আমন চাষে শঙ্কা, এখনও তৈরি হয়নি বেশিরভাগ বীজতলা

স্টাফ রিপোর্টার
দুই দফা বন্যার কারণে সুনামগঞ্জে সময়মতো আমনের আবাদ শুরু হয়নি। পানি কমলেও জমি পুরোপুরি তৈরি হয়নি। কিছু কিছু এলাকায় পানি এখনো নামেনি। এই অবস্থায় বীজতলা তৈরিসহ জমিতে চারা লাগাতে আরও অনেক সময় লাগবে। এদিকে বিলম্বের কারণে আমনের ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৮১ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে বীজতলা তৈরি করতে হয়। কিন্তু মাত্র ১২০০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি হয়েছে। এই সময় পর্যন্ত ৯০ শতাংশ বীজতলা তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বীজতলার ৩০ ভাগ প্রস্তুত করা হয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামায় এখনও বীজতলা প্রস্তুত করা সম্ভব হয় নি। এছাড়া আগেও কয়েকবার বীজতলা নষ্ট হয়েছে, তাই এখন পানি কমলেও আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করে বীজতলা প্রস্তুত করবেন তারা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের রাজারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মো. আরশাদ আলী বললেন, কয়েকদিন পরপর পানি এসে বীজতলা নষ্ট করে দেয়। বারবার যে বীজতলা তৈরি করবো সে ক্ষমতা নেই আমার। তাই এবার এখনও বীজতলা তৈরি করিনি। আর কয়েকদিন দেখি পানির অবস্থা তারপর বীজতলা তৈরি করবো।
একই ইউনিয়নের অচিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহেল মিয়া বললেন, আমি ৮ কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমিতে আমন চাষাবাদ করি। গত বছরে এই সময়ে বীজতলা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। এবার পানির জন্য আমনের বীজতলা তৈরি করতে পারছি না।
একই গ্রামের বাসিন্দা মো. মনির মিয়া বললেন, আমার ৯ কেয়ার আমন জমি রয়েছে। আমরা ভয়ে আছি আবার যদি পানি আসে সেজন্য। আরও এক সপ্তাহ পরে বীজতলা তৈরি করবো।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের যোগীরগাঁওয়ের বাসিন্দা আব্দুর রহিম বললেন, আমি ১৫ কেয়ার জমিতে আমন চাষাবাদ করি। বন্যার কারণে আমাদের আমনের বীজগুলোর অনেক ক্ষতি হয়েছে। বীজগুলো যে ঘরে রেখেছিলাম সেটি ডুবে গিয়েছিলো। বন্যার পরে দেখি সবগুলো বীজ পচে গেছে। ফেলে দিতে হয়েছে। এদিকে বীজতলা প্রস্তুতের সময়ও চলে যাচ্ছে। নতুন বীজতলা তৈরির পর আবার যদি পানি আসে সে জন্য ভয়ে আছি। তাই কিছুদিন সময় নিয়ে বীজতলা তৈরি করবো।
এদিকে বাংলাদশে পরমাণু কৃষি গবষেণা ইনস্টটিউিট (বিনা) সুনামগঞ্জ উপকেন্দ্র বলছে, এবার বন্যার কারণে আমনের বীজতলা প্রস্তুত করার চলে যাচ্ছে। তাই স্বল্প জীবনকালীন ধান আবাদ করতে হবে। নভেম্বরের আগে ফুল আসে এমন ধান রোপন করতে হবে। যদি ধানে নভেম্বরের আগে ফুল না আসে তাহলে শীতে ধান চিটা হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তাই বিনার উদ্ভাবিত ধান বিনা-৭, বিনা-১১, বিনা-১৬, বিনা-১৭ ধান আবাদের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষি অফিসার সালাহ উদ্দিন টিপু বললেন, বীজতলা থেকে বন্যার পানি নেমে যেতে সময় লেগেছে। এজন্য এবার সময় মতো বীজতলা তৈরি যায় নি। তবে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করছি। যেসব বীজ দেরিতে করলে সমস্যা হয় সেগুলো এবার আবাদ না করতে নিরুৎসাহিত করছি। বিআর-২২, বিআর-২৩, বিনা-১১, বিনা-১৬, বিনা- ১৭ ভ্যারাইটিগুলোর বীজতলা তৈরি করতে পরামর্শ দিচ্ছি।
সুনামগঞ্জের বিনা উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাকিব জানান, আমন মৌসুমে দেরিতে চাষাবাদ করা হলে সমস্যার সম্মুখিত হতে হয়। নভেম্বরে তাপমাত্রা যখন ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে চলে আসে তখন ধান বের হতে পারে না। চিটা হয়ে যায়। আমাদের উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো স্বল্প জীবনকালীন হওয়ায় আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে রোপন করলেও অক্টোবরের শেষের দিকেই ফুল চলে আসে। এতে কোনো চিটা হয় না এবং ধান বের হতেও সমস্যা হয় না।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে প্রায় ৬০ টন বীজ বিতরণ করেছি। আমাদের কাছে যে বীজগুলো ছিলো সবগুলোই বিনামূল্যে বিতরণ করেছি। এছাড়াও ক্ষুদ্র কৃষক, বিভিন্ন কোম্পানী ও বিএডিসি আমাদের বীজগুলো উৎপাদন করে। মার্কেটে বীজগুলো পাওয়া যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, এখন পর্যন্ত মোট আমনের ৩০ ভাগ বীজতলা করা শেষ হয়েছে। এবার কয়েকবার বীজতলা নষ্ট হয়েছে। এজন্য আমরাও কৃষকদের কিছুটা সময় নিয়ে বীজতলা তৈরির পরামর্শ দিয়েছি। তবে কয়েকদিনের ভেতরে শতভাগ বীজতলা তৈরি হয়ে যাবে।