বিশেষ প্রতিনিধি
‘আমরা দুই ভাই, ছেলে-ভাতিজা মিলে ৮ জন, কামলা আরও সাত জন লইয়া পতা খাইয়া (সেহেরী খেয়ে) কাম (কাজ) শুরু করি, ইফতার করি খলাত (হাওরে ধান মাড়াই- শুকানোর অস্থায়ী স্থান), দিনে এক হাল (চার একরে এক হাল) কইরা ধান মেশিনে কাটের, এর বেশি কাটলে টাওয়ানি (ঘরে ধান এনে রাখা) যাইতো নায়, জানে মইরা (প্রাণপণ চেষ্টা) চেষ্টা কররাম, এরপরে আর গেলেই (পানিতে ডুবলেই) কিতা করমু, আল্লায় মারলে কোনতা (কিছুই) করার নাই’।
জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরপাড়ের হাওরি আলীপুরের বড় কৃষক আয়না মিয়া পাকা ধান কেটে গোলায় তোলার প্রাণপণ চেষ্টার বিষয়টি এভাবেই জানাচ্ছিলেন।
আয়না মিয়া জমি করেছেন ১৫ হাল (৪ একরে এক হাল)। তিন হাল জমি মঙ্গলবার পর্যন্ত কাটা হয়েছে তার। মঙ্গলবার সকালে জামালগঞ্জ কৃষি অফিস থেকে ফোন দিয়ে এক কৃষি অফিসার বলেছেন, ২৪ তারিখের মধ্যে ধান কাটা শেষ করতে, এরপর বন্যা হতে পারে। এজন্য উৎকণ্ঠায় আছেন আয়না মিয়া।
এই প্রতিবেদককে আয়না মিয়া জানালেন, হালির হাওরে গড়ে ২৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। ২৪ এপ্রিলের মধ্যে আরও ২৫ ভাগ ধান কাটা শেষ করা যাবে। ধান কাটার যতই তাগাদা হোক। আধা কিলোমিটার এক কিলোমিটার দূর থেকে ধান কেটে, মাড়াই শেষে বাড়িতে আনার কাজ শেষ করতে জনবল ও সময়ের হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, পরিবারের সকলে মিলে দিনে ১৬-১৭ ঘণ্টা কাজ করেও ছয় দিনে ধান কাটা শেষ করা যাবে না। এছাড়া ব্রি-২৯ সহ কিছু ধান পাকতেই আর চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে বলে জানান তিনি।
বিশ^ম্ভরপুরের করচার হাওর পাড়ের ব্রজনাথপুরের কৃষক সুধাংশ বিশ^াস অবশ্য বলেছেন, তার নয় কেয়ার জমির তিন কেয়ার ব্রি-২৮ ও ব্রি-৮১ করেছিলেন এগুলো কাটা শেষ। ব্রি-২৯ জাতের ছয় কেয়ার জমির ধান কাটার বাকী। ভাগালু ও হারভেস্টার যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলেছেন, আগামী পাঁচ দিনে তার ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। এই কৃষক জানালেন, ২৩ তারিখের পরে ভারী বর্ষণ হবার কথা কেউ জানায় নি তাকে।
তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরপাড়ের বড়দল নতুন হাটির কৃষক মিলন মিয়া এবার জমি করেছেন প্রায় চার হাল। তার বেশিরভাগ জমির ধান কাটা শেষ। বললেন, আট কেয়ার জমির ধান কাটার বাকি আছে। দুয়েক দিনের মধ্যে ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে তার। তিনি জানালেন, মাটিয়ান হাওরে আগে চাষাবাদ হয়েছে। কাটাও আগে শেষ। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় অর্থাৎ খড়া হওয়ায় ধান আগে পেকেছে, দিনে রাতে যেভাবে কাজ চলছে, আর ছয়দিন সময় পেলে এই হাওরের ৯০-৯৫ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।
সুনামগঞ্জের তিনটি বড় হাওরপাড়ের কৃষক নিজেদের হাওরের ধান কাটার অবস্থা এভাবেই জানাচ্ছিলেন। কেবল এই তিন হাওর নয়, জেলার ১৪২ হাওরে একই চিত্র। জেলাজুড়ে লাখো কৃষকের কারো ধান কাটা শেষের দিকে, কেউবা ১৫ থেকে ২০ ভাগ ধান কেটেছেন, কেউ এর চেয়েও বেশি। তবে সকলেই পরিশ্রমে ফলানো ধান কেটে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।
