হাসান শাহরিয়ার
সারা জীবন আমি দু’টো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ববোধ করেছি। এখনও করছি এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত করব। এই দু’টি বিদ্যাপীঠ হলো : সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি হাই স্কুল ও সুনামগঞ্জ কলেজ। স্কুলের পাঠ সমাপ্ত করে যখন কলেজে ভর্তি হলাম তখনই আমি আমার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণ করি। বলতে দ্বিধা নেই, আল্লাহর অসীম কৃপায় আমি আমার ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি। সেজন্য আমি স্কুল ও কলেজের মানুষ গড়ার কারিগরদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কর্মক্ষেত্র থেকে বিদায় নিয়ে আমি এখন সম্পূর্ণ অবসরে। আর দশ জনের মতো ফিরে তাকাই শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোর দিকে। আমার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে সুনামগঞ্জের ছবি, এই দুই বিদ্যানিকেতনের চিত্র, শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুদের সহাস্য বদনগুলো। আমাদের স্কুল জীবনের একমাত্র শিক্ষক মু. আব্দুর রহীম এ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন; কয়েকদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। সুলেখক আব্দুর রহীম স্যার সকলের প্রিয় ছিলেন। কোনো ছাত্র লেখালেখি করতে চাইলে তিনি উৎসাহ দিতেন। আমি তখন থেকেই লিখতে শুরু করি। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আমার কাঁচা হাতের লেখা শুদ্ধ করে দিতেন। তিনি স্কুল কো-অপারেটিভ সোসাইটির সম্পাদক ও স্কুল ম্যাগাজিনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। তিনি সতীর্থ মলয় ভৌমিক ও আমাকে স্কুল ম্যাগাজিনের তৃতীয় সংখ্যার (১৯৬০Ñ৬১) সম্পাদক নিযুক্ত করেছিলেন। ম্যাগাজিনে বাংলা ও ইংরেজি বিভাগ ছিল। স্কুল ও কলেজে আমরা প্রিয় শিক্ষকদের ভালবাসা পেয়েছি, পেয়েছি আশীর্বাদ। স্কুলÑকলেজের শিক্ষাই ছিল আমার মূলধন। আর এই মূলধনই ছিল পরবর্তী জীবনের পাথেয় এবং চালিকা শক্তি। আমাদের শ্রদ্ধার বিনিময়ে তারা দিয়েছিলেন আদর, ভালোবাসা ও সুশিক্ষা। তাদের কথা কোনোদিন ভুলব না, তারা আমাদের নমস্য।
প্রশাসনিক কাজের সুবিধের জন্যে ইংরেজ সরকার সিলেট জেলাকে পাঁচটি মহকুমায় ভাগ করে। সিলেট আসাম প্রদেশে যোগদানের তিন বছর পর ১৮৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে সৃষ্টি হয় সুনামগঞ্জ মহকুমা, ১৮৭৮ সালে করিমগঞ্জ ও হবিগঞ্জ মহকুমা এবং ১৮৮২ সালে দক্ষিণ সিলেট তথা মৌলভীবাজার মহকুমা। এছাড়া, সিলেট সদর মহকুমা তো ছিলই। ইংল্যা-ের রানী ভিক্টোরিয়ার (১৮৩৭-১৯০১) সিংহাসনে আরোহনের রজত জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে ১৮৮৭ সালে ভারতবর্ষসহ ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের বিভিন্ন কলোনিতে অনেক ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সে সময় সুনামগঞ্জ শহরে হাসন এম ই স্কুল নামে একটি বিদ্যালয় ছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার ও মরমী কবি দেওয়ান হাসন রাজা। রানীর শাসনামলের রজত জয়ন্তীতে সুনামগঞ্জে একটি ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রশাসন হাসন এম ই স্কুলের অবলুপ্তি ঘোষণা করে একই জায়গায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সুনামগঞ্জ জুবিলি হাই ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটি যখন স্থাপিত হয় তখন মহকুমা শহর হলেও সুনামগঞ্জ ছিল জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন ছোট্ট এক দ্বীপসদৃশ বর্ধিষ্ণু জনপদ। ব্রিটেনের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড-এর পুত্র পঞ্চম জর্জ (১৮৬৫-১৯৩৬) ক্ষমতারোহন করেন ১৯১০ সালে। তিনি প্রাণত্যাগ করেন ১৯৩৬ সালে। তার রাজ্যাভিষেক উপলক্ষেও ১৯১২ সালে বাংলা