বিশেষ প্রতিনিধি
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে। এই অভিযোগ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা রয়েছে। উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ নিয়ে সম্প্রতি জেলার কোন কোন উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছেন,‘অনেক অভিভাবক না বুঝেই অভিযোগ করছেন, তবে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
জেলার জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও দিরাই উপজেলার একাধিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার একটি ইউনিয়নেই উপবৃত্তির টাকা বিতরণ হয়েছে। ঐ এলাকার কিছু অভিভাবক টাকা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, একাধিক শিক্ষক নেতা, ব্যাংকের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজসে কোথাও কোথাও উপবৃত্তির টাকা আত্মসাত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। জামালগঞ্জ উপজেলার উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামবাসী কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
দিরাই উপজেলার একাধিক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা কম দেওয়ায় গত ২৪ জুলাই রোববার স্কুলের ক্ষুব্ধ অভিভাকরা টাকা না পেয়ে বিক্ষোভ করেছেন। অনেক শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার চাপে রাতেই উপবৃত্তির টাকা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফেরত দিয়েছেন।
ধর্মপাশায় ঘুলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির বরাদ্দ থেকে টাকা রেখে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন আসবাবপত্র কেনা হবে বলে অভিভাবকদের জানিয়েছেন। এ নিয়ে বিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক অভিভাবক মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
লিখিত অভিযোগ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়–য়া ১৭৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে ১৩১ জন শিক্ষার্থীকে গত ২০ জুলাই উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আমিরুল ইসলাম ও প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের উপবৃত্তির পুরো টাকা না দিয়ে বিদ্যালয়ের চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ কেনার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে টাকা রেখেছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, অভিভাবকদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। উপবৃত্তির টাকা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হয়েছে। এতে কোনো অনিয়ম হয়নি।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আমিরুল ইসলামও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকেয়া আক্তার খাতুন বলেন, ‘যে সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষককদের বিরুদ্ধে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে সেগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যদি সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা শিক্ষকদের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।
উপজেলার বরকতনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টাকা দেয়ার সময় প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেয়ার অভিযোগ ওঠেছে। বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য আফজাল হোসেনকেও এজন্য দায়ী করেছেন শিক্ষার্থী অভিভাবক একই গ্রামের আকবর আলী। টাকা দেয়ার সময় উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে অনেকেই ফোনে বিষয়টি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
আফজাল হোসেন অবশ্য অভিযোগ সত্য নয় দাবি করে বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত বিরোধিতার কারণে বিশেষ করে কয়েকটি আনন্দ স্কুল নিয়ে কথা বলায় যারা ক্ষুব্ধ হয়েছে, তারা এসব অপপ্রচার দিচ্ছে।’
বরকতনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাজুল ইসলাম বলেন,‘টাকা নেয়ার ব্যপারে আমি কিছুই জানি না। যারা টাকা নিয়েছেন, তারাই আবার অনেকের টাকা ফেরত দিয়েছে।’
এব্যপারে উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার আবু রায়হান বলেন,‘বরকতনগর স্কুলের একজন অভিভাবক লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছি। পরে এলাকার লোকজন বসে একটা সমাধান করেছেন, যাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছিল, তাদের টাকা আবার ফেরত দেয়া হয়েছে’।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক বলেন,‘কয়েকটা স্কুলের উপবৃত্তি থেকে টাকা নেয়ার ব্যাপারে অভিযোগ পেয়েছি। এরকম যেন আর কোন দিন না হয় সেজন্য সতর্কও করে দিয়েছি। এছাড়াও যাদের টাকা নেয়া হয়েছে তাদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য সময় বেধে দেয়া হয়েছে’।
