বিশেষ প্রতিনিধি, (চাপতির পাড়ের করিমপুর ঘুরে এসে)
ঈদের আমেজ নেই সুনামগঞ্জের চাপতির হাওরের (স্থানীয়ভাবে চ্যাপটির হাওর নামে পরিচিত) ৩১ গ্রামে। বোরো ফসল নির্ভর জীবিকা এই গ্রামগুলোর বেশিরভাগ মানুষের। গেল ৬ এপ্রিল রাতে বৈশাখীর বাঁধ ভেঙে এই হাওরবাসীর সর্বনাশ ঘটেছে। গভীর রাতে হাওরে কাজ করে এসেছেন, তাদের অনেকে ভোরে গিয়ে হাওরে ডুব সমান পানি দেখেছেন এই হাওরে। হাওরপাড়ের কোন কৃষকই এক ছটাক ধানও ঘরে আনতে পারেন নি। হাজারো কৃষকের বছরের স্বপ্ন এখন একলগি (নৌকা চালানোর বাঁশ) পানির নীচে। ঈদ এসেছে এই হাওরপাড়ের মানুষের জন্য কষ্ট নিয়ে। হাওরপাড়ের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কারো ভাবনায় ঈদ আনন্দ নেই। বরঞ্চ একবছর কীভাবে খেয়ে বেঁচে থাকবেন, সেই ভাবনায় সময় কাটছে তাদের।
হাওরপাড়ের করিমপুর গ্রামের এলাজুর রহমান (৫০) ও আয়েশা আক্তার (৩৫) সামান্য পঁচা ধান (পানির নীচ থেকে আধাপাকা ধান ডুব দিয়ে তোলা) রোববার শুকানোর কাজ করছিলেন। এই ধানের চাল খাওয়া যাবে কি—না, প্রশ্ন করতেই বললেন, ‘কিচ্ছু খাইয়া বাঁচন লাগবো তো ভাই’।
আয়েশা আক্তারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ঈদ সামনে এই সময়ে এতো কষ্ট কিভাবে সামাল দেবেন আপনারা। কিছুক্ষণ কোন কথা বললেন না তিনি, কিছুক্ষণ পর চোখের কোণের পানি মুছতে মুছতে বললেন, ‘ছোট বাইচ্চাটায় (ছোট ছেলে) কইছিল, আম্মা আমারে ঈদের সময় সাইকেল দিবায়, বড় ছেলেটায় জিন্সের প্যান্ট চাইছিল, এখনতো কিচ্ছুই করতাম পারতাম নায়।’
আয়েশা আক্তারের কথা শেষ হতে না হতেই, এলাজুর রহমান এগিয়ে এসে জানালেন, তার এক কেয়ার জমিও নেই, তিনি বর্গাচাষী, গত চার বছর সামান্য জমি বর্গা করেছেন। ফসল ভালো হওয়ায় এবার সাহস করে ২০ কেয়ার জমি রংজমা নেন। রংজমার টাকার ব্যবস্থা করেছেন মহাজনি সুদের টাকা দিয়ে। শ’তে মাসে ১০ টাকা লাভ দেবার শর্তে ৩০ হাজার টাকা ছয় মাসের জন্য এনেছিলেন। ধান কাটা শেষ হলে ধান বিক্রি করে লাভের ১৮ হাজার টাকাসহ ৫৮ হাজার টাকা দেবার কথা। এখন এই টাকা ফিরিয়ে দেবার চাপ আছে, ৫ জনের সংসারের খাবার যোগানের চাপ। বললেন, ‘বৈশাখি তোলার পর বাইচ্চা—কাইচ্চার জন্য প্রতিবছরেই কিছু টাকা খরচ করি আমরা। এবার বাড়তি যোগ হয়েছিল ঈদ। ঈদে এবার কোন কিছুই করার নাই, সামান্য তেল—ময়দা কেনার টাকাই নেই। কাপড়—চোপড় কেনাতো দূরের কথা। বাচ্চাদের যেভাবে হোক বুঝাতে হবে।’
কেবল এলাজুর ও আয়েশা নয়। করিমপুরের সাকিল আহমদ ও সুজাত মিয়া একই ধরণের কষ্টের কথা জানালেন।
সাকিল আহমদ একবছর এক মাস হয় বিয়ে করেছেন। গেল বছর করোনাকালেও তিনি স্ত্রী রিনা বেগমকে নতুন কাপড় দিয়েছেন। এবার ভালো কাপড় ও জুতো কিনে দেবার ইচ্ছা ছিল, বিবিসহ (বাবার মা) পরিবারের সকলকে কাপড় কিনে দেবার আকাঙ্খা ছিল। কিন্তু সেটি আর হবে না। দুই একর জমি বর্গা করেছিলেন। সবই পানির নীচে গেছে।