প্রদেশের খুলনা, বগুড়া, নড়াইল ও চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়িতে ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের বলা হতো করোনেশন স্কুল। অবশ্য সিলেট জেলায় কোন করোনেশন স্কুল স্থাপিত হয়নি। তবে ঐ বছর সরকার সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার হাইস্কুলের দায়িত্বভার গ্রহণ করে বলে সুনামগঞ্জ শহরের রাজগোবিন্দ পাঠশালার প্রাক্তন ছাত্র, সুনামগঞ্জের সাবেক মহকুমা হাকিম (ব্রিটিশ আমল), বিশিষ্ট লেখক ও ইতিহাসবিদ সৈয়দ মুর্তাজা আলী তার ‘হযরত শাহ জালাল ও সিলেটের ইতিহাস’ গ্রন্থে (পৃ. ১৬৩) উল্লেখ করেছেন। অবশ্য আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন রচিত ‘সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে (পৃ. ২৬৪) বলা হয়েছে, ১৯১১ সালে এটি হাইস্কুল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং ১৯২৮ সালে একে সরকারিকরণ করা হয়। এম কে আই কাইয়ুম চৌধুরী তাকে সমর্থন করেছেন (বাংলাপিডিয়া দ্বিতীয় সংস্করণ, খন্ড ১৪, পৃ. ৩)। প্রথমে এটি ছিল সুনামগঞ্জ জুবিলি হাই ইংলিশ স্কুল। কালের বিবর্তনে ‘ইংলিশ’ শব্দটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়। বিভিন্ন থানা থেকে ছাত্ররা পড়তে আসত মহকুমার একমাত্র সরকারি বিদ্যালয়ে। এই স্কুলে পড়েছেন আমার বাবা, চাচা ও ভাইয়েরা। শিক্ষায় অনগ্রসর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জের প্রধান বিদ্যাপীঠ কৃতী ছাত্ররা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন সারা পৃথিবীতে। গর্বের সঙ্গে বলি, আমিও এই স্কুলের ছাত্র। এই স্কুলের ছাত্র না হলে আমি আমার বর্তমান অবস্থানে পৌঁছতে পারতাম কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। সুনামগঞ্জ আমার অহঙ্কার, সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি হাইস্কুল আমার গর্ব।
আমরা ম্যাট্রিক পাশ করি ১৯৬২ সালে। আমরা ছিলাম ম্যাট্রিকের সর্বশেষ ব্যাচ। এর পর চালু হলো এসএসসি। এই ব্যাচে অনেক কৃতী ছাত্র ছিলÑÑরাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সরকারি ও ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও সাংবাদিক। ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর স্কুলের সহপাঠীরা আলাদা হয়ে গেল। বেশির ভাগই বেছে নিল সুনামগঞ্জ কলেজ। তবে কেউ কেউ ভর্তি হলো ঐতিহ্যবাহী সিলেট মুরারিচাঁদ বা এমসি কলেজে। বাণিজ্য বা কমার্সে আগ্রহীরা গেল সিলেটের মদনমোহন কলেজে। দু’একজন যোগ দিল ঢাকার পলিটেকনিকে। হিন্দুদের একটি গ্রুপ পাড়ি জমালো ভারতে। অন্যরা ছড়িয়েÑছিঁটিয়ে গেল। আবার পরীক্ষায় পাস না করে বেশ কয়েকজন লেখাপড়ায়ই ইতি টানলো।
সুনামগঞ্জবাসী গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র আসামের মন্ত্রী মুনাওওয়ার আলী, সাংবাদিক ফজলুল হক সেলবর্ষী, সাংবাদিকÑরাজনীতিবিদ মকবুল হোসেন চৌধুরী, মন্ত্রী অক্ষয়কুমার দাশ, মাহমুদ আলী, আব্দুস সামাদ আজাদ ও মেজর ইকবাল হোসেন চৌধুরী; দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, জনপ্রতিনিধি যতীন্দ্রনাথ ভদ্র, আবু হানিফা আহমদ, দেওয়ান ওবায়দুর রেজা, আব্দুজ জহুর ও আব্দুল হক; শিক্ষক মোহাম্মদ আলী, সাহিত্যিকÑসাংবাদিক সাহেদ আলী ও আব্দুল হাই, জেলা জজ ইকবাল হোসেন চৌধুরী, আইনজীবী মুজিবুর রহমান চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার আলাউদ্দিন আহমদ, সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ খান ও অন্যদের। যেসব জীবিত প্রাক্তন ছাত্রকে নিয়ে স্কুল গর্ববোধ করে তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক আহমদ চৌধুরী, সাবেক সচিব ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এনাম আহমদ চৌধুরী এবং ল-নের টাওয়ার হেমলেটের সাবেক মেয়র মনিরউদ্দিন আহমদ প্রমুখ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানির জন্ম এই শহরে। তবে তিনি জুবিলি স্কুলের ছাত্র ছিলেন না।