হাওর ঘুরে জানা যায়, সুনামগঞ্জের ১৪২ হাওরেই এবার ব্রি-২৮, ব্রি-৮১, ৮৪, ব্রি-৮৮, হাইব্রিড, স্থানীয় জাতের বোর, লাখাই, জাগলী, রাতা ও লালডিঙ্গাসহ নানা জাতের ধান চাষাবাদ হয়েছে। আগাম চাষাবাদ করা ধানের মধ্যে ব্রি-২৮ জাতের ধান ছড়া বের হবার সময় নুয়ে পড়ে মরে চিটা হয়েছে অনেক এলাকায়। যাদের মরে নি তারা এই জাতের ধান কেটে গোলায় তুলেছেন। এছাড়া স্থানীয় জাতের বোরোসহ আগাম চাষাবাদের ধান কাটা শেষ প্রায়। ব্রি-২৯ জাতের ধানসহ পরে লাগানো ধান নিয়েই দুশ্চিন্তা-উৎকণ্ঠা কৃষকের।
তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের দুতমা গ্রামের বড় কৃষক জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক আনিসুল হক বললেন, ২৫ হাল জমিতে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, লাখাই ও ছক্কা ধান করেছি। ব্রি-২৮ ধান বেশিরভাগই চিটা হয়ে গেছে। ২৯ ধান এখনো পাকেনি। শনির হাওরে তিন ভাগের দুই ভাগ ধানই কাটার বাকি রয়েছে দাবি করলেন তিনি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শনির হাওরে আগামী ছয় দিনে ধান কাটা শেষ করা যাবে না।
শান্তিগঞ্জের বাঘেরকোণার কৃষক মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জগন্নাথপুর সড়কমোড়ের পাশে ইস্পাহানি-৮ জাতের ধান কাটছিলেন। বললেন, ‘১৬ কেয়ার জমি করেছি, চারজন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটা শুরু করেছি, ১০ দিন লাগবে কাটতে।’ ছয়দিন পর ভারী বর্ষণ হবে জানানোয় তিনি বললেন, এই তথ্য তাকে কেউ জানায় নি।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, সুনামগঞ্জে এবার দুই লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে নানা জাতের বোর ধানের চাষাবাদ হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত সারা জেলায় ৪৭ হাজার ৩৯ হেক্টর জমির ধান অর্থাৎ ২১ দশমিক ১১ শতাংশ ধান কাটা শেষ। ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত আবহাওয়া একইভাবে থাকলে ৭০ ভাগ ধান কাটা শেষ হবে। জেলার ৪০০ কৃষক গ্রুপে (৩০ কৃষক মিলে এক গ্রুপ) এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের কাছে জমির ৮০ ভাগ ধান পাকা হলেই কাটতে অনুরোধ করা হয়েছে। ধান কাটার জন্য শ্রমিক কিংবা হারভেস্টার যন্ত্রের সংকট হলে আমাদের জানাতে বলা হয়েছে। আমরা হারভেস্টার যন্ত্র ও শ্রমিকের ব্যবস্থা করে দেবার চেষ্টা করবো। জেলায় সব মিলিয়ে ৯৫০ টি হারভেস্টার যন্ত্র এই সময়ে ধান কাটার কাজে আছে বলে জানালেন তিনি।
রাজধানীর আবহাওয়া অধিদপ্তরের জলবায়ু মহাশাখার প্রধান তথ্যবিদ আবু সাঈদ জানালেন, ২০ তারিখ থেকেই সুনামগঞ্জে বৃষ্টি আছে। ২২ তারিখ থেকে হাওরে বৃষ্টি বাড়বে। ২৪ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
- হাওরে চলছে ধান কাটা উৎসব/ কৃষকদের উৎসাহ দিতে আসলেন তিন মন্ত্রী
- শান্তিগঞ্জে দরিদ্র মানুষের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ


