আবারো বাল্য বিয়ের চেষ্টা বর, কনের বাবাসহ তিনজনের কারাদণ্ড

বিন্দু তালুকদার
শহরে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বসবাস। শিক্ষার হার বেশী, কুসংস্কার কম, সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও গ্রামের অবহেলিত মানুষের চেয়ে একটু বেশী সচেতন।
কিন্তু সুনামগঞ্জ  জেলা শহরের পৌরসভা এলাকায় বর, কনের বাবা ও অভিভাবদের কারাদ- প্রদান করেও বাল্য বিয়ে (কিশোরী ও শিশু) ঠেকানো যাচ্ছে না। বুধবার কিশোরীকে বিয়ে দেয়ার অপরাধে চার জনকে কারাদ- প্রদানের পর শুক্রবার দুপুরে আবারও এক শিশুকে বাল্য বিয়ে দেয়ার অপরাধে শহরের ওয়েজখালী এলাকার বর, বরের বোন জামাই ও কনের বাবাসহ তিনজনের কারাদ- প্রদান করা হয়েছে।
দু’দিনের ব্যবধানে দু’টি বাল্য বিয়ের ঘটনায় নারী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এসব ঘটনা রোধে সমাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। উল্টোদিকে হাওরপাড়ের উপজেলা পর্যায়েও এখন বাল্য বিয়ের প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ।
তবে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী দাবি করেছেন, পরিবার পরিজন সবকিছু জেনে শুনে শিশু ও কিশোরীদের বিয়ে দেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টিও জড়িত থাকে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব অপরাধ রোখ করতে হবে।
জানা যায়, ২৭ জুলাই গত বুধবার সুনামগঞ্জ পৌরসভার এলাকার জলিলপুরে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে বিয়ে দেয়া ও করার দায়ে বর দোয়ারাবাজার উপজেলার রাজনপুর গ্রামের মো. সাদক আলীর ছেলে মো. জসিম উদ্দিন (২৫), বরের অভিভাবক (বোন জামাই) রাজনপুর গ্রামের ফকর উদ্দিনের ছেলে জামাল
উদ্দিন (৩৫), কনের পিতা সুনামগঞ্জ শহরের ওয়েজখালী পার্শ্ববর্তী এলাকা জলিলপুর গ্রামের পীর সামছুল হক (৫০) ও একই গ্রামের বাসিন্দা বিয়ের উকিল পিতা খোরশিদ আলীর ছেলে মছব্বির আলীকে (৪৮) কারাদ- প্রদান করেছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিয়ের উকিল পিতা মছব্বির আলীকে ১৫ দিনের কারাদ- এবং বর, বরের বোন জামাই ও কনের পিতাকে এক মাসের কারাদ- প্রদান করা হয়েছিল।
কিন্তু ঘটনার দু’দিন যেতে না যেতেই আবারো বাল্য বিয়ের অভিযোগে ওয়েজখালীর বর, বরের বোন জামাই ও কনের বাবাসহ তিনজনের কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদ- প্রদান করেন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী। দ-প্রাপ্তরা হলেন, বর ওয়েজখালী এলাকার মাহতাব আলীর ছেলে হায়দার আলী (২৮), বরের বোন জামাই একই গ্রামের মুসলিম মিয়া (৬০) ও গ্রামের বাসিন্দা কনের বাবা নুরুদ্দীন (৩৫)। বরকে ১৫ দিনের কারাদ- ও বরের বোন জামাই ও কনের বাবাকে ৭দিন করে কারাদ- প্রদান করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জানা যায়, শুক্রবার দুপুরে সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার ৯নং ওয়ার্ডের ওয়েজখালী গ্রামের বাসিন্দা  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী (২০১৪ ইং প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশহণকারী) ১৩ বছর বয়সী শিশুর সাথে একই গ্রামের মাহতাব আলীর ছেলে হায়দার আলীর (২৮) বিয়ের আয়োজন করে উভয়ের পরিবার। শুক্রবার বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল পুরোদমে। মহিলা পরিষদ ও স্থানীয় একাধিক লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে দুপুর ১ টায় বিয়ে বাড়িতে হাজির হন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা । এসময় তিনি ওই মেয়ের জন্মসনদ ও প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কাগজপত্র দেখতে চান। পরে মেয়ের বয়স ১৩ বছর বলে ধরা পরে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলিশের সহায়তায় তাৎক্ষণিক বর হায়দার আলী, বরের বোন জামাই মুসলিম মিয়া ও কনের বারা মো. নুরুদ্দীনকে আটক করে সবাইকে নিয়ে আসেন এবং বিয়ে বন্ধ করে দেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পৃথক কারাদ- প্রদান করেন।
