জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের খবর আসছে। জেলার দিরাই, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার কিছু বিদ্যালয়ে এরকম অনিয়ম হয়েছে বলে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক করেছেন। তদুপরি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট পরিমাণের আর্থিক প্রণোদনা উপবৃত্তি নামে বিতরণের ব্যবস্থা সরকার চালু রেখেছেন। শিক্ষার উন্নয়নে এরকম একটি কর্মসূচী নিয়ে যদি কেউ দুর্নীতির আশ্রয় নেন তাহলে সেটি হবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক। প্রকাশিত সংবাদ থেকে দেখা যায়, অভিযোগ উঠার পর উপবৃত্তির কম দেয়া টাকা দিরাই উপজেলায় ফেরত দেয়া হয়েছে। জামালগঞ্জে কয়েকজন অভিভাবককে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। ধর্মপাশায় আসবাবপত্র কেনার জন্য টাকা কম দেয়া হচ্ছে। অভিভাবকরা সন্তান ভেদে দুই/তিন হাজার টাকা বাৎসরিক উপবৃত্তি পেয়ে থাকেন। এই সামান্য টাকার কিছু অংশ নানা নাম দিয়ে রেখে দেয়া গর্হিত অপরাধ। এতে বিভিন্ন জায়গায় অভিবাবকরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। এই অনিয়মের সাথে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, ট্যাগ অফিসার কিংবা ব্যাংক কর্মকর্তাগণের নামও আসছে। জামালগঞ্জ উপজেলায় বিদ্যালয়ের পরিবর্তে অন্য জায়গায় টাকা বিতরণের খবর পাওয়া গিয়েছে। প্রকাশিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিৎ। নতুবা শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির বিস্তার ঘটবে যা জাতি গঠনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিবে।
শিক্ষাকে জাতির মেরুদ- বলা হয়। অর্থাৎ এটি জাতির ভিত্তি। এই ভিত্তির উপরই দাঁড়িয়ে আছে পুরো দেশ। ভিত্তি দুর্বল হলে যেমন ঘর শক্ত হয় না তেমনি শিক্ষার যে কোন ধরনের বিচ্যুতি নাগরিককে অযোগ্য হিসাবে গড়ে তোলে। যে শিক্ষার্থী তার শিক্ষা জীবনের উন্মেষকালেই নিজের জীবনে দুর্নীতি ঘটতে দেখে তার মনে এটি চিরকালের জন্য গেঁথে থাকবে। বড় হয়ে সে যদি দুর্নীতি কিংবা অনৈতিকতার জালে আটকে পড়ে তাহলে শিক্ষা জীবনে তার দেখা দুর্নীতির বিষয়টিকে এর অনুঘটক ভাবতে হবে। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার দেশ ও জাতির স্বার্থে। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত উপবৃত্তির দুর্নীতি সংক্রান্ত ঘটনায় কর্তৃপক্ষের জবাবগুলো আমাদের কাছে খুবই দায়সারা মনে হয়েছে। তদুপরি বিষয়গুলো নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন এমনও মনে হয়নি। মূলত তারা নিজেদের দায় এড়াতে চাইছেন। কিন্তু এভাবে কি দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব? সরকার উপবৃত্তির টাকা বিতরণে সবধরনের দুর্নীতি প্রতিহত করতে সরাসরি ব্যাংক কর্মকর্তাগণের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে টাকা বিতরণের ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে টাকা বিতরণের বিষয়টি মনিটরিং করার জন্য ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছেন। এর বাইরে বিদ্যালয়গুলোর ম্যানেজিং কমিটির নজরদারি তো রয়েছেই। এতসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চালু থাকার পরেও যখন এ নিয়ে কথা উঠে তখন বলা যেতেই পারে যে, কোন না কোন উপায়ে বেড়া ধান খাচ্ছে।
দুর্নীতির সকল খবর সংবাদপত্রে আসে না। ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই মুখ বন্ধ রাখেন। সুতরাং সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার বাইরেও যে এ জাতীয় অনিয়ম-দুর্নীতি আরও থাকতে পারে সেটি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসতে হবে। যেসব অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তস্বাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তাদের কর্তব্য। সরকারি অনেক প্রচেষ্টা সত্বেও এখনও আমাদের বহু শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ঝরে পড়ে। বহু শিশু স্কুলে যায় না। আমাদের সকলের দায়িত্ব শতভাগ শিশুর স্কুলে যাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান এবং ঝরে পড়া রোধ করা। এটি সফল হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবতীয় স্বচ্ছতা বজায় রাখা।