বয়োজ্যেষ্ঠ নুরুল ইসলাম সর্দার বললেন, গ্রামে ৩০০ পরিবার আছে। আড়াইশ পরিবারের বোরো ধানের উপর জীবন চলে। এসব পরিবারে এবার ঈদের আনন্দ নেই। কেউ এক ছটাক ধানও গোলায় তুলে নি।
নুরুল ইসলাম সর্দার জানালেন, চ্যাপটির হাওরে ৩১ টিরও বেশি গ্রামের কৃষকের জমি রয়েছে। গ্রামগুলো হচ্ছে, কলির কাপন, বকশিপুর, মাতারগাঁও, রায়বাঙালী, একতিরপুর, বাসুরি, রাজনাও, সিংনাথ, জগদল, নারায়ণকুরি, কামরিবিজ, নূরপুর, ধীতপুর, হুসেনপুর, কান্দারগাঁও, নগদিপুর, দৌলতপুর, ধীতপুর, টানাখালি, পুকিডহর, শান্তিপুর, গোবিন্দপুর, হলিমপুর, শ্রীনারায়ণপুর, মাটিয়াপুর, কচুয়া, তাজপুর, নাসিরপুর ও টুকদিরাই গ্রামে একই ধরণের অবস্থা। বর্গাচাষীরা বেশি বিপদে। তিনি বললেন, গেল চার বছর ফসল ভালো হওয়ায় বর্গাচাষে উৎসাহ বেড়েছিল, এবার অনেকেই বর্গা নিয়ে চাষ করেছে, এরা মহাসংকটে পড়েছে।
গ্রামের কামরান চৌধুরী বললেন, ‘ধান ভালা অইলে ইবার গাওঁয়ে ধুমধামে ঈদ অইলোনে। নতুন কাপড়চোপড় খাওয়া—দাওয়া, দাওয়াত কইরা খাওয়ানি, বাইচ্চানতের নতুন কাপড়ের আনন্দ সবতাই অইলো নে, ইবার বাইচ্চানতেরে মায়ে বাপে মিথ্যা কথা কইয়া শান্ততা দিতো অইবো।’
করিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান লিটন চন্দ্র দাস বললেন, চাপতির হাওরে পাঁচ হাজার হেক্টরের মতো বোরো চাষাবাদ হয়েছে। একমুঠা ধানও কেউ গোলায় তুলতে পারে নি। জেলায় এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চাপতির হাওর। ঈদ সামনে আমি নিজেও দিশেহারা হাওরপাড়ের মানুষকে কিভাবে সহায়তা করবো। সরকারের দেওয়া ১০ কেজি করে চাল আপাতত ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়েছি। আমরা পরিষদের উদ্যোগে কি করা যায় ভাবছি। মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর কাছেও আমার নিবেদন, তিনি যেন কিছুটা হলেও ঈদের আনন্দের জন্য এই হাওরপাড়ের মানুষকে সহায়তা করেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি অফিসারের কাছ থেকে তালিকা নিয়ে যে কটি হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঈদের আগে ওই হাওরপাড়ের কৃষকদের খাদ্য ও নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। সহায়তা প্রদানে বর্গাচাষীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত. গত ২ এপ্রিল থেকে পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের নদ নদীতে পানি বেড়ে জেলার ১৫০ টি হাওরের মধ্যে ছোটবড় ১৯ হাওর ডুবেছে। সরকারি হিসাবে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ছয় হাজার হেক্টর ফসলি জমি। বেসরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। এরমধ্যে সরকারি হিসাবে চাপতির হাওরে চার হাজার ৮০০ হেক্টর জমি।


