আমি কি ভুলিতে পারি

স্টাফ রিপোর্টার
‘একুশ মানে মাথা নত না করা’- চিরকালীন এ স্লোগান স্বমহিমায় ভাস্বর। এখনও যে কোনো ক্রান্তিকালে একুশ আমাদের প্রেরণা জোগায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ভাষা আন্দোলন জাতির বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরে। বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়েই জড়িয়ে রয়েছে একুশের প্রেরণা। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দল-মত নির্বিশেষে উদযাপন করার মতো এমন কালজয়ী দিন এ দেশে দ্বিতীয়টি নেই।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবুল ফজল একুশ নিয়ে তার এক লেখায় লিখেছেন ‘মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি। ন্যায়ের দাবি, সত্যের দাবি- এ দাবির লড়াইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদরা প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, স্বভাবের ব্যাপারে, ন্যায় ও সত্যের ব্যাপারে কোন আপোষ চলে না, চলে না কোন গোঁজামিল। জীবন-মৃত্যুর ভ্রকুটি উপেক্ষা করেই হতে হয় তার সম্মুখীন।
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’- আবদুল গাফফার চৌধুরীর কথা ও শহীদ আলতাফ মাহমুদের অমর সুরে ফুটে ওঠা গভীর অনুভব ও বেদনার দিন একুশে ফেব্রুয়ারি আজ। আত্মত্যাগের অহংকারে জ্বলে ওঠার অনন্য এক দিন আজ। ভাষার অধিকারের পথ বেয়ে ভাষাভিত্তিক আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনায় জেগে ওঠার দিন আজ।
রক্ত-পলাশ ফোটার ৮ ফাল্গুুনের, একুশে ফেব্রুয়ারি আগুনঝরা দিনে মায়ের ভাষায় কথা বলার দাবিতে রাজপথ রাঙানোর স্মৃতি ও উত্তরাধিকার বাঙালি বহন করে চলেছে টানা ৬৯ বছর ধরে। বহন করবে আজীবন।
রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ এই মহান শহীদ দিবস শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, সফিউররা। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার প্রথম দৃষ্টান্ত এই ঘটনা। এর মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের সংগ্রামের সূচনা ঘটে এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি পায়।
বিশ্বের সকল জাতিসত্তার ভাষা রক্ষার দিন হিসেবে জাতিসংঘ বেছে নিয়েছে বাঙালি জাতির ভাষার জন্য লড়াইয়ের এ দিনটিকে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আজ বাংলাদেশের পাশাপাশি ইউনেস্কোর ১৯৫টি সদস্য এবং ৯টি সহযোগী সদস্য রাষ্ট্রের ছয় হাজার ৯০৯টি ভাষাভাষী মানুষ পালন করবে এই দিবস। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্য সাধারণ অর্জন।
এদিকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সুর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলনপূর্বক অর্ধনমিত রাখা এবং একুশের গান পরিবেশনা।
সকাল সাড়ে ৭টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও প্রভাতফেরি। সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা। সন্ধ্যা ৬টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পৌর বিপনী চত্বরে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।
মসজিদ, মন্দির ও গীর্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা। এছাড়াও সকল কিন্ডার গার্টেন স্কুল, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজসমূহে দিবস উপলক্ষে বইপড়া উদ্বুদ্ধকরণ, রচনা, হাতের সুন্দর লেখা ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করবে।