ইব্রাহিমপুর থেকে ডলুরা শহীদ মিনার

আকরাম উদ্দিন
সুরমা নদীর পাড়ে অবস্থিত সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের ইব্রাহীমপুর গ্রাম বালু-পাথর সমৃদ্ধ এলাকা হিসাবে পরিচিত। প্রতিবছর জেলার বাইরে থেকে মালামাল নিতে শতাধিক কার্গো, বার্জ ও ষ্টীলবডি নৌকা আসে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ইব্রাহীমপুরের ঘাটে নদীতে ভেসে থাকতে দেখা যায় এসব যানবাহন। এসময় চোখ জুড়ানো দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
এই গ্রামে রয়েছে মরমী কবি এলাহীবক্স মুন্সী’র মাজার। তিনি গান রচনা করেছেন ‘ওমন এ নিশ্বাসের নাই রে বিশ্বাস।’ এরপর ‘সঙ্গি যোগার কররে মন তুই, সঙ্গি যোগাড় কর, ডাক দিলে চলিয়া যাইবায় ছাইরা বাড়ি-ঘর।’ এমন অনেক আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছেন তিনি। এই মরমী সাধক কবির জন্ম ১৮৬২
সালের ২৩ মে সুনামগঞ্জ পৌরসভার তেঘরিয়ায় এবং ইন্তেকাল করেন ১৯৩৭ সালের ২৩ মে সদর উপজেলার পূর্বইব্রাহীমপুর গ্রামে। এই কবির মাজার থাকলেও কোনো সময় ওরশ হয়নি। তবে বাড়ি বাড়ি পালা করে গান করেন স্থানীয় প্রবীণেরা। এলাহীবক্স মুন্সীকে নিয়ে গবেষণা করা হলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে যা উন্নত জীবন গঠনে সহায়ক হতে পারে।
ইব্রাহীমপুর গ্রাম এবং হালুয়াঘাট থেকে মোটর বাইকে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ডলুরা শহীদ মিনারে যাওয়া যায়। দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ঐতিহ্যবাহী পর্যটন এলাকা চলতি নদী। ভারতের পাহাড় থেকে বেয়ে আসা চলতি নদীর মনোরম পরিবেশ। বর্ষায় বালু, পাথর ও গাছ এবং শুকনা মৌসুমে জল শূন্য নদীর অপূর্ব দৃশ্য। বিভিন্ন স্থানে আছে কাঁশফুল। নদীর দুই পাড়ে বালু। নদীর মধ্যে অল্প পানি। পানির স্বচ্ছতায় হাঁটতে ভাল লাগে। দর্শনার্থীদের সময় কাটানোর নির্জন স্থান এই চলতি নদী এলাকা। সরকারী ছুটির দিনে এখানে গিয়ে অনেকেই সময় কাটান। নদীর পূর্বপাড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ডলুরা শহীদ মিনার। বিশেষ দিনগুলিতে এই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান সকল শ্রেণী পেশার মানুষ। শহীদ মিনারের ভেতরে আছে ৪৮জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধিস্থল। উত্তরে ভারত সীমান্তের কাটাতারের বেড়া। খালি চোখে দেখা যায় ভারতের পাহাড় ও বসতিদের স্থাপনা। শহীদ মিনারের পূর্বপাশে রয়েছে সাধারণ মানের রেষ্ট হাউজ। এখানে দর্শনার্থীদের অল্প সময় বিশ্রামের সুব্যবস্থা। আছে একাধিক বসার স্থান। বেষ্টনীর ভেতরে দক্ষিণে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় ভাস্কর্য।
এই শহীদ মিনার থেকে কিছু দুরে পূর্ব দিকে রয়েছে নবনির্মিত বর্ডার হাট। এই বর্ডার হাট দুই দেশের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত। প্রতি মঙ্গলবার উভয় দেশের নাগরিক ব্যবসায়ীদের পণ্য বেচাকেনা হয়। দর্শনার্থীদের সম্মিলনস্থল বর্ডারহাট। অবসর সময় কাটানোর মনমুগ্ধকর পরিবেশ ও সুন্দর স্থান এই বর্ডার হাট এলাকা। বর্ডার হাটের পাশে রয়েছে কয়েকটি ছোট ছোট পাহাড় এটি বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত। পাহাড় দেখা বিশ্ব দেখা, এমন চিন্তা ভাবনা থেকে পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় উঠে কিছু সময় পার করা যায়।
ঐতিহ্যবাহী নারায়নতলা মিশন হাইস্কুল। মিশনের ভেতর এলাকায় আছে হযরত মরিয়মের ‘গ্রোথ’ গুহা। অসংখ্য ফুলের বাগান রয়েছে মিশনের আঙিনা জুড়ে। এলাকার চিনাউড়া গ্রামের উত্তরে ভেষজ বাগ। এই ভেষজ বাগ পুরোটি পাহাড়ের উপর গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্রাম নিতে আছে ছোট একটি গেস্টবাড়ি। ভেষজ বাগের নাম ‘এসুথ’। এর মানে এসো সুস্থ থাকি। বাগানের মালিক সুনামগঞ্জ শহরের বাসিন্দা রেজাউর রহমান রেজা। তিনি ছিলেন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকার এক সময়ের অত্যন্ত সাহসী সম্পাদক এবং সাংবাদিক। মঙ্গলকাটা বাজারের পার্শ্বে আছে রাবারড্যাম্প। এটাও দর্শনার্থীদের দেখার মনোরম স্থান।
রঙ্গারচর ইউনিয়নে রয়েছে কাংলার হাওর সমৃদ্ধ এলাকা। এই প্রশস্ত কাংলার হাওরে রয়েছে মিঠাপানির মাছ। হাসাউড়া এলাকায় রয়েছে মিষ্টি আনারসের বাগ। বাগে আছে কাঁঠাল, কমলা, পিয়ারা, পেঁপেঁ, তাল, আখ, কুলবড়ই ইত্যাদি। ছোট বড় পাহাড়ের উপরে ও নিচে এসব বাগান গড়ে উঠেছে। শুকনা ও বর্ষা মৌসুমে হাসাউড়ার বাগানের ফল পাওয়া যায়।
এসব দর্শনীয় স্থানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম মোটরবাইক। এসব এলাকায় যেসব মোটরবাইক চলাচল করে, এইসব মোটরবাইকের ভাড়া অন্যান্য এলাকা থেকে তিনগুণ বেশি। কেউ এইসব এলাকায় যাতায়াত করতে চাইলে অবশ্যই নিজের মোটরবাইক নিয়ে চলাচল করা নিরাপদ। তবে ভাড়ায় চলাচল করলে অবশ্যই ভাড়া নির্ধারণ ও সময় নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করে যাত্রা করবেন।