ইতিহাস ঐতিহ্যের সংগ্রহশালা ‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর’

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্যের সংগ্রহশালা ‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর’ খোলা দেখতে চান দর্শনার্থীরা। দর্শনার্থীরা মনে করেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে একটি নির্দিষ্ট সময়ে জাদুঘর খোলা থাকলে শিশু কিশোররা এখানে আসতে পারতো। করোনার আগেও প্রতিদিন সময় মতো জাদুঘর খোলাও হতো না বলেছেন স্থানীয়রা। এছাড়া জাদুঘরে রাখা কিছু বিলুপ্ত প্রজাতির মাছের পাশে নাম না থাকার কথাও জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা। প্রতœতত্ত্ববিদরা বলেছেন, এই জাদুঘরকে প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘরে রূপান্তর সম্ভব।
মেঘালয়ের পাদদেশের জেলা শহর সুনামগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পাড়ের চমৎকার পরিবেশে আসাম প্যাটার্নের কাঠের পাটাতনের উপর নির্মাণ করা প্রাচীন কালেক্টরেট অফিসে ঘরে গড়ে তোলা হয়েছে সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর।
প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো পরিত্যক্ত আদালত ভবন ছিল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সুনামগঞ্জের বাসিন্দা পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক ও তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইয়ামিন চৌধুরী’র প্রচেষ্টায় ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি সুনামগঞ্জকে জানতে ও দেশবাসীর কাছে জেলার পরিচয় তুলে ধরতে এই ঐতিহ্য জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে যখনই যে জেলা প্রশাসক এখানে দায়িত্ব পালন করেছেন এই জাদুঘরের সংগ্রহ বাড়িয়েছেন।
২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের ১৭৬ তম সভায় সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য জাদুঘরকে জাতীয় জাদুঘরের শাখা হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়। জেলার পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধসহ সব স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে এই জাদুঘরে। করোনাকালের আগে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সকাল ১১ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা ও সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারে দুপুর ২ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত খোলা রাখার সময়সূচি ছিল জাদুঘরের। তবে বেশির ভাগ দিনেই এই সময় পর্যন্ত খোলা না রাখার অভিযোগ ছিল স্থানীয় লোকজনের।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি, ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রকৃতি, জীবন ও জীবিকা এই পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে ঐতিহ্য জাদুঘরটি। ৬ কক্ষ বিশিষ্ট জাদুঘরে সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, লোককবিদের পোট্রেটসহ তাদের গানের প্রকাশনা, পুরনো নানা বাদ্যযন্ত্র, হাওরের প্রাণ-বৈচিত্র, মিঠা পানির নানা জাতের মাছ এবং হাওরাঞ্চলের মানুষের ব্যবহারের নানা উপাদান রাখা হয়েছে। তবে জাদুঘর খোলা রাখার সময়সূচি মানা হচ্ছে না।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক ইতিহাস অনেক পুরনো। এই জাদুঘরে অনেক হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। মরমি সাধক রাধারমণ, হাছনরাজা, শাহ্ আব্দুল করিম, দুর্বিন শাহ্’এর ব্যবহার করা অনেক কিছুই রয়েছে এই জাদুঘরে। কিন্তু অনেক পুরাতন প্রাণি, বস্তু বা ব্যবহার্য দ্রব্যাদির পাশে নাম না থাকায় নতুন প্রজন্মের এগুলো জানতে অসুবিধা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ শহরতলির ইব্রাহিমপুরের বাসিন্দা গণমাধ্যমকর্মী আকরাম উদ্দিন বললেন, জাদুঘরটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এর কদর কমে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দিলে নতুন প্রজন্ম এখানে এসে জানার সুযোগ পাবে।
সংস্কৃতিকর্মী পুলক রাজ বললেন, করোনার আগেও সঠিক সময়ে খোলা থাকতো না ঐতিহ্য জাদুঘর। এখন বন্ধই আছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটি খোলে দিতে হবে। এই ক্যাম্পাসে একটি ক্যান্টিন থাকলে ভাল হয় বলে মন্তব্য তার।
সিলেটের রায়নগরের দর্শনার্থী নিপা বেগম বললেন, এই জাদুঘর দৃষ্টিনন্দন, ভেতরেও দেখার এবং জানার অনেক কিছুই আছে। তবে এটি খোলা না থাকায় দর্শনার্থীরা এসে ঘুরে যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ঐতিহ্য জাদুঘর এই জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন প্রতিষ্ঠান। এর চত্ত্বরে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও মুক্তমঞ্চ তৈরি হওয়ায় এই এলাকাটির গুরুত্ব বেড়েছে। ঐতিহ্য জাদুঘরের স্থাপনার পুরোনো প্যাটার্ন ঠিক রেখে আমরা এখানে প্রতœতাত্ত্বিক সংগ্রহ বাড়াবো। চলমান লকডাউনের মেয়াদ শেষ হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটি খোলে দেবার কথাও জানালেন তিনি।
সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘরকে প্রতœতাত্মিক জাদুঘর হিসাবে রূপান্তর করা যেতে পার বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান।
সোমবার বিকালে তিনি এই প্রতিবেদককে বললেন, প্রত্যেক জেলায় প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহ্য জাদুঘর করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের। সুনামগঞ্জে এই জাদুঘরকে প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘরে রূপান্তর করে দেশবাপি এই প্রকল্পের কাজ শুরু করা যেতে পারে। এই জাদুঘরে জেলার নানা প্রতœবস্তু সংরক্ষণ করে এই গুরুত্ব আরও বাড়ানো যাবে।