সরকার ধারাবাহিকভাবে আমানতের উপর সুদ হার হ্রাস করার বিষয়টি কার্যকর করে চলেছে। সর্বশেষ পোস্ট অফিসের বিভিন্ন সঞ্চয় স্কিমের সুদ হার প্রায় অর্ধেক নামিয়ে আনা হয়েছে। ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তর বা পোস্ট অফিসের আমানতকারীরা বৃহদংশে নি¤œমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোক। এরা কৃচ্ছ্রতা সাধন করে যে টাকা সঞ্চিত রাখেন তাই পরে শিল্পপতি বা বড় ব্যবসায়ীদের হাতে ঋণ আকারে চলে আসে এবং সেই ঋণ খেলাপি হয়ে দেশের অর্থনীতির দুর্দশা ঘটায়। অন্যদিকে ক্রমাগত সুদ কমানোয় আমানতকারীদের নাভিশ্বাস উঠা শুরু হয়েছে। চরিত্রগত দিক থেকে বয়স্ক ও স্বল্পবিত্তের লোকজন ঝুঁকি নিতে অনভ্যস্ত থাকেন। নতুন ব্যবসায় কিংবা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করে দীর্ঘ মেয়াদে মুনাফা তুলার জন্য যে সৃজনশীলতা, মেধা ও উদ্যোগের প্রয়োজন পড়ে এটি সংগত কারণেই তাদের মধ্যে থাকে না। ফলে এরা সারা জীবনে বহু কষ্টে জমানো টাকা পোস্ট অফিস বা সঞ্চয় অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। বিনিয়োগের লাভের টাকাই এই আমানতকারীদের জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন। বিশেষ করে পেনশনার, মহিলা ও বয়স্ক ব্যক্তিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একান্তই আমানতের লভ্যাংশের উপর নির্ভরশীল। সুদ হার অর্ধেকে নামিয়ে আনায় এদের জীবনে যে অনিশ্চয়তা নেমে আসবে তা কোনো কিছু দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।
আরেকটি জিনিস বিবেচনাযোগ্য। শ্রেণিগত অবস্থানের কারণে নি¤œমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাষ্ট্রের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোয় আসতে অনীহা বোধ করেন। এরা অভাবে কষ্ট করবেন কিন্তু মুখ ফুটে সাহায্য চাইবেন না। এরা ক্ষুধায় কাতর হবেন কিন্তু রিলিফের লাইনে যেয়ে দাঁড়াবেন না। এই ব্যক্তিত্ববোধে তাড়িত শ্রেণিটি এখন ঘোর অনিশ্চয়তায় পড়লেন বলা চলে। রাষ্ট্র ও সরকার কেন এই বিবেচনা করছেন না যে শেষ পর্যন্ত তো তাদের আমানত ব্যবসা ও উৎপাদন খাতেই বিনিয়োজিত হচ্ছে। তাহলে দুর্বল এই শ্রেণিটিকে কেন অযথা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে তাদের তলে-মূলে খোয়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের কল্যাণ চিন্তা করে নীতি তৈরি করে। এখানে যেমন হতদরিদ্রের জন্য কল্যাণ কর্মসূচী থাকে তেমনি নি¤œবিত্ত-মধ্যবিত্তের জন্যও থাকা দরকার। উচ্চবিত্তদের কল্যাণে তো প্রকল্পের কোনো অভাবই নেই। রাষ্ট্রের সকল পর্যায় থেকে যে পুঁজি বা সামর্থ্য তৈরি হয় তার পুরোটাই উচ্চবিত্তদের কল্যাণে ব্যয়িত হয়। উচ্চবিত্ত তোষণকারী অর্থনীতির বদৌলতে এখন অন্য শ্রেণিগুলো যারপরনাই দুর্ভোগের শিকার হলেন। এই ধরনের বৈষম্য ভীষণ রকমের অন্যায্য।
অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়াধিক্য চোখে পড়ার মত বেড়ে গেছে। অর্থনীতিকে দৃঢ় করার বদলে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উচ্চাবিলাস আমাদের সীমিত সাধ্যের অর্থনীতি কতটা ভার বহন করতে সক্ষম সেই বিবেচনা করা হচ্ছে না। অর্থের জোগান দিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার হিমশিম অবস্থায় পড়ে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ আমানতের সুদ হার কমানোর সিদ্ধান্ত, এই বললে ভুল বলা হবে কি?
সরকার পোস্ট অফিসের সঞ্চয় স্কিমের সুদ হার কমানোর যে ঘোষণা দিলেন তাতে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পোস্ট অফিস নিজেদের আমানত প্রকল্পের বাইরেও সঞ্চয় অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্কিমের দায়িত্ব পালন করে। সরকারের সুদ হার কমানোর এই সিদ্ধান্ত কি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সঞ্চয় অধিদপ্তরের স্কিমে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে? যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন সুদ হারে বিনিয়োগ করেছেন মেয়াদ পূর্তি পর্যন্ত কি সেগুলোর চুক্তিবদ্ধ হার বজায় থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছেন নিরীহ আমানতকারীরা। সবচাইতে বেশি করে তারা চাইছেন তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকার সুদ হার কমানোর সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে সরে আসুক। এক্ষেত্রে আমরা মানবিক ও কল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত শুনতে চাই।

