কুমার সৌরভ
ইকবাল কাগজী এ যুগের সবচাইতে শক্তিশালী সার্বভৌম কবি। তিনি সমসাময়িক মানবাত্মার ক্রন্দনধ্বনি নিজের কানে শুনতে পান এবং তাঁর কবিতায় সেই কান্না খড়ের আগুন থেকে ছুটে আসা ফুলকির মত দিগবিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। হাওরের কথকতা তিনি গাছের উপড়ে চড়ে দেখেন না, দেখেন একেবারে দেখার হাওর কিংবা খরচার হাওরের পূবালী বাতাস গায়ে মেখে। তাই হাওরের কান্না তিনি শুনতে পান প্রাণের গভীর থেকে। এই উপলব্ধি মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত ‘বদলে দিতে হবে’ কবিতায়। সুদক্ষ কবি কল্পনা—বিলাসী হন, উপমা—আবেগে আক্রান্ত হন, এমন দৃশ্যপট তৈরি করে নেন শব্দের জাদুতে যা কি না হয়ে উঠে আরেক আকাক্সক্ষার জগত। তবে কবি কখনও মাত্রাছাড়া হন না, সমাজবিলগ্ন হন না। তিনি পা মাটিতে রেখে মগজকে নিয়ে যার অসম্ভব দূর আকাশে। সেখান থেকে তুলে আনেন এমন মণি—মানিক্য যা তার পায়ের নীচের মাটিকেই করে তুলবে আরও বেশি পলিশয়। ‘বদলে দিতে হবে’ কবিতায় তিনি কল্পনার চুম্বক দিয়ে বিপন্ন হাওরে টেনে এনেছেন কার্ল মার্কস ও আলতাফ পারভেজকে। একজন দুনিয়াকে বদলে দিতে চেয়েছেন। চেয়েছেন সকল মানুষের জন্য সাম্যের পৃথিবী গড়তে। আর আলতাফ পারভেজ আমাদের কৃষককূল জাতীয়—আন্তর্জাতিক কাঠামোর আওতায় কেমন করে চরম শোষণের শিকার হন তার হিসাব—নিকেশ—তথ্য—ঠিকুজি সমেত হাজির করেছেন ‘ধান চাষের প্রতিবেদন’ নামক ক্ষুদ্র একটি গ্রন্থে।
আমাদের সমাজের একটি সুবিধাপুষ্ঠ শ্রেণি নিজেদের পরিকল্পিত তস্করবৃত্তি—দুর্বৃত্তপনাকে অনায়াস দক্ষতায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেরা দায়মুক্ত হতে পারঙ্গম। সম্প্রতি শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত—সংস্কারকৃত ফসলরক্ষা বাঁধের উল্লেখযোগ্য অংশ আকষ্মিক ঢলের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে ব্যর্থ হয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে গিয়ে কিছু সংখ্যক হাওরের ফসল তালিয়ে দেয়। ঠিক এরকম সময়ে এতদ্বিষয়ক প্রাযুক্তিক (পাউবো’র প্রকৌশলী, নানা স্তরের) হাওর তলিয়ে যাওয়ার জন্য ইঁদুর ও কাঁকড়া তত্ত্ব আমদানি করে বলতে চাইছেনÑ বাঁধ ভাঙার জন্য আসলে দায়ী ওইসব নাদান ইঁদুর ও কাঁকড়ার দল। কবি এই জায়গায় বেশ হতাশা নিয়ে আলতাফ পারভেজের মুখ দিয়ে এখন থেকে প্রাযুক্তিক দায়িত্ব পাউবো’র প্রযুক্তিবিদদের পরিবর্তে ইঁদুর—কাঁকড়ার উপর ন্যস্ত করার সুপারিশ করিয়ে ছেড়েছেন। কবি কবিতায় এখানে ব্যাঙ্গবিদ্রুপাত্মক হয়ে উঠেছেন সত্যি কিন্তু বরফের ছুড়িটা ঠিক কলিজা বিদ্ধ করে, যাকে করবার তাকে। প্রযুক্তিবিদের কাঁকড়া তত্ত্ব শুনে পারভেজ বলছেনÑ ‘‘হ্যা, দেখেছি তো।/ ইঁদুর ও কাঁকড়ারা কাঠামোগত সহিংসতার প্রযুক্তি প্রয়োগে/ আপনার চেয়েও এককাঠি বাড়া।/ সত্যি অবাক হতেই হয়, না হওয়ার কোন যুক্তি নেই। আমি অবশ্যই/ এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করবো ঢাকায় গিয়েই এবং/ সা¤্রাজ্যবাদী পুঁজিচক্রকে পাউবোর প্রযুক্তিবিদের দায়িত্ব ইঁদুর অথবা কাঁকড়া যে—কারও অপর অর্পণ করতে সুপারিশ করবো।’’ কবিতায় প্রতিবাদ হয়, প্রতিবাদের এই অস্ত্র এতো শক্তিশালী যা সর্বাধুনিক পারমানবিক অস্ত্রের চাইতেও শক্তিমত্ত হয়ে উঠতে পারে। বলতে চাই, বলতে পারি না ধরনের কথা আলংকারিক উপমায় কবিতায় বাঙময় হয়ে উঠতে পারে। কবিতার ¯্রষ্টাকে হতে হয় সে—জায়গায় সমাজের পরিব্রাজক। সমুদ্র মন্থন করার মত করে তিনি সমাজের ভিতর থেকে মূল কথাটি পেড়ে আনতে পারেন। আমাদের হাওরপাড়ের কৃষকরা সকলেই জানেন, এ—সব দুর্বল বাঁধ সত্যিকার দুর্বিপাকে কস্মিনকালেও ন্যূনতম কাজে লাগবে না। বাঁধ তৈরির সময় তাঁরা থাকেন উহ্য। কাগজে তাদের মতামত গ্রহণের একধরনের আমলামীপনা থাকলেও সত্যিকার অর্থে তাদের বোধহীন মানব ভাবা হয় ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে। এই ক্ষমতাকেন্দ্রের দুর্নীতিবাজরা নিজেদের ছাড়া আর কাউকে বুদ্ধিমান ভাবে না। তাই এরা নির্লজ্জভাবে নিজেদের দুর্নীতির দায় ইঁদুর—কাঁকড়াদের উপর ছেড়ে দিতে পিছ পা হয় না। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সত্যিই নির্বোধ? যে কৃষক কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা দীর্ঘ—মধ্যম—স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ ছাড়াই কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে পারে, যে কৃষক নিজের বুদ্ধি খরচ করে কৃষিতে আধুনিক জাতের ধানের চাষ করে ফলন দুই গুণ তিন গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে; সেই কৃষককে নির্বোধ ভাবা আরেক অর্বাচীনতার লক্ষণ। ক্ষমতার তাঁবেদার আর উচ্ছিষ্টভোগী ছাড়া বাকি সব মানুষ বাঁধ নির্মাণের পিআইসি নিয়ে সবকিছু জানে। আর কবি যেহেতু মানুষের ভাবনারই প্রতিধ্বনি ঘটান, তাই তিনি প্রকৃত অর্থে সর্বজ্ঞ বটে। তাই যথার্থ কবিতায় যথার্থ সমাজ—ভাবনা উঠে আসে, যেমন এসেছে কবি ইকবাল কাগজীর ‘বদলে দিতে হবে’ কবিতায়।
আলতাফ পারভেজ তার ধান চাষের প্রতিবেদন গ্রন্থে কৃষকরা কীভাবে জাতীয়—আন্তর্জাতিক পুঁজিচক্রের পরিকল্পিত বিন্যাসের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত হন তা হিসাব করে দেখিয়েছেন। পারভেজ একে কাঠামোগত সহিংসতা বলেছেন। কৃষি জমির উপর কৃষকদের অধিকার ক্রমবিলীয়মান। সেই সময় বেশি দূরে নয়, যখন আমাদের বাপ—দাদার জোতজমি হয়ে উঠবে না—দেখা মালিকের বৃহৎ শিল্পখামার। সেখানে কৃষক ‘একদা তার নিজের’ জমিতে শ্রম দিবে নামমাত্র মজুরির বিনিময়ে। আর সেই খামারে উৎপাদিত চাল বিভিন্ন ব্র্যান্ড—নামে মোড়কজাত হয়ে বিক্রি হবে বহু দামে। কৃষি—মজুররা সেই চাল কিনে খাবে মজুরির টাকায়। লক্ষণ এখনই দৃশ্যমান। বাজারে চালের দোকানে নানা বহুজাতিক সংস্থার প্যাকেটবন্দি চাল আর চড়া দামে বিক্রি হওয়া থেকে তা বেশ বুঝা যায়। পুঁজিচক্র সুনিপুণ চক্রান্ত—জাল বিছিয়ে কৃষকদের জমিহারা করার ষোলকলা পূর্ণ করার কর্মে বেশ গতি নিয়ে এগুচ্ছে। আজ যারা কৃষকদের কাঠামোগত সহিংসতায় ছিন্নভিন্ন করছে কিছুদিন পরে তারাই আমাদের জমি দাপিয়ে বেড়াবে। সেই ভবিতব্যকে আশু আমন্ত্রণ জানানোর জন্য এই বাঁধ দুর্নীতিবাজরা ছিঁচকে তাঁবেদারের দায়িত্ব পালন করছে মাত্র।
কবি শুধু অবস্থার ব্যাখ্যাই করেন না, তিনি পথও দেখান। সাম্যবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা কার্লমাক্স যেমন বলেছেনÑ পৃথিবীকে বহু দার্শনিক নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কিন্তু আসল কাজ হলোÑ একে বদলে দেয়া। এই কথাটিকেই কবি মূলমন্ত্র ধরেছেন। তিনিও কবিতায় বলেছেন, ‘‘অন্যমনস্ক একমেবাদ্বিতীয়ম দার্শনিক মার্কস/ তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘বদলাবার কথা বলেছো তো? ঠিক!/ এখন ব্যাখ্যা করার সময় নয়, সব কীছু বদলে দিতে হবে/ জগত বদলে দিতে হবে’’।
