ইমরান খানের গ্রেফতার ও পাকিস্তানের বিপন্ন গণতন্ত্র

পাকিস্তানের রাজনীতি বেশ অশান্ত হয়ে উঠেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই (পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ পার্টি) প্রধান ইমরান খানকে মঙ্গলবার বিকালে ইসলামাবাদে হাইকোর্টের বাইরে থেকে গ্রেফতার করে সে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর (রেঞ্জার্স) সদস্যরা। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটি মামলা ছিলো এবং এই মামলায়ই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পাকিস্তানের পিুলশ প্রধান জানিয়েছেন। ২০১৯ সনের সাধারণ নির্বাচনে পিটিআই সংখ্যাগরিষ্টতা পেলে সাবেক বিশ্বনন্দিত ক্রিকেটার ও পাকিস্তানের বিশ্বজয়ী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটি নিজেদের রাজনৈতিক অপ—ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ইমরান খানকেও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। ২০২২ সনের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাবে হেরে গেলে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারান ইমরান খান। ওই অনাস্থা প্রস্তাবের পিছনে যথারীতি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ইন্ধনের কথা প্রকাশ্যেই সমালোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। ক্ষমতাসীন থাকতে ইমরান খান পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অত্যধিক নাক গলানোর অভ্যাসকে ভালো চোখে দেখেননি। এ নিয়ে নিজের অসন্তুষ্টির কথা তিনি প্রকাশ্যেই ব্যক্ত করেছেন। তাই সেনাবাহিনী একসময় তাঁকে অপছন্দ করতে শুরু করে। আর কে না জানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপছন্দের তালিকায় নাম উঠিয়ে কোনো রাজনীতিবিদ সে দেশে ক্ষমতায় থাকতে পারে না। ইমরান অবশ্য ক্ষমতা ছাড়ার আগে আমেরিকার বিরুদ্ধেও মুখ খোলেছিলেন। অনুমিত হয় যে, সে সময় আমেরিকাও তাঁর উপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলো। ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই ইমরান খান নিজের গ্রেফতার কিংবা হত্যার শিকার হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাই সত্য হলো। তবে ইমরান খানের গ্রেফতারের পর তাঁর দল ও সমর্থকরা সারা পাকিস্তানজুড়ে যে বিক্ষোভ—প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করেছেন এবং যা অনেকক্ষেত্রে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে তা থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খানের প্রভাব ও জনমনে তাঁর সমর্থনের বিষয়টি বেশ বুঝা যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা প্রায় ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ নির্বাচন দিলেই তাঁর বিজয় সুনিশ্চিত বলে ধারণা করা হয়। সুতরাং পাকিস্তানের পাওয়ার হাউস এই তেজি ঘোড়াকে বাইরে মুক্ত অবস্থায় রেখে দিতে পারে না।
সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত ক্ষমতালিপ্সার কারণে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি নানাভাবে দায় শোধ করে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে দুর্বল ও বিপন্ন করে তুলছে। এই দেশটির গণতন্ত্রের দুর্ভাগ্য এই যে, ১৯৪৭ সনের পর থেকে কোনো নির্বাচিত সরকারই নিজেদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। বেশিরভাগকেই হত্যা, ফাঁসি, দেশান্তর প্রভৃতির শিকার হতে হয়েছে। পাকিস্তানের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রবাসী সাংবাদিক ও শিক্ষক মাসকাওয়াথ আহসান ইমরানের গ্রেফতারকে সে দেশের মানুষের জন্য ‘ফাইনাল কাউন্টডাউনÑ করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’ হিসাবে মনে করছেন (দৈনিক সমকাল, ১০ মে ২০২৩)। ইমরানের ক্যারিসমা, আপোসহীন ভাবমূর্তি, আধুনিক মন—মানসিকতা, জনপ্রিয়তা সবকিছু মিলিয়ে এবার হয়তো পাকিস্তানের রাজনীতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে বলে এই সাংবাদিক আশা করছেন। সামনের দিনগুলোতে বুঝা যাবে আসলে এই গ্রেফতার পাকিস্তানের রাজনীতিতে কোন্ ভূমিকা রাখে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবস্থা এখন খুব শোচনীয়। আইএমএফ’র কাছে ঋণ সহায়তা চেয়েছে দেশটি। অর্থনৈতিক দুরবস্থার সাথে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা যুক্ত হয়ে দেশটির ভবিষ্যৎ খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয় বলা যায়। এরকম অবস্থায় সে দেশের গণতন্ত্রকে সংহত করা তথা রাজনীতিবিদেদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য—অপ্রকাশ্য ক্ষমতা দেখানোর সুযোগকে সংকুচিত করার মধ্যেই রয়েছে সমাধানসূত্র। পাকিস্তানের সামাজিক কাঠামো থেকে সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্য খর্ব করাও আরেক প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে দেশটির জনসাধারণ মোকাবিলা করেন সে দিকে পৃথিবীর সকল দেশ ও জনগণের আগ্রহ থাকবে ব্যাপক।