স্কুলের ১২৫তম জন্মতিথিতে সকল কর্মব্যস্ততা ভুলে গিয়ে শিকড়ের টানে প্রাক্তন ছাত্ররা দূরদূরান্ত থেকে ছুটে যান তাদের জীবনারম্ভের সেই বিদ্যাপীঠে। আর বিভিন্ন ব্যাচের অ্যালামনাইর পদচারণায় দু’দিন (২১-২২ ডিসেম্বর, ২০১২) মুখর হয়ে ওঠে অতি পরিচিত সেই স্কুল চত্বর। তারা ফিরে যান তাদের ফেলে আসা আনন্দ উচ্ছল সোনাঝরা দিনে, রোমন্থন করেন কৈশোরের আবছা স্মৃতি, দ্বিধাহীন চিত্তে মেতে ওঠেন আড্ডায়, আলোচনা করেন স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা। কেউ কেউ নিজের ক্লাস ও বেঞ্চের বসার জায়গাটি দেখার লোভ সামলাতে পারেননি। নিঃসন্দহে এই মহতী আয়োজনের মধ্য দিয়ে রচিত হয় নতুন ও পুরাতনের মধ্যে এক চিরন্তন সেতুবন্ধন। সার্থক হয়েছিল এই অনন্য মহা মিলনমেলা, আনন্দে ভরে ওঠেছিল নবীনÑপ্রবীণের দেহ ও মন। মহানন্দে সম্মিলিত কণ্ঠে জয়ধ্বনি হয়েছিল : ‘জুবিলি স্কুল, তুমি চিরঞ্জীব, তুমি অবিনশ্বর’।
শিক্ষায় অনগ্রসর সুনামগঞ্জ মহকুমার সদরে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৪ সালে। তখন সুনামগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক ছিলেন সৈয়দ মুর্তাজা আলী। প্রধানত তার চেষ্টায়ই এই কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কলেজ প্রতিষ্ঠায় গৌরীপুরের জমিদার বীরেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী এককভাবে পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। তবে সৈয়দ মুর্তাজা আলী গ্রামে গ্রামে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ করেন। তাকে সাহায্য, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন জননেতা আব্দুল বারি চৌধুরী, মফিজ চৌধুরী, আব্দুল খালিক আহমদ, আব্দুল হান্নান চৌধুরী ও মকবুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখ। তারা উদ্যোগী না হলে তখন হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত সুনামগঞ্জে এই কলেজ প্রতিষ্ঠিতই হতো না। আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) মুনাওওর আলী, অক্ষয়কুমার দাস, মকবুল হোসেন চৌধুরী, আব্দুল বারী চৌধুরী, করুণাসিন্ধু রায় ও দেওয়ান আহবাব চৌধুরী এবং মফিজ চৌধুরী, আবু হানিফা আহমদ, রফিকুল বারী চৌধুরী ও মুজিবুর রহমান চৌধুরীসহ মহকুমার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে টাউন হলে কলেজের উদ্বোধন করেন আসামের প্রধানমন্ত্রী স্যার সা’দ উল্লাহ। এটি ছিল আসাম প্রদেশের প্রথম বেসরকারি বিজ্ঞান কলেজ। তখনকার দিনে সিলেট এমসি কলেজ ছাড়া অন্য কোথাও বিজ্ঞান পড়ানো হতো না। লক্ষণছিড়ির জমিদার আনোয়ার রাজা চৌধুরী হাসন নগরে ১৪ কেদার জমি দান না করলে এই কলেজের আদৌ কোনো নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়ে উঠত কি-না সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। অবশেষে আমার কলেজ জীবন শুরু হওয়ার দু’বছর আগে গত শতাব্দীর ষাটের দশকেই (১৯৬০) বৃক্ষরাজিশোভিত খোলামেলা ও মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে কলেজটি তার নিজস্ব জমিতে ও নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয়। আমাদের এই বিদ্যাপীঠটি ছিল ডিগ্রি কলেজ। অর্থাৎ দুই বছরের উচ্চ মাধ্যমিক ও দুই বছরের ¯œাতক কোর্স। যারা অনার্স পড়তো, তারা উচ্চ মাধ্যমিকের পরই গিয়ে ভর্তি হতো বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর পাসকোর্সের শিক্ষার্থীরা চার বছর শেষ করে ¯œাতকোত্তরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতো, নইলে চাকরির জন্য ধর্ণা দিতো। উচ্চ মাধ্যমিক ও ¯œাতকের প্রতিটি ইয়ার বা শ্রেণীতেই কিছু সংখ্যক ছাত্রী ছিল। জীবনে এই প্রথম কোÑএডুকেশন। অর্থাৎ একত্রে ছেলেÑমেয়েদের ক্লাস। ক্লাসরুমে একটি প্লাটফর্মের উপর ছিল অধ্যাপকের চেয়ারÑটেবিল। পেছনে ব্ল্যাকবোর্ড। ছাত্ররা বসতো তার সামনাসামনি, আর ছাত্রীরা বাঁদিকে, বিশেষভাবে নির্ধারিত স্থানে। ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে ছিল বিরাট দূরত্ব। ছেলেমেয়েদের মেলামেশার ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কড়া ছিলেন। কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে হলে অধ্যক্ষের অনুমতি লাগতো এবং কথা বলার সময় সাধু. রমেশ ধর, চান্দু মিয়া কিংবা খেলাপ আলী পিয়ন উপস্থিত থাকতো। তবে কলেজ ছাত্র সংসদ, সাংস্কৃতিক কর্মকা-সহ বিভিন্ন অছিলায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মেলামেশা হতো। কলেজ ক্যাস্পাসটি এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারির ফলে প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন প্রায় অসম্ভব ছিল। তারপরও দুঃসাহসী প্রেমিকÑপ্রেমিকাদের দীঘির পাড়ে দেখা যেতো। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। ১৯২৭ সালে কলকাতা থেকে এক যুবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন। একটি মেয়েকে দেখে তিনি জানতে চাইলেন সে কে। বন্ধুরা বললো, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ছাত্রী। ঐ যুবক মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সবাই বারণ করলো। বললো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলা যায় না। ‘আমি মানি নাকো কোনো বাধা, মানি নাকো কোনো আইন’ বলে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি নাম ?’ মেয়েটি বললেন, ফজিলতুন্নেছা। তিনদিন পর ২৯ ডিসেম্বর আজীবনের জন্য ঐ যুবকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো। এই যবকের নাম বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবির ‘বর্ষা বিদায়’ কবিতাটি ফজিলতুন্নেছাকে উদ্দেশ্য করে লেখা। তিনি জীবদ্দশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেননি, তবে তাকে সমাহিত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে।
কলেজ তার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গর্ববোধ করে। তাদের অনেকেই নিজ পেশার শীর্ষে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ প্রসুনকান্তি রায় (বরুণ রায়), আব্দুজ জহুর, অ্যাডভোকেট আব্দুস সামাদ, আব্দুল হক, আবুল হাসনাত আব্দুল হাই, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালেব আহমদ, গিয়াস উদ্দিন, জগৎজ্যোতি দাস ও আসগর আলী, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক আব্দুল হাই, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রয়াত দেওয়ান মহসীন রাজা চৌধুরী ও প্রয়াত ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী প্রমুখ।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে ১৯৬৪ সালে আমি গিয়ে ভর্তি হই তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই আমার অনার্স, ¯œাতকোত্তর ও চাকুরি জীবনের শুরু। আমার স্মৃতির মনিকোঠায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সুনামগঞ্জ জুবিলি স্কুল ও সুনামগঞ্জ কলেজ। বহু স্মৃতি বিজরিত এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমার খুব প্রিয়। আমি যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে লিপ্ত তখন এই কলেজের দুই বছরের অধ্যয়ন ছিল আমার পাথেয়। পঁচাত্তর বছর পূর্তিতে আমার প্রিয় কলেজকে বিজয়Ñঅভিনন্দন। কলেজের প্রাক্তন ছাত্ররা ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হীরক জয়ন্তী পালন করেন। এই দু’দিন সর্বত্র জয়ঢাক বাজে, সুসজ্জিত হয় কলেজ চত্তর, নির্মিত হয় স্মরণীয় স্তম্ভ এবং আকাশে উড়ে বিজয়ের পতাকা। স্বাস্থ্যগত কারণে এই মিলনমেলায় উপস্থিত থাকতে না পারার বেদনায় আমি মর্মাহত।
ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অ্যামেরিটাস।


