আমরা কি ক্রমাগত ভারসাম্যহীন সমাজের দিকে এগোচ্ছি?

ব্যক্তি বিশেষের সংঘশক্তি ও বিত্তের ক্ষমতা থাকলে তিনি আইন ও আইনি ব্যবস্থাকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে তৎপর থাকেন। নিজেকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে আরও বহু লোকের সমস্যার কারণ তৈরি করতে তিনি বিন্দুমাত্র পিছ পা হন না। ব্যক্তি বিশেষ অপরাধী হতে পারেন কিংবা নিরপরাধও হতে পারেন। এই নির্ধারণের ভার আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। কিন্তু ওই পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আইনি সংস্থাগুলোকে নিজের পক্ষে প্রভাবিত করতে অবলম্বন করেন কিছু অন্যায় পন্থার। এই পন্থাগুলোও হয় বেআইনি। এমন আচরণে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা যে প্রকৃত অর্থে নিরপরাধ হতে পারে না তা বুঝতে কারও বাকি না থাকলেও সমাজ আজ এমনসব শক্তিমত্ত দুর্বৃত্তের হাতেই বন্দী হয়ে আছে। মাত্রই কয়েকদিন আগে কক্সবাজারের মেয়রের বিরুদ্ধে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের হওয়ায় তিনি পুরো কক্সবাজার শহর অচল করে দিয়েছিলেন। কয়েক হাজার পর্যটক আটকা পড়ে যান শহরে। তারা কক্সবাজার ছাড়ার কোনো যানবাহন পাচ্ছিলেন না। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মেয়রের পক্ষাবলম্বন করে পৌর কর্মচারিরা গণকরের পয়সায় কেনা পৌরসভার গাড়ি দিয়ে রাস্তা ব্লক করে জনদুর্ভোগ তৈরি করেন। এই অবস্থায় অসহায় প্রশাসন অভিযুক্ত মেয়রের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছেন। কেমন অদ্ভুত এক সময়ে আমরা বসবাস করছি। এখানে সবলের দম্ভের কাছে ন্যায়-অন্যায় সবকিছু স্থবির হয়ে আছে। ঠিক এরকমই একটি খবর দেখলাম বৃহষ্পতিবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। গত সোমবার জগন্নাথপুর উপজেলার ইসহাকপুর এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটঁনা ঘটে। এই ঘঁটনায় পাল্ট্পাাল্টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর একটি মামলায় আসামি হয়েছেন হাজী নিজামুল করিম নামের জনৈক ভদ্রলোক। তিনি আবার জগন্নাথপুর উপজেলার সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক সমিতির সভাপতি। বুঝা যায়ই, ক্ষমতা প্রয়োগের উপকরণগুলো তার কব্জায় রয়েছে। সুতরাং তার লোকজন শুরু করলেন এই ক্ষমতা জাহির করা। পরিবহন মালিক শ্রমিকদের সংগঠন ঘোষণা দিয়ে বসল তাদের নেতার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। মামলাটিকে তারা মিথ্যা আখ্যায়িত করেছেন। মামলা প্রত্যাহৃত না হলে ৬ নভেম্বর থেকে পুরো জগন্নাথপুর উপজেলায় সড়ক পরিবহন বন্ধ করে দেয়ার আলটিমেটাম এসেছে তাদের পক্ষ থেকে।
পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠনের একজন ব্যক্তির জন্য একটি এলাকার পরিবহন ব্যবস্থাকে স্থবির করে দেয়ার এমন ঘোষণা কি আদৌ নৈতিক হয়েছে? পরিবহন সেক্টরের সংগঠনগুলোর দায়িত্ব তো পেশাগত দিকগুলোর দেখভাল করা। একজন নেতার ব্যক্তিগত ঘটঁনায় কেন সংগঠনগতভাবে দাঁড়িয়ে যেতে হবে? সভাপতি সাহেব তাদের কথা মতো ‘মিথ্যা’ মামলার আসামি হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু মামলাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করার জায়গা তো তদন্ত প্রক্রিয়া ও আদালত। আইনি ওই জায়গার পরিবর্তে তারা কেন জনদুর্ভোগ তৈরি করাকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে বেছে নিলেন? এতে যে জিনিসটি প্রমাণ করে তা হলো নিজেদের ক্ষমতার জায়গা দেখিয়ে আইন-আদালতকে প্রভাবিত করা। অর্থাৎ, তারা বুঝাতে চাইছেন, চেয়ে দেখো আমরা কী করতে পারি, সাবধান আমাদের পিছনে লাগতে এসো না। একটি সভ্য সমাজে এমন আচরণ অগ্রহণীয়। পত্রিকার খবরে এসেছে ইসহাকপুরে সংঘটিত সোমবারের সংঘর্ষের পিছনে কাজ করেছে দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ শক্তিমত্তায় কে কার চাইতে বেশি তা দেখানোর মহড়া ছিলো সংঘর্ষটি। এমন একটি অসহিষ্ণু সমাজ কারও কাম্য হতে পারে না।
এমনসব অসহিষ্ণুতা ও বেপরোয়া মনোবৃত্তি আমাদের ক্রমাগত ভারসাম্যহীন ও উশৃঙ্খল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে ভারসাম্যহীন ও উশৃঙ্খল সমাজে কেউই নিরাপদ নয়। আজকে যারা দম্ভ দেখাচ্ছেন কালকে তারাই আরেক দাম্ভিকের পীড়নের শিকার হবেন।