জগন্নাথপুর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উপবৃত্তির টাকা বিতরণের অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। উপবৃত্তির টাকার জন্য শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, উপবৃত্তির জন্য এবার উপজেলার ১৩৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই কোটি ১৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ আসে। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরকে উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে ঐ টাকা বিতরণ করার কথা থাকলেও অভিভাবকরা জানিয়েছেন টাকা বিতরণে শিক্ষকরা স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন।
উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের নাদামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমেন্দ্র কুমার গোপ কে উপবৃত্তির টাকা নয়ছয় করা নিয়ে নাদামপুর গ্রামের কবির মিয়া সম্প্রতি লাঞ্ছিত করেছেন। এ ঘটনার পরে প্রধান শিক্ষক জগন্নাথপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরির্দশন করে। পরে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধান করা হয়।
অপরদিকে কলকলিয়া ইউনিয়নের বালিকান্দি নতুনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৮ জুলাই উপবৃত্তি টাকা বিতরণ শুরু হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা. রিনা বেগম তার স্বামী আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী আবু তাহের কে নিয়ে টাকা বিতরণ করেন। কিছু টাকা বিতরণ করার পর তিনি বিতরণ বন্ধ করে দেওয়ায় অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
বালিকান্দি গ্রামের অভিভাবক কাইয়ুম মিয়া ও রহিম আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক প্রায় দেড় লাখ টাকা বিতরণ না করে নিজের কাছে রেখে দেন। পরে আমরা অভিভাবকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠলে ২১ জুলাই তিনি আবার টাকা বিতরণ করেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘উপস্থিতির হারের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপবৃত্তির টাকা বিতরণ করা হয়। অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
তাহিরপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা কম দেয়ার প্রতিবাদে ইউএনও বরাবরে অভিযোগ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। ২৩ জুলাই বড়দল উত্তর ইউনিয়নের কুকুরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৬৫ শিক্ষার্থীর অভিভাবকগণ বিক্ষোভ মিছিল সহকারে ইউএনও বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইকবাল হোসেন গত ২২ জুলাই শুক্রবার ছাত্র ছাত্রীেেদর উপবৃত্তির টাকা বিতরণকালে শিক্ষার্থীদের ৮শ থেকে ১২শ টাকা দেয়ার বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তিনি শিক্ষার্থীদের জনপ্রতি ৩শ থেকে ৪শ টাকা বিতরণ করে ২৬৫ শিক্ষার্থীর বিতরণ কার্যক্রম শেষ করেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে কুকুরকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘সরকারের পরিপত্র অনুযায়ী আমি টাকা বিতরণ করেছি’।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কারণে উপবৃত্তি বিতরণ করা হয়নি। কেবল মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে উপবৃত্তি বিতরণ করা হয়েছে।
ঐ ইউনিয়নের জেকেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকার বেতগঞ্জের অভিভাবক আসমা বেগমের ছেলে আব্দুল ওয়াহিদ ও তার ভাইয়ের মেয়ে তাহ্মিনা উপবৃত্তি পায়নি। তিনি জানালেন, তাদের গ্রামের আরো ৪-৫ জন উপবৃত্তি পায়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শক্তি রানী তরাত বলেন,‘উপবৃত্তি দেবার কিছু নিয়ম রয়েছে, যারা পাননি তারা উপবৃত্তি পাওয়ার যোগ্য নয়, এজন্য পাননি, অনিয়ম হয়নি কোথাও, উপবৃত্তি পেতে হলে শিক্ষার্থীদের কী কী করতে হয় সেটি আমরা বুঝিয়ে দিয়েছি, তাও অনেকে বুঝতে চান না’।
সুনামগঞ্জের শিক্ষাবিদ আব্দুর রহিম বলেন,‘উপবৃত্তিতে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না, বরঞ্চ আরো কিছু টাকা লুটপাট হচ্ছে, উপবৃত্তি বন্ধ করে ফলাফলের পর বৃত্তি দিলে ভাল হতো’।
মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘উপবৃত্তির ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে, এটি ন্যায়নিষ্টভাবে বিতরণ করতে হবে, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে এবং অভিভাবকদের ও শিক্ষার্থীদের বুঝাতে হবে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে এবং ফলাফল খারাপ করলে উপবৃত্তির টাকা দেওয়া যায় না’।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হযরত আলী বলেন,‘উপবৃত্তি পেতে হলে ১০০ দিনের মধ্যে ৮৫ দিন উপস্থিত হতে হবে, বছরের ৩ টি পরীক্ষার সব কয়টিতেই উত্তীর্ণ হবে, প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে ৩ মাস উপবৃত্তি পাবে না। পরের সাময়িক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর উপবৃত্তি শুরু হবে, আবার বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে ৬ মাস উপবৃত্তি দেওয়া হয় না, শিক্ষার্থীর কার্ডে যা উল্লেখ থাকে এর বাইরে কিছুই করতে পারবে না সংশ্লিষ্ট কেউ, তবে উপবৃত্তি বিতরণে অনিয়মের কোন অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।


