আমার স্মৃতিতে ভয়াল ২১ শে আগস্ট

আকবর হোসেন
আজ ২১ শে আগষ্ট। স্মৃতিতে ভাসে ভয়ংকর সেদিনের কথা। আমার দেখা ভয়াল সেই ২০০৪ সালের ২১ শে আগষ্ট একটি বিভীষিকাময় দিন। যন্ত্রণা আর কষ্টের দিন, না ভুলার দিন,স্বজন আর প্রিয়জন হারানোর দিন। এই দিনটি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ভয়াবহ ও কঠিন দিন। কারণ ২১ আগষ্ট দিনটিতে আমি বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ বিরোধী জনসভায় ছিলাম। জনসভার আগে কাকার(সুরঞ্জিত সেন) সাথে ঝিগাতলার বাসা হতে একসঙ্গে জনসভায় স্থলে আসি। ঘটনার ১৩টি বছর অতিবাহিত হলেও আজো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় সেই দিনের ভয়াল স্মৃতি,এখনো মনের অজান্তে চোখ দিয়ে পানি ঝরে, কখনোবা ভয়ে আতংকিত হয়ে হয়ে উঠি, কখনো বা স্বপ্নে সেই স্মৃতি গুলো চোখের সামনে ভেসে উঠে, মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় দু:স্বপ্নে। তখন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারি না, যন্ত্রণায় মন ছটফট করে, আমার সামনে  সেই দিন প্রাণ দিতে দেখেছি অনেক সহযোদ্ধাদেরকে। আমি ভাবি সেই দিন আমিও সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর মিছিলে শরীক হতে পারতাম। মাথার ভিতরে একটির পর একটি প্রশ্ন বার বার ঘুরপাক খায়। ২০০৪ সালের ২১ শে আগষ্ট পড়ন্ত বিকেল ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতি বিরোধী শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলছিল। জনসভা চলাকালীন সময়ের প্রথম দিকে আমি মঞ্চ, মানে খোলা ট্রাকের খুব কাছাকাছি ছিলাম, অধিকাংশ সময়ইটাই ছিলাম, একসময় সঙ্গে থাকা এলাকার বড়ভাই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও যুবলীগের কয়েকজনকে সাথে করে বাটা দোকানের কাছে এসেছিলাম ঝাল-মুড়ির জন্য। আমি সাধারণত কোন সভায় গেলে চারপাশ ঘুরে বেড়াই, মঞ্চের কাছাকাছি থাকি, এটা আমার অভ্যাস, সেদিনও ছিলাম। বাটা দোকানের পাশে আসার মিনিট পাঁচেঁক পর হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনতে পেলাম, এর পর আরো একটা, এরকম একের পর বিকট শব্দে বোমা ফাটছে, আর গ্রেনেড বৃষ্টির মত পড়ছে। কেউ যদি নিজের চোখে এই দৃশ্য না দেখে তাহলে বলে বা লিখে বুঝানোর মত নয়। শুরু হলো মানুষের দৌঁড়াদৌঁড়ি, চিৎকার, কান্নার রোল, বাঁচাও,বাঁচাও আর্তনাদ। ততক্ষণে রক্তে রঞ্জিত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সহ পুরো এলাকা। কেউ কাউকে উদ্ধারের মত নয়, যে যার মত দৌঁড়াচ্ছে, মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, রক্ত, আর রক্ত, চিৎকার আর চিৎকার। সেদিন নিথর দেহগুলি কেউ উদ্ধার করতে আসেনি। এত সহযোদ্ধার মৃত্যু এত কাছ থেকে দেখব জীবনে কখনো ভাবিনি। হামলার সময় মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় ও আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতা কর্মীদের মানবঢাল তৈরির ফলে শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই দিন শহীদ হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহর্ধমিনী মহিলা আওয়ামীলীগের নেত্রী আইভি রহমান, আব্দুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, হাসিনা মমতাজ, রীনা বেগম, মোস্তাক আহমদ, মাহবুবুর রশীদ, সুফিয়া বেগম, আবুল কালাম আজাদ, লিটন মুন্সি, মোহাম্মদ হানিফ, রেজিয়া আক্তার, রফিকুল ইসলাম ,আতিক সরকার, নাসির উদ্দিন, রতন শিকদার, আবুল কাশেম, মোমেন আলী, বেলাল হোসেন, জায়েদ আলী সহ ২৪ জন নেতাকর্মী। অনেকেই আবার হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। আবার হাসপাতালে নেবার পথে অনেকেই মারা গেছেন।
সেই ভয়াল দিনে শহীদ সকলকে জানাই অন্তরের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও যুগ্ম আহবায়ক বঙ্গবন্ধু পরিষদ,সুনামগঞ্জ জেলা ।