জেলা মহিলা পরিষদের সভানেত্রী গৌরি ভট্টাচার্য বলেন,‘দুই দিনের ব্যবধানে একই এলাকায় দু’টি বাল্য বিয়ের ঘটনা আমাদের অবশ্যই ভাবায়। দরিদ্রতা, শিক্ষা, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে এসব ঘটনা ঘটছে। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় এসব ঘটনা রোধ করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন,‘নারীকে নিয়ে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো বদলায়নি। আগের মত এখন অনেকেই একটি মেয়ে শিশুর জন্মের পর থেকেই দ্রুত তার বিয়ে দেয়ার জন্য ভাবে। তাকে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে না তোলে স্বামীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার প্রবণতা বিরাজ করে। যার কারণে শিশু-কিশোর বয়সে বিয়ে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন মা-বাবা ও অভিভাবকরা।’
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলতাফ হোসেন বলেন,‘বাল্য বিয়ে রোধ করতে উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, সচিব ও কাজীদের বিশেষ ভুমিকা পালন করতে হবে। সবাই যদি মনে করেন বাল্য বিয়ে রোধ করবেন তাহলেই সম্ভব।’ তিনি আরো বলেন,‘ দিরাইয়ে বাল্য বিয়ের প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। বাল্য বিয়ে রোধ করতে আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলেছি, কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী বলেন,‘শুধু উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে একা এই কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সবাই নিজেদের অবস্থান থেকে এগিয়ে আসলে ও সচেতন হলেই তা সম্ভব হবে। বিশেষ করে জন্ম সনদ প্রদানকারী জনপ্রতিনিধিদের আরো বেশী করে দায়িত্বশীল হতে হবে। ’ তিনি আরো বলেন,‘বাল্য বিয়ে দেয়ার অপরাধের শাস্তির কথা জেনেও পরিবার এই বিয়ের আয়োজন করেন। বিভিন্ন ফাঁক ফোকরের সহায়তা নিয়ে এসব বিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা (পৌরসভার মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলর ও মেম্বারদের) সহায়তায় বাল্য বিয়ে হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা একই শিশুর দুইবার করে জন্ম সনদ প্রদান করছেন। এসব ভূয়া জন্ম সনদ দেখিয়ে প্রশাসনকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়। গত দুই দিনের দু’টি বাল্য বিয়ের ঘটনায় যেসব জন্ম সনদ পাওয়া গেছে তা সুনামগঞ্জ পৌরসভা থেকেই সবরাহকৃত। কিন্তু সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় বিয়ে বন্ধ ও ভাঙা সম্ভব হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয়ুব বখত জগলুল বলেন,‘বাল্য বিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধি এবং আইনত দ-নীয় অপরাধ। আমি নিজে মহিলা পরিষদের সহায়তায় একাধিক বাল্য বিয়ে রোধ করেছি। আমরা চাই কোন শিশু ও কিশোরী যেন বাল্য বিয়ের শিকার না হয়।’ পৌরসভার থেকে ভুয়া জন্ম সনদ প্রদানের বিষয়ে তিনি বলেন,‘ আমি পৌরসভার মেয়র হিসাবে শুধু স্বাক্ষর করি। কার বয়স কত, জন্ম তারিখ কবে এসব বিষয় নির্ধারণ করেন স্থানীয় পৌর কাউন্সিলররা। তারা যখন সুপারিশ করেন তখনই কেবল আমি স্বাক্ষর করি। কোথাও জন্ম সনদ নিয়ে ত্রুটি বিচ্যুতি হয়ে থাকলে এর সকল দায়-দায়িত্ব স্থানীয় পৌর কাউন্সিলরদের, আমার নয়। কারণ আমার দ্বারা একা পৌরসভা এলাকার সকলকে চেনা সম্ভব নয়। আমি সকল কাউন্সিলরকে নতুন করে আবারো সতর্ক করে দেব।’