‘ইহা একজন গণকর্মচারীর অফিস’

দৌলতদিয়া যৌন পল্লীর এক যৌনকর্মীর মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা ও দাফনের আয়োজন করে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দঘাট থানার তরুণ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিকুর রহমান বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি নিজ কক্ষের সামনে বড় করে লিখে রেখেছেনÑ‘ইহা একজন গণকর্মচারীর অফিস। যে কোনো প্রয়োজনে এ অফিসে ঢুকতে অনুমতির প্রয়োজন নেই। সরাসরি রুমে ঢুকুন। ওসিকে স্যার বলার প্রয়োজন নাই।’ তিনি নিছক দেখানোর জন্য এই নোটিস টানাননি। বরং নিজে অক্ষরে অক্ষরে সেটি পালন করেন। মঙ্গলবারই বিকালে কোনো একটি চ্যানেলে ওই ওসির সাক্ষাৎকার দেখলাম, সেখানে তিনি বলছেনÑ স্যার বলে সম্বোধন করলে দূরত্ব তৈরি হয়, এর চাইতে ভাই বলে ডাকলে অনেক কাছের মনে হয়। পুলিশের প্রতি মানুষের মনোভাব খুব সুখকর নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে রাজার পক্ষে জনগণকে শাসন করার জন্য যে পুলিশ বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল তাদের মানসিকতা ছিল প্রভুত্বসুলভ। বৃটিশ শাসনামলের অবসান ঘটার ৭৩ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও পুলিশের ওই মনোভাবের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে এমন কথা বলার উপায় নেই। তবে পরিমাণগতভাবে অবস্থার উন্নতি ঘটানোর সচেতন প্রয়াস পুলিশ বিভাগের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে যে তৈরি হচ্ছে বর্ণিত ওসির মনোভাব তার বড় প্রমাণ। আমরা এই তরুণ পুলিশ অফিসারকে অভিনন্দন জানাই। পুলিশ বিভাগের একটি দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির মধ্যে থেকে তিনি কতটা নিজেকে প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব হিসাবে গড়ে তুলতে পারবেন সেই প্রশ্নে না গিয়ে প্রাথমিকভাবে তার সুন্দর ইচ্ছাকে স্বাগত জানানো উচিত।
এদিকে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো: মিজানুর রহমান সোমবার একটি কমিউনিটি পুলিশিং মতবিনিময় সভায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, অপরাধ করলে কাউকে ছাড় নয়। তিনি বলছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে, এটা বাস্তবায়নে ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশ বদ্ধপরিকর। সুদূর রাজবাড়ির এক ওসির বক্তব্যের সাথে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের কথায় যে ঐক্যের সুরটি আমরা শুনতে পাই সেটি হলোÑ পুলিশ ভাল মানুষের বন্ধু, অসৎ মানুষের জন্য ভয়ংকর। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে সমাজে শান্তি বজায় রাখতে অপরাধীদের রক্তচক্ষুকে মোকাবিলা করতেই হবে। আর সেই মোকাবিলা কোনো কোমলতা দিয়ে সম্ভব নয়। এখানে অবশ্যই কঠোরতা দেখাতে হবে। আবার নির্যাতিতকে মমতা দিয়ে কাছে না টানলে তার বিচার প্রাপ্তির পথটি দূরস্থ হয়ে যায়। পুলিশ সুপারের কথায় আমরা অপরাধীদের বিরুদ্ধে সেই কঠোরতার বার্তা পাই। এই ধরনের কথা জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে পুলিশ বিভাগ এবার একটি চমৎকার শ্লোগান ধারণ করেছে। সেটি হলোÑ মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক ধাঁচের পুলিশি ব্যবস্থায় জনগণের সাথে যে দূরত্ব তৈরি ছিল সেটি দূর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিকের কাছে পুলিশকে তো পরম বান্ধবের মতই সুপ্রকাশিত হতে হবে। নতুবা পীড়িত মানুষ কোথায় গিয়ে তার আর্তি জানাবে?
তবে কথা বলার চাইতে সেটি বাস্তবায়ন করা অতিশয় কঠিন। যে সমাজ বাস্তবতা আমরা প্রত্যক্ষ করছি সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের এককভাবে চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটানো বেশ কঠিন। বিশেষত পুলিশ বিভাগকে ক্ষমতাসীন মহল থেকে শুরু করে প্রভাবশালীদের সাথে কাজ করতে হয়। যারা বড় অপরাধ করে তারা ক্ষমতা ও প্রভাবের ছত্রচ্ছায়ায় অবস্থান করে। এই ছত্রচ্ছায়ার আড়ালে থাকা অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা কঠিন কাজ বৈকি। সেই কঠিন কাজটিই করে দেখানোর অঙ্গীকার করেছেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার। তাঁর এই শুভ বোধ জয়যুক্ত হোক। নিঃসহায়ের সহায় আর দুর্জনের আতংক হোক আমাদের ভরসার পুলিশ বাহিনী।