ঈদের আমেজ নেই, হাওরপাড়ে অনেকের ঈদ কাটবে আশ্রয়কেন্দ্রে

বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্বজিৎ রায়
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে ঈদের আমেজ নেই। তিন দফা বন্যায় জনজীবন একেবারে থমকে দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের পিঠ একেবারে দেওয়ালে ঠেকে গেছে। করোনায় এবং তিন দফা বন্যায় কাজ নেই, কারো কাছে কোন টাকাও নেই। সরকারি এবং বেসরকারি কিছু সহায়তাই এখন ভরসা। ঈদের আমেজ এসব পরিবারে নেই বললেই চলে।
জেলার বেশিরভাগ জনপদে এখনও থইথই করছে বন্যার পানি। বানের এই পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে ঈদুল আযহার আনন্দ। বন্যার কারণে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসবের আমেজ অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। আনন্দের বদলে ভোগান্তির ঘোলা জলে হাবুডুবু খাচ্ছেন হাওরপাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লাখো মানুষ।
বন্যায় বিপর্যস্ত দুর্যোগ থেকে মুক্তি পেতে কর্মহীন অভুক্ত মানুষেরা এখনও ত্রাণের খোঁজে পথ চেয়ে বসে থাকে। বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়া মানুষের একটা অংশ আশ্রয়কেন্দ্র ও বড় অংশ বাড়িতে থেকেই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যই দিন পার করছেন।
বানভাসি এসব মানুষের জন্য ঈদের আনন্দ উদযাপন থেকে জীবন বাঁচানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এককথায় বন্যার পানিতে যবুথবু তাদের ঈদ আনন্দ।
জামালগঞ্জের পাগনার হাওরপাড়ের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রত্যেক গ্রামেরই বাড়িঘরে বন্যার পানি ঢেউ খেলছে। অনেক বাড়িঘর থেকে এখনও পানি সরেনি। যাদের বাড়িঘর একটু উঁচু তাদের বাড়ি থেকে কোনোরকম পানি নেমে গেলেও উঠোনে এখনো পানি। অন্যদিকে যাদের বাড়িঘরে এখনও পানি আছে, তারা কেউ কেউ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন, কেউবা এই পানির মধ্যেই দিনাতিপাত করছেন। এমন অসহনীয় বাস্তবতার মুখোমুখী উপজেলার সবচেয়ে বড় দুই হাওর হালি ও পাগনার হাওরপাড়ের প্রায় ২০ হাজার পরিবার। ফেনারবাঁক ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের জয়ধর মিয়া বলেন, ‘মনের অবস্থা খুব খারাপ। এখনও স্কুলে আছি। এই কাশিপুর স্কুলে প্রায় ২৫ টা পরিবার আছে। বাড়ি ছাইড়া এইভাবে কি ঈদ করা যায়। আর কষ্টের মধ্যে থাকলে কি কোনকিছু ভালো লাগে। বারবার পানি আইয়া আমরারে ঈদ আনন্দের বদলে মারাত্বক কষ্টের মধ্যে ফালাইয়া দিছে। এইবার আমরার ঈদ-টিদ হইত নায়।’
তিন দাফের এই বন্যায় ভালো নেই গোটা জেলাবাসীই। বন্যায় বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা। মরণঘাতী করোনার বিপর্যয় একদিকে অন্যদিকে তিন দফা বন্যায় মারাত্বক বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছেন খেটে খাওয়া নি¤œ ও নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজন। বর্তমান বন্যা বিপর্যয়ে নাকাল হয়ে পড়েছে পুরো জেলার মানুষ। করোনা ও বন্যা দুই দুর্যোগে কর্ম হারিয়ে বেশিরভাগ মানুষ এখন গৃহবন্দী।
উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতিতে এসেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার অন্যতম উৎসব ঈদুল আযহা। এ উৎসবে অনেকেই বঞ্চিত হবে ঈদ আনন্দ থেকে। উপজেলার উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর অন্যান্য বছরের ন্যায় ঈদ আনন্দ নেই।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের হারুনূর রশিদ বলেন, ‘এইবার আমরার ঈদ নাই। বন্যায় ভাসাইয়া লইয়া গেছে সব। রুজি-রোজগার নাই, বড় কষ্টের মধ্যে আছি আমরা। বাড়ি-ঘরে পানি ফেক লাইগ্যা আছে। এখন ঈদ করার মতো পরিস্থিতি নাই আমাদের।’
বেহেলী ইউনিয়নের বেহেলী আলীপুর গ্রামের মো. আলম মিয়া বলেন, ‘করোনার মেধ্যেই এসেছে বন্যা। এখনও অনেকের ঘরবাড়িতে পানি। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। দুর্ভোগ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ঈদের আনন্দ নেই বললেই চলে। এককথায় এবারের ঈদ আনন্দ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।’
সুনামগঞ্জের বৃহৎ হাট সাচনা বাজারের ভূষিমালের ব্যবসায়ী উজ্জ্বল কান্তি পাল বলেন, ‘যারা দিন আনে দিন খায় তাদের ঘরে ঈদ নেই। সামর্থবান মানুষরাই সামান্য বাজার-হাট করতাছে। তবে বেচাবিক্রি ভালো না। কারণ আমাদের এখানে নি¤œবিত্তের সংখ্যাই বেশি। তারা করোনা আর বন্যায় কাজকাম হারিয়ে বড় বিপদের মধ্যে আছে। তাই ঈদের বাজার একেবারে খারাপ।’
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত বললেন, বন্যা কবলিত মানুষকে ৫ কেজি করে চাল ও শুকনো খাবারসহ ৬ দফায় সহযোগিতা করেছি আমরা। এখন ১০ কেজি করে চাল দেব ১২ হাজার পরিবারকে। ১৫ টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো (মঙ্গলবার পর্যন্ত) বন্যার্তরা আছেন। ঈদের দিন নামাজ আদায় শেষে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে গিয়ে বন্যার্তদের সহযোগিতা করবো, কিছু সময় কাটাবো।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ২৯৯ টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো (মঙ্গলবার পর্যন্ত) ২৯৪১ টি পরিবার রয়েছেন। পানি ধীরগতিতে নামায় এরা ফিরতে পারছেন না নিজ বাড়িতে। আরও কয়েকদিন হয়তোবা আশ্রয় কেন্দ্রেই কাটাতে হবে তাদের। উপজেলা পরিষদ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে বলে দেওয়া হয়েছে ঈদ উপলক্ষে যেন বন্যার্ত মানুষ ভিজিএফ’এর চালসহ অন্যান্য সহায়তা পান।