম, তাঁর যা মনে হতো তা-ই তিনি লিখে ফেলতেন। জীবনবোধের কথাই তিনি লিখেছেন বেশি। তিনি সারল্যের সাথে কিঞ্চিৎ জিজ্ঞাসু মনে ¯্রষ্টাকে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছেন-
জিজ্ঞেস করি তোমার কাছে বলো ওগো সাঁই
এ জীবনে এতো দুঃখ কে দিয়েছে কেনো তাই?
দোষ করিলে বিচার আছে
সেই ব্যবস্থা রয়ে গেছে
দয়া চাই না তোমার কাছে
আমরা উচিৎ বিচার চাই
দোষী হইলে বিচারে
সাজা দিবা তো পরে
এখন মারো অনাহারে
কোন বিচারে জানতে চাই।।
কিছু দূর এগিয়ে যাই আমরা। সঙ্গীতালয়ের সামনে। আবার দেখা হয় নূর জালাল করিম ভাইয়ের সাথে। তাঁর সাথে ছিলেন বানিয়াচং উপজেলার মুরাদপুরের গানপুর এলাকার আজগর আলী। তাঁর সাথে আবদুল করিমের খুবই ঘনিষ্ট সহচর (বর্তমানে তিনি প্যারালাইজড অবস্থায় আছেন) উজানধল গ্রামের বাসিন্দা মো. বেলাল উদ্দিনের স্ত্রীও ছিলেন। তাঁরা সমস্বরে বলেন, আবদুল করিম শুধু কি আধ্যাত্মিকতা আর ¯্রষ্টাকেই তিনি গানের সুর কথায় খুঁজেছেন? না। তিনি গানে গানে মুক্তির পথও খুঁজেছেন। লিখেছেন-
আমি চলি আমার ভাবে
আমি যাহা বুঝি
দুঃখে গড়া জীবন নিয়ে
মুক্তির পথ খুঁজি।।
স¤্রাট করিমের জীবনের নিদারুণ আক্ষেপের কথাও বলেছেন জলসুখার শিল্পী আবদুর রহমান। তিনি বলেন, বাবা আমাকে প্রায়ই বলতে। দেখিস আবদুর রহমান- আমি না থাকলে আমার হাড্ডি নিয়াও মানুষ ব্যবসা করবে। রহমান বাউল বলেন- আবদুল করিমের যেসব গান আমরা শুনি তা হচ্ছে সকল গানের সামন্য একটা অংশমাত্র। অসংখ্য গান রয়ে গেছে। যাদের সঠিক সুর এখনো মানুষের কাছে পৌঁছায় নি। বাবার বাড়িতে যে সঙ্গীতালয় হয়েছে সেখানে যদি কার্যক্রম শুরু করা যেতো তাহলে হয়তো নতুন করে আরো কিছু সম্পদ বিশ্ববাসী জানতে পারতো। এই সঙ্গীতালয়টি দ্রুত চালু করা দরকার।
ভক্তদের কাছ থেকে দাবিদাওয়া আর আক্ষেপের কথা শুনে চাঁদের রূপালী আলো গায়ে মেখে আমরা ছুটে চলি অসংখ্য গানের জ¦্যান্ত স্বাক্ষী কালনী নদীর পাড়ে। আধডোবা গোটাকতক নৌকা, চাঁদের আলো আর হিমশীতল বাতাস। অসম্ভব মনোরম দৃশ্যের অবতার হয় সেখানে। মন ফিরতে চাইছিলো না। তবু আমরা ফিরে এলাম। করচ বাগান হয়ে যখন আসছিলাম তখন কতিপয় ‘সিদ্ধিবাবাদের’ আসরে চোখ আটকে গেলো আমার। তাদের সাথে কিঞ্চিৎ ভাব বিনিময়ের চেষ্টা করি। কিন্তু তারা কেউই আমাদের বিশ্বাস করতে চাইলেন না। তবু তাদের এক আসরে বসে একজোড়া গান শুনি। সিদ্ধির গন্ধে একটা গান শুনে পলায়ন করি। গাঁজার এ আসর না থাকলে বেশ ভালো হতো। তখন গানের আসর থেকে ভেসে আসছে ঘোষণা। বাউল করিম পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার সরকার দারুণ উপস্থাপনা করছিলেন। গান শুরু হবে হবে ভাব। চললাম গানের আসরের দিকে।
মেলার দোকানপাটের এক কোণা দিয়ে আমরা আসরে প্রবেশ করি। কত মানুষ। লোকারণ্য ধল মেলার মাঠ। ক্রমশ লোকজন বাড়ছে। দলে দলে মানুষ ঢুকছে গানের আসরে। একদল শিল্পী যৌথকণ্ঠে গাইলে-
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নজুয়ান হিন্দু-মুসলাম
মিলিয়া বাউলাগান আর ঘাটুগান গাইতাম
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।।
তারপর জোড়াগান গাইলেন-
গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে গাড়ি চলে না
ছড়িয়া মানব গাড়ি, যাইতে ছিলাম বন্ধুর বাড়ি
