আমলাতন্ত্রের জনবান্ধব রূপটিই আমরা দেখতে আগ্রহী

সরকারে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতন্ত্র একটি বড় বাধা, খোদ মন্ত্রীপরিষদ সচিব যখন এরকম কথা বলেন তখন এর সারবত্তা অনুমেয়। রবিবার এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর আয়োজনে ও ব্রাকের সহযোগিতায় রাজধানীর ব্রাক ইন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘কার্যকর উন্নয়নের জন্য সরকারের মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়’ শীর্ষক এক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম আরও বলেছেন, সরকার না পারলেও এনজিও অনেকক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকাাির প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে তা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হতে পারে।’ সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের মধ্যে সৃজনশীলতার অভাব, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অপারগতা এবং তৃণমূলের সাথে সম্পর্কহীনতার কথা বহুদিন ধরেই বিভিন্নভাবে আলোচিত হচ্ছে। প্রশাসনে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, নথির শম্বুক গতি, পদে পদে বিধি-বিধানের প্রতিবন্ধকতা, এরকম বিষয়াদি চোখের সামনে দিনের আলোর মতো সকলের কাছে স্পষ্ট। বছর বছর সরকারি সেবাখাতগুলোর সংকোচন ঘটছে পক্ষান্তরে একই জায়গায় বেসরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপকতা বাড়ছে। আমাদের অনেক সাধনার জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন সংস্থা বিটিআরসি-টেলিটক, জাতীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআরটিসি বা বিআইডব্লিউটিসি, বাংলাদেশ বিমান- এমনসব প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়ছে। একই জায়গায় দাপটের সাথে অবস্থান গ্রহণ করছে বেসরকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। আজকাল সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না, সরকারি অফিসে প্রত্যাশিত সেবাগ্রহীতার হয়রানি নিত্যনৈমিত্তিক। এর কারণ কি শুধুই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রিতা?  নির্মোহ বিশ্লেষণে এই ব্যর্থতার জন্য আমলাতন্ত্রের আয়েশিপনার সাথে সরকারের নীতি ও আমলাদের মানসিকতা বহুলাংশে দায়ী। অনেকেই বলেন, বেসরকারি খাতের মুনাফাবৃত্তির নানামুখী তৎপরতার কাছে নতি স্বীকার করে সরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে রাখা হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে। আজ যদি পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, চিকিৎসাসেবাসহ বিভিন্ন জায়গায় বেসরকারি খাতের সাথে সমান্তরালভাবে সরকারি খাত দাঁড়িয়ে থাকত তাহলে জনসাধারণকে অসহনীয় মুনাফার শিকার হতে হত না। কিন্তু এখন মানুষকে নিতান্ত বাধ্য হয়েই সরকারি প্রতিষ্ঠানের বদলে সেবা পেতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়। এই সেবা কিনতে হয় উচ্চমূল্যে। তাই সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রীতার বিষয়টি সামনে আনলেন তখন বোধ করি বিষয়টিকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই সামনের দিনে মূল্যায়ন করা উচিৎ।
রাষ্ট্র যখন নিজেকে গণতান্ত্রিক ও জনগণের বলে দাবি করে তখন অবশ্যই তার কিছু দায়-দায়িত্ব এসে যায়। আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে নিজেদের এই আকুতির কথা সবসময় সরকারের দায়িত্বশীলদের জানানোর তাগিদ অনুভব করি। এই তাগিদ থেকেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে বর্তমান সময়ের চাইতে আরও অনেক বেশি কল্যাণকামী নীতির কামনা করি আমরা। রাষ্ট্র কল্যাণকামী চরিত্র ধারণ না করলে এর আমলাতন্ত্র কখনও জনকল্যাণমুখী হতে পারে না সর্বাংশে। আজ বিচ্ছিন্নভাবে আমলাতন্ত্রের কিছু আলোক বিচ্ছুরণ আমরা দেখতে পাই। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে নিরলস কাজ করে সকলের শ্রদ্ধাভাজন হয়েছেন। আমরা চাইছি এই বৈশিষ্ট্যটি কার্যকরভাবে রাষ্ট্র নিজের মাঝে ধারণ করুক। তখন আমলাতন্ত্রের গতি আসবে, যেসব বিধি বিধান গতি কমিয়ে দেয় সেগুলোর সংস্কারও হবে। আর যদি সরকার বেসরকারি খাতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখন ওই রাষ্ট্রের জনগণের দুর্গতি রোধ করার সাধ্য কারও নেই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কী করতে পারে টাঙ্গুয়ার হাওর সব হারিয়ে সেই চিহ্ন নিয়ে আমাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে গন্তব্য কোন দিকে। জনগণের দিকে হলে অবশ্যই সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনেক বেশি শক্তিশালী, সেবামুখী ও জনবান্ধব করতে হবে।