আ.লীগের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটি গঠনে ধীরগতি

বিন্দু তালুকদার
জঙ্গিবাদ রুখতে সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব জেলা, মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটি গঠন প্রক্রিয়া ঢিমেতালে চলছে। কমিটি গঠন করতে আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ দেয়ার প্রায় এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কমিটি গঠনের কাজে তৎপরতা দেখা যায়নি।
জানা যায়, প্রথমে ২১ জুলাই পর্যন্ত কমিটি গঠনের সময়সীমা ধরা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৩০ জুলাই করা হয়। সে লক্ষ্য সামনে রেখেই সারা দেশে কমিটি গঠনে তৎপর হন নেতাকর্মীরা। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দলের কারণে কেন্দ্রের বেধে দেয়া সময়সীমা পার হয়ে গেলেও কমিটি গঠনের জোর তৎপরতা দেখা যায় নি।
কোথাও কোথাও লোক দেখানো কমিটি গঠন হচ্ছে কাগজে কলমে ও দায়সারা গোছের। সুনামগঞ্জে জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন হচ্ছে কি না তা জানেন না দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। আবার বিভিন্ন উপজেলা নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, কমিটি গঠনের কাজ ও আলাপ আলোচনা চলছে। খুব শিঘ্রই কমিটি গঠন করা হবে।
আবার যাদের কমিটিতে রাখা হয়েছে তারা নিজেরাই জানেন না বলে বিষয়টি জানিয়েছেন একাধিক নেতাকর্মী। উপজেলা পর্যায়ের পদ-পদবীধারী নেতৃবৃন্দই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি-সদস্য সচিবের পদ দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়ে জেলা ও মহানগর নেতাদের আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে গত ৮ জুলাই দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ দুই পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠান। তাতে কমিটির সাংগঠনিক কাঠামো ঠিক করে দেওয়া হয়। চিঠিতে জেলা ও মহানগর কমিটিতে একজন সভাপতি, ১৯ জন সহ সভাপতি, একজন সদস্যসচিব এবং প্রয়োজনীয়  
সংখ্যক সদস্য রাখতে বলা হয়। অন্য সব পদ ঠিক রেখে উপজেলায় ১১ জন সহ সভাপতি, ইউনিয়নে সাতজন সহ সভাপতি ও ওয়ার্ডে তিনজন সহ সভাপতি নিয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিতে ২১ জুলাইয়ের মধ্যে কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
জানা যায়, এর আগে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের সময় সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও প্রতিরোধে সারা দেশে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিছু কমিটিও হয়েছিল। কিন্তু আগের সেই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। এবারে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে তৃণমূল পর্যন্ত কমিটি গঠনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। ফলে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটি অর্থবহ হবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। কারণ বর্তমানে এসব কমিটিতে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, মসজিদের ইমাম, স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের যুক্ত করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ১১ উপজেলার ৮৭ ইউনিয়নের অধিকাংশ উপজেলা ও ইউনিয়নে আজ পর্যন্ত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়নি। জেলা, ধর্মপাশা, তাহিরপুর উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে অন্য উপজেলাগুলো কমিটি গঠন করা হয়নি।
তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটির সহ সভাপতি নুরুল আমিন বলেন,‘আমাদের এখানে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে ঠিক তবে কমিটি সঠিকভাবে গঠন করা হয়নি। যাদের কাছে কমিটি গঠনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল তারা (সভাপতি আবুল হোসেন খা ও সাধারণ সম্পাদক অমল কান্তি কর) নিজেরাই সভাপতি ও সদস্য সচিবের পদ দখল করে নিয়েছেন। এতে দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন বিঘিœত হবে ।’
তবে এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবুল হোসেন খা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব অমল কান্তি কর।
জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদির আহমদ মুক্তা বলেন,‘ ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে  সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে দলের নির্দেশ আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি। তবে জগন্নাথপুরে কমিটি গঠন করতে আজ পর্যন্ত কোন সভা ও আলোচনা হয় নি।’  
জামালঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন বলেন,‘এখন পর্যন্ত আমাদের উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয়নি। অনেকের সাথে আলাপ-আলোচনা হয়েছে আমরা আশা করছি ২-৩ দিনের মধ্যেই কমিটি গঠন করা হয়ে যাবে।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন,‘ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাস বিরোধী নানা কর্মকান্ড করছি। যার কারণে কমিটিগুলো গঠন করতে আমাদের কিছু বিলম্ব হচ্ছে। ইতোমধ্যে শিমুলবাঁক ও জয়কলস ইউনিয়নের কমিটি গঠন করেছি। আমরা আশা করছি আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে সকল ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি গঠন করতে পারব।’
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ শামীম আহমদ বিলকিছ বলেন,‘ আমরা সভা করে ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি গঠন করেছি। উপজেলা কমিটিতে মনীন্দ্র তালুকদারকে সভাপতি ও অ্যাড. আব্দুল হাইকে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেউ যদি বলেন আমি ও আমরা জানি না তবে হবে না। কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা গত ২১ জুলাইয়ের আগেই কমিটি গঠন করেছি।’
দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও করিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আছাব উদ্দিন সর্দার বলেন,‘আমার করিমপুর ইউনিয়নে কমিটি গঠন করা হয়েছে। মনে হয় উপজেলা কমিটি গঠন করা হয় নি।’
শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুহিম চন্দ্র দাস বলেন,‘আমি ও সাধারণ সম্পাদক দু’জনই অসুস্থ ছিলাম। সাধারণ সম্পাদক সম্পাদক এখনও হাসপাতালে আছেন। তাই কমিটিগুলো করতে পারিনি। আমরা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সকল কমিটিই গঠন করব।’
ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের আহবায়ক আবরু মিয়া তালুকদার বলেন,‘আমরা আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির কাছ থেকে এধরনের কোন চিঠি পাইনি। গতকাল (বুধবার) জেলা কমিটির সভাপতি আমাকে টেলিফোনে বিষয়টি বলছেন। দেখি কোন চিঠিপত্র পাই কি না। তার পর কমিটি গঠনের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক বলেন,‘আওয়ামী লীগের কোন চিঠিপত্র আমরা আজও পাই নি। সরকারিভাবে নির্দেশিত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জেলা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কমিটির সহ সভাপতি আয়ুব বখগ জগলুল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মত বিনিময় সভায় বলেন,‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ কর্মসূচি ও কমিটি গঠনের কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে না। শুনেছি জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আমাকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। তবে আমার সাথে তাদের কোন আলাপ আলোচনা হয় নি।  আলোচনা করে কমিটি গঠনসহ দলীয় কর্মসূচি পালন করলে সবার জন্যই ভাল হত।  
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মতিউর রহমান দাবি করেছেন,‘২০-২৫ দিন আগেই সভা করে জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে তাঁকে সভাপতি, পৌর মেয়র আয়ুব বখত জগলুল, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা মুকুট ও সাবেক সহ সভাপতি অ্যাড. আপ্তাব উদ্দিনসহ ১৯ জনকে সহ সভাপতি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমনকে সদস্য সচিব করে ৮১ জন সদস্য রেখে জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেউ যদি বলেন আমি জানি না তাহলে হবে না, জেলা কমিটি গঠনের দিন সভা করেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই সভায় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীলদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করার জন্য,তারা কমিটি গঠনের কাজ করছেন। ’