উপাচার্য নিয়োগ ছাড়া দুই বছরে কিছুই হয়নি

বিশেষ প্রতিনিধি
উপাচার্য নিয়োগ হলেও জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে গতি ফিরছে না। উপাচার্য এখনো (বৃহস্পতিবার পর্যন্ত) তার রাজধানী ঢাকার নিজ বাসভবন থেকেই অফিস করছেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে জমির বিষয় নিয়ে রাজধানীতে সংশ্লিষ্টদের বৈঠক হতে পারে।
২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। এরপর জমি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দেওয়ায় দেড় বছর এর কাজে কোন অগ্রগতিই ছিল না। ১৫ জুন ২০২২ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিয়োগ পান অধ্যাপক মো. আবু নঈম শেখ। অধ্যাপক মো. আবু নঈম শেখ গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) গণিত বিভাগের প্রধান ছিলেন। নিয়োগের দিন থেকে তাঁর মেয়াদ চার বছর। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জায়গার (স্থান নির্ধারণের) বিষয়টি নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত না হওয়ায় উপাচার্য সুনামগঞ্জে অফিস নিতে পারছেন না, আবার রাজধানীতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অফিস নেই।
২০২০ সালের সাত নভেম্বর সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত বিল সংসদে উপস্থাপন হয় । শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় বিশ্ববিদ্যালয়টি শান্তিগঞ্জে (দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) এলাকায় স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জায়গা নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দেয়। এরপর আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান হিসেবে সুনামগঞ্জের ‘দেখার হাওরের পাড়ে’র কথা উল্লেখ করা হয়। হাওরটি জেলা সদর, শান্তিগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। বিশাল এই হাওরের কোথায় বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে, সেটি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)’এর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কোন বাজেট এখনো আসে নি। উপাচার্যের অফিস, গাড়ী কিছুই হয় নি।
বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবু নঈম শেখ এই প্রসঙ্গে জানালেন, তিনি রাজধানী ঢাকার বাসভবনে থেকেই কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি না পেলে কাজ এগুনো যাচ্ছে না। জমি নির্ধারণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। খুব কম সময়ের মধ্যেই এই বিষয়ে বৈঠক হবে আশা করছেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণে কোন অগ্রগতি নেই। সুনামগঞ্জের সকল মাননীয় সংসদ সদস্যগণকে নিয়ে বৈঠকে বসার চেষ্টা করছি আমরা।
প্রসঙ্গত. ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর সুনামগঞ্জবাসীর পক্ষে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সুনামগঞ্জে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি তুলেন। সভায় উপস্থিত ওই সময়ের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এতে সমর্থন জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সম্মতি প্রকাশ করেন। পরে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী একটি বেসরকারি চাহিদাপত্র (ডিও লেটার) দেন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে। ডিও লেটারে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষাখাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সারা দেশে নতুন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের একটি পশ্চাৎপদ এলাকা। শিক্ষায় তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। পিছিয়ে থাকা সুনামগঞ্জ জেলার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরি।
পরে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন প্রস্তুত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ডেপুটি ডিরেক্টর মৌলি আজাদের নেতৃত্বে কমিটি করে দেয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে এই খসড়া আইন প্রস্তুত হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সৈয়দ আলী রেজা এই খসড়া আইনটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। যেহেতু এটি একটি স্বতন্ত্র আইন। অন্য কোন মন্ত্রণালয়ের বা অন্য কোন আইনের ধারা উপধারা অনুচ্ছেদ বা উপ-অনুচ্ছেদের বক্তব্য বা মতামতের সাংঘর্ষিকতা আছে কী-না, তা যাচাই-বাছাই করার জন্যই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এই খসড়া আইন পাঠানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অভিমত নেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ ভাষা কোর্স (বাভাকো)’ থেকে এ আইনের প্রণিত শব্দ চয়নের ব্যাপারে সুপারিশ নেওয়া হয়। সুপারিশের প্রেক্ষিতে আইনটি’র শব্দ’র পরিবর্তন-পরিমার্জন করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে পাঠালে ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর মন্ত্রী পরিষদের সভায় আইনের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন লাভ করে।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের খসড়া মন্ত্রী পরিষদে অনুমোদনের আনন্দে ভাসে সুনামগঞ্জবাসী। সুনামগঞ্জবাসীর বহুদিনের দাবি বাস্তবায়নের স্বপ্নযাত্রা শুরু হওয়ায় ২০২০ সালের পাঁচ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ স্টেডিয়াম মাঠে বিশাল আনন্দ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি, সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা, সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহ্রিয়ার, জেলা পরিষদ প্রশাসক নুরুল হুদা মুকুট, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খায়রুল হুদা চপল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই আনন্দ সমাবেশে যোগদান করে।
২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। এই আইন পাসের সময়ই বিশ^বিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি নির্ধারণ নিয়ে আপত্তি তুলেন। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান ‘দেখার হাওরে’ লিখে আইন পাস হয়। কিন্তু বিশাল দেখার হাওরের কোথায় বিশ্ববিদ্যালয় হবে সেটি উল্লেখ না করায় এই জটিলতা রয়েই যায়।