আসুন আজ সবাই বঙ্গবন্ধুর নামে শপথ নেই

হাজার বছরের পরাধীন একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করেছিলেন তিনি সম্মোহনী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব দিয়ে। অথচ স্বাধীনতার এই মহান রূপকারকে স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র চার বছরের মাথায় কতিপয় বিশ্বাসঘাতকের হাতে নির্মমভাবে নিহত হতে হল। একা নন। সপরিবারে। বিশ্বের বহু দেশে রাজনৈতিক নেতার ঘাতকের হাতে নিহত হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু এমন পরিবার ও আত্মীয়স্বজনসমেত নিহত হওয়ার দ্বিতীয় উদাহরণ আর নেই। বিশ্বাসঘাতকরা বিশ্বাসঘাতকতার নতুন রেকর্ড তৈরি করেছিল এই দেশে। ইতিহাসের সেই শোকাবহ বেদনা-বিধুর দিন আজ। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশ অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন। নতুবা সেদিন তাঁদের মৃত্যুও নিশ্চিত ছিল।  ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্টের সেই নির্মমতার পর জাতি পেরিয়ে এসেছে ৪২ বছর।  পচাত্তরের পর এই দেশটিকে যে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধু কন্যার সুদৃঢ় নেতৃত্বে এখন সেখান থেকে অনেকটাই স্বাধীনতার চেতনায় ফিরার ব্যবস্থা হয়েছে। পচাত্তরের ঘাতকদের বিচার শেষ হয়েছে। বিদেশে আত্মগোপনে থাকায় কয়েকজন ঘাতকের বিচারের রায় কার্যকর করা যায় নি এখন পর্যন্ত। চলমান আছে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার। এই যে ইতিহাসের পিছিয়ে পড়া আবারও স্বপথে ফিরে আসা এসবই আমাদের কাছে এক অনিবার্য রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং অবশ্যই এই জায়গা থেকে শিক্ষণীয় রয়েছে অনেক কিছু।
প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হলো যেকোন অর্জনকে ধরা রাখা এক সুকঠিন ব্রত। বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হয়েছিল তাঁর আকাশস্পর্শী উদারতার জন্য। স্বাধীনতার পর তিনি স্বজাতির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন অকুণ্ঠভাবে। তিনি সকলকে দেশ গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। যারা আদর্শিকভাবে ছিল স্বাধীনতার মৌল চেতনার বিরোধী, যে আদর্শবিরোধীরা তাঁর দলে এবং আশপাশে ভিড় জমিয়েছিল, তাদের প্রতিও তিনি কঠোর হতে পারেন নি। এই না পারার দায় মিটাতে হয়েছে তাঁকে পরিবার পরিজনসমেত প্রাণ বিলিয়ে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু আমাদেরকে শিক্ষা দেয় আদর্শের প্রশ্নে কোন ধরনের নমনীয়তা দেখানো ঠিক নয়। কারণ সুযোগ পেলেই ওরা লোকানো হিং¯্র নখর বের করে আনবেই। প্রশ্ন হলো বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ কি এই শিক্ষা গ্রহণ করেছে ? আজ যখন বিভিন্ন জায়গায় কথিত স্বাধীনতা বিরোধীদের আওয়ামী ছত্রচ্ছায়ার নীচে আশ্রয় নেয়ার অভিযোগ শোনা যায় তখন সংগত কারণেই এই প্রশ্ন এসে যায়। আদর্শকে ধারণ করে দল। আওয়ামী লীগ সেই আদর্শের ধারক, যে দল একটি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের মন্দ উপসর্গ দ্বারা এই বিশাল দলের কাউকে কাউকে আক্রান্ত হতে দেখলে তাই খারাপ লাগে সকলের।
১৫ আগস্টকে সামনে রেখে আমরা আজ বিন¤্র চিত্তে শ্রদ্ধা-ভালবাসায় স্মরণ করছি ওই দিনে ঘাতকের হাতে নিহত আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুসহ সকল শহীদদের। স্মরণ করার সাথে সাথে এই দিনটি হলো শপথ নেয়ারও দিন। আজ জাতিকে এবং জাতিকে নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তি ও সংগঠনকেও একই সাথে শপথ নিতে হবে, স্বাধীনতার অমর চেতনার পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান রেখে প্রিয় স্বদেশকে পৃথিবীর শীর্ষ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার। আসুন আজ সবাই বঙ্গবন্ধুর নামে শপথ নেই দেশ উন্নয়নের। তাহলেই কেবল বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে। নচেৎ লোক দেখানো সকল প্রয়াসই এক সময় ইতিহাসের বিচারে পরিত্যাজ্য হবে।