উদ্বিগ্ন জেলার আমনচাষীরা

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে তৃতীয় দফা বন্যার আশঙ্খায় কৃষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। প্রথম দফা বন্যায় বীজতলা তৈরির সময় ডুবে একবার, দ্বিতীয় দফা বন্যায় বপন করা বীজতলা ডুবে আরেকবার। এবার তৃতীয় দফায় বীজ বপনের সময় আবার বন্যার শঙ্খায় উৎকণ্ঠায় রয়েছেন আমন চাষীরা। শ্রাবণ মাসের মধ্যে অর্থাৎ আগস্টের ২৫ তারিখের মধ্যে চারা না হলে জেলার ৮১ হাজার হেক্টর আমন জমির মধ্যে বেশির ভাগ অংশে চাষাবাদ ব্যাহত হবে বলে জানিয়েছেন আমনচাষীরা।
সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছন বাহারের কৃষক আম্বির মিয়া বললেন, ‘৭-৮ কেয়ার (২ শতক ২ কেয়ার) জমির জন্য করা জালা (বীজ) পালাইছলাম (বপন করছিলাম) পানির তলে ডুবছে। অখনো জালাচারে (বীজ বপনের জমি) আটু (হাটু) সমান পানি। আইজ
(সোমবার) শ্রাবণের ৫ তারিখ, ১০-১৫ তারিখের মধ্যে জালা না পালাইলে, ই-চারায় ধান অইতো নায়। ভাদও (ভাদ্র) মাইয়া (মাসের) জালায় ধান অয় না।’
আম্বির মিয়ার মতে, আমন ধানের বীজ আগামী ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বপন না করলে আমন চাষাবাদ এবার হবে না। জমি পতিত থাকবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের বনগাঁওয়ের আলী হুসেন কেবল আমন ধানই চাষাবাদ করেন। বন্যায় ২৮ কেয়ার (প্রায় ৯ একর) জমি চাষাবাদের জন্য করা বীজতলা ডুবেছে এই কৃষকের।
বললেন, সাহস কইরা আরেকবার বীজ ভিজাইছি, এখন আবার বন্যার আশঙ্খা। তাহলে কী করা যাবে। জমি হয়তো পতিত থাকবে। কীভাবে চলবো সারা বছর।
আম্বির মিয়া কিংবা আলী হুসেন নয় জেলার ১১ উপজেলার এক লাখ ৮০ হাজার আমনচাষীর এমন দু:সময় কড়া নাড়ছে এবার।
একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুয়ায়ী তৃতীয় দফা বন্যা হলে আমন চাষীদের চরম দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক সফর উদ্দিন বলেন, তৃতীয় দফা বন্যার আশঙ্খা রেখেই আমরা আমন চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছি। জেলায় বীজতলা তৈরি করতে হয় ৪৩৫১ হেক্টর। এই পর্যন্ত হয়েছে ২৮৪৫ হেক্টর। এরমধ্যে ডুবেছে ৫৯ হেক্টর। আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিলম্বে চাষাবাদ করা যায়, এমন ধানের বীজ রুটিন বরাদ্দের চেয়ে ৫৯ মে.টন বেশি চেয়েছি, ১৫ মে. টন ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। আশাকরছি বাকীটুকুও পাওয়া যাবে। এছাড়া কমিউনিটি বীজতলা তৈরিরও চেষ্টা রয়েছে আমাদের।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী ১০ দিনে সুনামগঞ্জের বিশ^ম্ভরপুর, তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৪৫০ মিলিমিটারের মতো বৃষ্টি হতে পারে। জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হতে পারে। আশঙ্খার কথা হচ্ছে, সুনামগঞ্জের উজানে পাহাড়ে ১৯ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। উজানে এমন ভারী বৃষ্টি হলে সুনামগঞ্জের নদ নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান জানান, আগামী ২৪ ও ২৫ জুলাইয়ে সুনামগঞ্জের পাহাড়ী নদীসহ নদ নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পাারে। নদীর পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করতেও পারে। আবহাওয়ার পূর্বাবাসে এমন তথ্যই জানানো হয়েছে তাদের। উজানে এবং সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় মেঙ্গলবার বিকাল ৩ টায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি আবার বিপদ সীমার ৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
সুনামগঞ্জে ভারী বর্ষণ এবং উজানের অর্থাৎ ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গত ২৮ জুন প্রথম দফা বন্যা হয়। দ্বিতীয় দফায় একই কারণে বন্যা হয় ১০ জুলাই। দুই দফা বন্যায় লাখো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হন।