আ.লীগের মনোনয়ন কেন্দ্রীক বাকযুদ্ধ প্রকাশ্যে

বিশেষ প্রতিনিধি
ধর্মপাশায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীতা নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সমালোচনায়মুখর। স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন রোববার আইন শৃঙ্খলা সভায়ও বলেছেন, উপজেলার সেলবরস ইউনিয়নে মাদক মামলার আসামীসহ ১৬-১৭ টি মামলার আসামী রয়েছেন যে পরিবারে, ওই পরিবারের সদস্যকে নৌকা তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সেলবরস ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সুলতান তালুকদার বলেছেন, সংসদ সদস্য যেভাবে আওয়ামী লীগ করাতে চান, আমি সেভাবে করতে চাই না বলেই তিনি প্রকাশ্যে আমার বিরুদ্ধে সমালোচনা করছেন।
রোববার সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আইন-শৃঙ্খলা সভায় ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন তার উপজেলায় মাদক কেনাবেচা নিয়ে কথা ওঠান। এসময় তিনি বলেন, ধর্মপাশা ও নেত্রকোণার বারহাট্টার সীমান্ত গ্রাম সেলবরস ইউনিয়নের মির্জাপুরে মাদকাসক্তদের আস্তানা গড়ে ওঠেছে। ওখানে অপরাধ করে অপরাধীরা বারহাট্টায় চলে যাওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকেও কিছু করা সম্ভব হয় না। তিনি মির্জাপুরের মিল্টন তালুকদারের নামোল্লেখ করে বলেন, মাদকাসক্ত এই তরুণকে পুলিশ আটক করলেও ওখানে আরও মাদক সেবনকারী ও ইয়াবা আসক্ত এবং মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। এরা সামনের নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। তিনি মাদকাসক্ত তরুণ মিল্টন তালুকদারের পরিবারেরই এক সদস্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছে উল্লেখ করে বলেন, সুলতান আহমদ তালুকদার নামের ওই প্রার্থীকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির সুপারিশ করেছেন এবং মনোনয়ন ফরমে তার প্রশংসা করেছেন। সংসদ সদস্য বলেন, ধর্মপাশায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া কোন কোন প্রার্থী অযোগ্য ও অসামাজিক। সংগঠনের ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি তাদের নাম সুপারিশ করে জেলায় না পাঠালেও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদক তাদের নাম পাঠিয়ে সুপারিশ করেছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সময় এমপি রতন বলেছেন, তার নিজের নির্বাচনী এলাকায় কিছু অসামাজিক-অথর্ব লোকের হাতে নৌকা তুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি এই বিষয়ে প্রতিকার করার জন্য আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ধর্মপাশার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সুলতান তালুকদার সংসদ সদস্যের এভাবে কথা বলায় নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, আমি নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ধর্মপাশা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সদস্য আমি, উপজেলা কৃষক লীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, আমি রাজনীতি স্বচ্ছভাবে করি, এমপি সাহেব যেভাবে রাজনীতি করতে চান আমি সেভাবে করতে পারি না, আমার পরিবার নিয়ে তাঁর কথা বলা হাস্যকর, আমার পরিবারে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন, আমার ভাই অ্যাডভোকেট আব্দুল হাই তালুকদার ধর্মপাশা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, এখন সহসভাপতি। তিনি অসত্য বক্তব্য দিচ্ছেন। অবশ্য ভাই মিল্টন তালুদারের বিষয়ে কোন মন্তব্য করেন নি সুলতান তালুকদার।
এই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আলা উদ্দিনও সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে সমর্থন করে বললেন, আমি সেলবরস ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন যিনি পেয়েছেন তার ভাই ইয়াবা ব্যবসায়ী, একাধিক মাদক মামলার আসামী, প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে সমালোচিত করেছিল তার চাচাতো ভাই (তৎকালীন এপিএস) ওমর ফারুক তালুকদার। তার আরেক চাচাতো ভাই মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের আক্রমণে নিহত হয়েছে। আমি এখনো দলীয় মনোনয়ন পাবার আশা করছি।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ বললেন, সুলতান তালুকদারের পরিবার ধর্মপাশায় রাজনৈতিকভাবে বনেদি পরিবার, সুলতান তালুকদারের ভাই আবুল হোসেন ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, আরেক চাচাতো ভাই আব্দুল হাই তালুকদার ধর্মপাশা আওয়ামী লীগের ১৮ বছর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এমপি সাহেবের মতো উড়ে এসে জুরে বসেন নি এঁরা। তিনি বলেন, ধর্মপাশা আওয়ামী লীগ দুইভাগে বিভক্ত। একভাগে সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীরা। আরেকাংশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ত্যাগীরা। তৃণমুল থেকে দুইপক্ষের নামই গেছে, মনোনয়ন পেয়েছে ত্যাগীরা। এজন্যই এমপি সাহেবের প্রার্থীরা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছে। এর আগেও তারা স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। অনুপ্রবেশকারী ও বিদ্রোহীরাই ত্যাগীদের সমালোচনা করছে।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস বললেন, সেলবরস ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের প্রার্থী বা তার পরিবার আওয়ামী লীগ ঘরানার, তবে তার ভাই মিল্টন তালুদার মাদক মামলার আসামী হিসেবে কারাগারে আছে। তিনি জানালেন, ধর্মপাশার ৬ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের তালিকা থেকে কেবল দুইজন মনোনয়ন পেয়েছেন। অন্যদের নাম তালিকায় ছিল না।
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বললেন, ধর্মপাশায় তৃনমূলের মতামতের গুরুত্ব দিয়েই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং আমি কেন্দ্রে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। দলের মনোনয়ন বোর্ড বা বোর্ডের সভাপতি, দলীয় সভানেত্রী যাদের যোগ্য মনে করেছেন তাদের মনোনয়ন দিয়েছেন। দলীয় ফোরামে কথা না বলে সংসদ সদস্যের এ ধরণের বক্তব্য শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। অদক্ষতার পরিচয় বহন করে।