আমি এবং আমার শহর

ইশতিয়াক রুপু, নিউইয়র্ক।
আমি আমার শহরের কথা  বলব, যে শহর থেকে আমি পালাতে চেয়ে পারিনি আমাকে পালাতে দেয়নি। বোশেখ মাসের এক রাত পেরিয়ে সুবেহ সাদেকের পর পরই শহরে আমার নি:শব্দ আগমন। নানু খালারা ব্যস্ত হলেন।  বাবা আজান দিলেন, সব কিছু পারফেক্ট। ঘসে মুছে রাখা চিমনি বদল করে  লাগানো হারিকেন উঁচিয়ে নানী  বললেন, মাশআল্লাহ গোলগাল হবে । মা বাবা দুজনের কিছু কিছু পাবে। মাটির  মালসায় রাখা তুষের আগুনে নাভী সেঁকা সহ য়াবতীয় আয়োজন রুটিন মাফিক চলতে লাগল। হাঁসফাঁস গরমে সবাই অস্থির হলেও সব কিছু দেখভাল করতে কোন কমতি নেই।
বেড়ে উঠবার পরতে পরতে শহরের নানা স্বজনদের নানা কিসিমের পরশ আদর আর ছোঁয়ার মাঝে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা। শৈশবের দুরন্তপনার গল্প মা খালারা বলতেন, বিকালে সাদা শার্টের উপর ক্রস বেল্টের হাফ প্যান্ট (চেক রংগের) সাথে চকচকে কালো স্মল সাইজের পাম্প সু আর হাটু অবধি দুধসাদা নাইলনের মোজা পড়ায়ে খালারা বাসার সামনে চিলতে বারান্দায় তিন চাকার সাইকেলে বসাতেন । এলোমেলো দু চারটি প্যাডেল মেরে সামনের ছোট মাঠে নামতে চাইলে ইনছান মামু ধরে রাখত। আর তখনি নাকি পাড়ার  সমবয়সিরা দ্রুত মাঠ ছেড়ে নিরাপদ
দূরত্বে চলে যেতো। মোটা সোটা ছিলাম বিধায় হাতের নাগালে এলে অক্ষত অবস্থায় ফিরে যাওয়াটি নাকি ছিল ভাগ্যের ব্যাপার । পায়ে পায়ে কৈশোর  এল  প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণে কিছুটা বৈচিত্র ছিল। কোন এক শ্রেণী নাকি বালিকা বিদ্যালয়ে সমাপ্ত হয়।
বর্ষায় খোয়া উঠা সদর সড়ক দিয়ে স্কুলে যেতে হত। পাশে আমার খালার(বাপ্পুর আম্মা) বাসার পরের বাসাটি ছিল প্রয়াত আবু দাদের। উনাদের বাসার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল দিয়ে শহরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম হতে আসা ছোট ছোট নৌকাগুলি সদর রাস্তার লাগায়া রেইনট্রি গাছে লোহার জিঞ্জির দিয়ে বেঁধে রাখত। সুয়োগ পেলে নৌকায় উঠে পিছনের গলুই পর্যন্ত বসাটাই ছিল এক জাতীয় খেলা।
শীতে পৌষ সংক্রান্তিতে পাড়ায় খড় দিয়ে ঘর বানানোতে যাকে মেড়ামেড়ির ঘর বলতাম ও উৎসব আমেজে অংশ নিতাম। বিকালে শহরের পাশের আমন ক্ষেত থেকে ন্যাড়া সংগ্রহ করে টেনে  নিয়ে আনা হত আর তা দিয়ে বানানো হত মেড়ামেড়ির ঘর। টর্চের বাল্বে ব্যাটারী লাগিয়ে ঘরে বাল্ব জ্বালানো হলে একেবারে শত ভাগ ফকফকা। ভোরে উঠে বিকালে বানানো ঘরে আগুন দিয়ে তাপ পোহানো তে পাড়ার সবাই হাজির। তাই বলেই উৎসব রূপ নিত সার্বজনীন। বিকেলে  দল বেঁধে প্রতিবেশীদের বাসায় বাহারি পদের নানা পিঠা পুলি খাওয়ার আনন্দ। আজো এই বয়সে মনে দোলা দেয়।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী দেশ মুক্তির আন্দোলনের নানা ঘটনা সচক্ষে দেখা। আংশিক অংশগ্রহণও ছিল।
সেই সময়ের শহর ছিল মুক্তির নেশায় উত্তাল। সর্বস্তরের জনগণের স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন। মিছিলের শহর। প্রতিবাদের শহর। অন্দর মহলে থাকা মা বোনেরা সব ধরনের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। আন্দোলন আরো বেগবান হলো। অবশেষে দেশ মুক্তি পেলো ৭১ এর ডিসেম্বরে। সদ্য স্ব^াধীন দেশের শহুরে চিত্রটির মাঝে কিছু বুনো মোষের তাড়া আর দাপানির আওয়াজ পাওয়া গেলো। তারপরও  মনে হলো এসব আমাদের এ আমাদের একেবারে নিজস্ব।
শহরে ক্ষমতার কিছু প্রদর্শিত মহড়া হল দুঃখজনক ঘটনাও ঘটে গেল তারপরও মনে হল- সবাই যেন সমস্বরে বলছে আমরা শান্তি চাই। মিলে মিশে  ভাল থেকে সবার কাছে উদাহরণ হয়ে বাস করতে চাই। বাকীরা যেন সেই আহ্বান  মেনে নিল। আমরা এক হয়ে চলতে শুরু করলাম।             শীতের সেই কাক ডাকা ভোরে ঘিয়ে রংঙের পশমী চাঁদর গায়ে দিয়ে ফজর নামাজ শেষ করে যখন আমার বাবা হাঁটতে বেরোলেন তখন তারই সঙ্গী হলেন মোটা খদ্দরের চাঁদর জড়িয়ে এক হাতে পূজার নৈবেদ্যের জন্য জবা ফুলের সাঁজী। অন্য হাতে ফুল পেড়ে নেবার লম্বা বাঁশের কঞ্চি হাতে  পাশের বাসার ডাক্তার বাবু ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরী। পুরাপুরি নিঃসংকোচে নানা বাক্যালাপে সব বিষয়াদি নিয়ে আলাপ করতেন দুজনে। সবই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ও প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস এর উপর ভর করে। যাতে নেই অযথা রাগ করা। কোন আক্রমণাত্মক উক্তি।আরেক দলে পাড়ার দেবু  বৌদী ও রাহেলা ভাবী। সাথে কথায় কথায় খিল খিল করে হাসতে জানা অষ্টাদশী বা সপ্তর্ষী  ৩/৪ ননদের দল। মাঝে হঠাৎ চোখে পড়ে হন হন করে হেঁটে চলা জেলা সদরে কর্মরত পাড়ার কলেজ পাশ করা বড় ভাই। ছন্দের কোন বিচ্যুতি ঘটছে না। শহরের এই নান্দনিক রূপে কোন অবহেলার ছাপ ও পড়ছে না। ভীণন রোমান্টিক। আবেদন একদম সরাসরি। বুকের অলিন্দে বাজে মিলনের সেই ঐতিহাসিক সুর। যুগে যুগে সম বাসনায় লালিত লয়।
সেই শহরের আমি একটি অংশ। শক্ত কালো কয়লার সর্বোচ্চ তাপে পুড়ে উঠা মার্কার টকটকে লাল রংগের একটি ইঁট। সাম্যের শপথ নিয়ে একদম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চলেছি সমান তালে। শপথ নিয়েছি এই শহরের ঐতিহ্য টুকুন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। এক অজানা শক্তি বলে উপাসনালয় নিয়ে সৃষ্ট বিরোধে রৃখে দাঁড়েয়েছিলাম। খোলা রামদা, কুড়াল নিয়ে হাজার বিশেক উন্মুক্ত জনতার সামনা সামনি। ছিলাম আমরা দুজন প্রবাসী। দুইজন না ফেরার দেশে আর একজন নিজ গৃহে বর্তমান। আমার এই শহর কি দেয়নি? উজাড় করা ভালবাসা দিয়েছে। বন্ধু হয়ে প্রেমিকার উষ্ণতায় আলিঙ্গন করেছে। আমার পৌরুষ কে সেল্যুট করে বলেছে, এই তোমার অহংকার মাথায় ধরে রাখবা।
পরিশেষে এক ব্যতিক্রমী শহর অধিকর্তাকে স্মরণ করতে আমার মাঝে তাগিদ অনুভব করি। বিশাল এক হৃদয় ছিলো যার। পুরাটা সুর ছন্দ সব কিছুই নিখাদ প্রেমময় ছিলো। সেই পুরুষের কথা বলছি। চন্দ্রালোকিত রাতে জোৎ¯œা উপভোগ। কতই না কাব্যিক ভাবনার ফসল। অভিমানি কণ্ঠে বলতেন, সিলেটে চলে গেলো কেনো? ভীষণ টান ছিল সবার জন্য। শহরে এলে বলতেন, এসেছো ? আর যাবে না। আমরা সবাই মিলে শহরে বেড়াতে বের হবো। আমার শহর, তাই ছিলো শহরের আমন্ত্রণ, আজো সেই আমন্ত্রণ শুনি। আটলান্টিকের গভীর সোপানে নোঙ্গর করা জাহাজে বসে রোজনামচা লিখি। চিৎকার করে বলি আমি আসছি। চন্দ্র কে কম্পাস বানিয়ে। আর সূর্যকে শক্তি।
লেখক: আমেরিকা প্রবাসী লেখক।