মধ্যপথে ঠেকল গাড়ি উপায় বুদ্ধি মিলে না
গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে গাড়ি চলে না।।
তারপর একে একে মঞ্চে আসলেন প্রাণকৃষ্ণ। গাইলেন- কী দিয়ে সেবীব চরণ কাঙালে এবং লা ইলাহা ইল্লাহ্ জানো। সেবা আক্তার গাইলেন- কেমনে চিনিবো তোমারে আর বাইচ্যা বাইচ্যা পাল তুলিয়া নাও খানা সাজাও। বাবুল সরকার গাইলেন- ইয়ামন হতে আইলেন বাবা শাহজালাল আউলিয়া।, আবদুর রহমান বাউল গাইলেন- নৌকা বাইও রে মাঝি ভাই, বাইও সাবধান হইয়া। গাইলেন মম পুরকায়স্থ নামের এক মহিলা শিল্পীও। রাত তখন ১১টা ছুঁই ছুঁই করছে। উজানধলের মাঠে লোকে লোকারণ্য। বাউলিয়ানা বেশে রাজার মতো মঞ্চে উঠে আসেন বাউল গানের জগতের আরেক বরপুত্র বাউল রণেশ ঠাকুর। তিনি একাধারে বাউল ও স¤্রাট করিমের সঙ্গী। তিনি অতি দরদ দিয়ে করিমের গাওয়া আসল সুরে গাইলেন- দরদিয়া রে বন্ধু দরদিয়ারে। আমি তোমায় চাইরে বন্ধু আর আমার দরদি নাই রে। দ্বিতীয় গান গাইলেন- প্রাণে আর সহে না দারুণ জ্বালা। তারপর গভীর রাত অবদি আরও অনেক শিল্পীরাই গেয়েছেন। দারুণ গেয়েছে আমাদের মাহবুবুল হক হাসানও।
বাদ্যযন্ত্রের কথা না বললেই নয়। বাঁশির কথা বলতেই হয়। আহা! কলিজা ঠান্ডা করা সুর সমগ্র। পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। এতোবড় মঞ্চে তাঁকে বাজাতে দেখে ভালোই লাগছিল। শৈলেন বাবুকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। উপস্থাপক বলছিলেন তিনি জাতীয় মানের ঢোল বাদক। তিনি তাঁর জাত চেনালেন। দারুণ বাজিয়েছেন। প্যাডে প্রথমে কে ছিলেন তাঁকে চিনলাম না, পরে বংশীবাদক আনোয়ার হোসেনের কিশোর ছেলে বাজিয়েছে। আমাদের মনঃপুত হলো না। প্যাডে আরো অভিজ্ঞ বাদক থাকলে অনুষ্ঠানের গানগুলো আরো চরমৎকার হতে পারতো। তবে বাঁশির কারণে সাধারণ ¯্রােতারা এ অভাব বোধ করতে পারেননি। বাকীসব ছিলো গড়পড়তা। মঞ্চের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিলো ডপকি বাদক সোনাহর আলী। নেচেছেন প্রচুর। মনের আনন্দে।
রাত তখন দুইটা। আয়োজনে ভাটির করুণ সুরের গান বাজতে শুরু করলো। স্থানীয় ভাষায় ভাইট্টাল গান। আমাদেরও আসতে হবে। মোটরসাইকেলে পাড়ি দিতে হবে ৩০/৩৩ কিলোমিটার পথ। তাই চলে আসতে হবে। এর আগে নূর জালাল ভাইর সাথে আরেকবার একটু কথা বলে নেওয়া দরকার। কিছু জিজ্ঞেস করার আছে। মূল মঞ্চের পেছনেই খুব সহজে পেয়ে যাই তাঁকে। কাঁধে হাত রাখলেন। জিজ্ঞেস করলাম অনেক কিছুই। তিনি বললেন খুব কম। তবে অনেক কথাই কম কথায় বুঝিয়ে দিলেন। করিম সঙ্গীতের সাধনা ও সুষ্ঠু সুর চর্চায় সঙ্গীতালয়টি হওয়া দরকার। লালন উৎসব কুষ্টিয়ায় হয় একমাস ব্যাপী। করিম উৎসব ৭ দিন হবে না কেন? একটন চাল পেয়েছেন সরকারের তরফ থেকে। ৪/৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ভক্তরা কিছু দিলে দেন না দিলে নিজের যা আছে তা দিয়েই আয়োজন সারেন। অনুরোধ করলেন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরো বাড়ানোর। আবারো সেই পার্কিং জোনে আমরা। ৭ নম্বর টিকিট জমা দিয়ে গাড়ি বুঝে নিয়ে যাত্রা শুরু করি। শেষ রাত্রিতে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাই। তখনও চলছিলো বিদায়ী গান। করিম ঘোর আর কাটলো না মোর।