যেকোন কাঠামোয় একমাত্র বদলই অনিবার্য। বদল ছাড়া গতি অর্থহীন, অগ্রগতি তো একেবারেই নৈব নৈব চ। কিন্তু বদলানোর জন্য দার্শনিক দরকার, প্রথপ্রদর্শক দরকার, দরকার নেতৃত্ব—সংগঠন। মার্কসের কথা আমাদের কানে যতোই মধু ঢালুক, পারভেজ যতই গবেষণা করে কৃষকের হাড়—মাংস খাওয়ার গলি—ঘুপচির সন্ধান করুন, কবি যতোই কবিতার পঙক্তিতে বিদ্রোহের সুর তুলুন; বদলানোর অনিবার্যতাকে প্রকটিত করা ও একে চূড়ান্ত সফলতা দান করতে হলে বদলে দেয়ার শক্তির উত্থান চাই। সন্দেহাতীতভাবে যার আপাত লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। তাই সকলেই সবকীছু বুঝলেও চুপ মেরে থাকেন। একজন গোঁয়ারগোবিন্দচাষা আব্দুল মালেক (ধর্মপাশার কৃষক, যিনি পানিসম্পদ উপমন্ত্রীকে পিআইসি বাণিজ্যের অজানা রহস্য জানিয়ে বেশ আলোচিত হয়েছেন) ব্যতিক্রম। লাখে লাখে কৃষকের মাঝে আব্দুল মালিক নিতান্তই অগণ্য। নগন্যও বটে। তাঁকে অকুস্থলেই হুমকি খেতে হয়েছে বেয়ারাপনার জন্য। হয়তো ভবিষ্যত এই হতভাগ্য আব্দুল মালেকের জন্য খারাপই বলা যেতে পারে। রোষবহ্নির শিকার হয়ে তিনি কত প্রকারে হেনস্তা হতে পারেন ভেবে আমাদের গা শিউড়ে উঠছে। কুর্ণিশ হে বিদ্রোহী কৃষক। তুমি প্রতিবাদের একটুখানি স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছো হাওরের বানভাসা নির্বিকার মানুষের জগতে। এ থেকে যদি দাবানল হয়, যদি উদ্যাম পাহাড়ি ঢলের নৃত্যমুদ্রার মতো বিদ্রোহী হয়, যদি কালবোশেখির মতো ঝঞ্ঝাময় হয়; তবেই বদলে দেয়া সম্ভব। কারণ বদলটাই অনিবার্য। কবি ইকবাল কাজগী যেমন বলেছেন কবিতার শেষ স্তবকেÑ‘‘তারপর একবিংশ শতাব্দীর মার্কস এরালিয়াকোণা ভাঙা বাঁধের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলেন/ একবিংশ শতাব্দীর মার্কস পারভেজ তাঁর পাশে/ এবং চরাচরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো কেবল/ ‘বদলে দিতে হবে! বদলে দিতে হবে! বদলে দিতে হবে!…’’ এই কবিতার মধ্য দিয়ে কবি নিজেকে কৃষক আব্দুল মালেকের সগোত্রীয় করে তুলেছেন। নিঃসঙ্গ শেরপারা যেমন করে হিমশীতল এভারেস্টশৃঙ্গে বেঁচে থাকার জীবনমন্ত্রে নিজেকে উত্তপ্ত রাখতে পারেন, যেমন পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে নিঃসঙ্গ নভোচারী মৃত্যুর মতো স্তব্ধ দূরত্বের নভোযানে চড়ে পৃথিবীকে নিয়ত সরবরাহ করেন মহাজাগতীয় অজানা রহস্য; তেমনি কবি এবং আব্দুল মালেক উভয়েই এক অসম্ভব আপোসকামী সমাজ ব্যবস্থার কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের সাহসের তীরে বিদ্ধ করেন। আমরা সেই তীরে বিদ্ধ হতে চাই, রক্তাক্ত হতে চাই। ভীরুতার জমিনে ফুটুক সাহসের অজ¯্র রক্তজবা, ডুবন্ত হাওরে ভাসুক লালপদ্ম। প্রতিটি মানুষের চেহারা হোক আব্দুল মালেকের মতো। প্রতিটি মানুষের উচ্চারণ হোক কবির কবিতার মতোÑ বদলে দিতে হবে! বদলে দিতে হবে! বদলে দিতে হবে!
কবির কবিতাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হোক, জয় হোক অমোঘ সত্য উচ্চারণেরÑ ‘‘এই ঢেউ মার্কসের বিশ^ব্রহ্মাণ্ডভেদী চোখে/কৃষকের চোখের জলের ঢেউ হয়ে যায়/ঢেউয়ের শব্দগুলো ক্রমাগত বদলে যায়/অনাগত দ্রোহের ধ্বনি হয়ে বদলে যায়/হয়ে উঠে বিপ্লবের ঢেউ।’’
- তাহিরপুরে অ্যাপ’স এর মাধ্যমে কৃষক নিবন্ধনের জন্য মাইকিং
- হাওরে বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারি টাকা লুটপাট হচ্ছে


