উৎকণ্ঠা নিয়ে ধান কাটতে নেমেছেন লাখো শ্রমিক

বিশেষ প্রতিনিধি
করোনা ও অকাল বন্যার শঙ্খা নিয়েই হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটা মাড়াই শুরু হয়েছে। এবার ধান কাটতে কৃষক, কৃষি শ্রমিকের পাশাপাশি হাজারো শিক্ষার্থী নেমেছেন ধান কাটতে। সকল ভয়কে কাটিয়ে পাকা ধান ঘরে আনার যুদ্ধে নেমেছেন লাখো মানুষ। জেলার কিছু কিছু হাওরে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের উৎসাহ যোগাচ্ছেন।
জেলার দিরাই উপজেলার কালিকোঠা হাওরপাড়ের রাজাপুর গ্রামের বড় গৃহস্থ আব্দুস ছাত্তার জানালেন, জমি আছে ৬০ একরের মতো। কিছু জমি নিজে করেছেন, বেশিরভাগই বর্গা দিয়েছেন। মঙ্গলবার থেকে ধান কাটা শুরু করেছেন। জেলার বিশ^ম্ভরপুরের চিনাকান্দি এলাকা থেকে আসা শতাধিক কৃষি শ্রমিক রাজাপুর এবং পাশের গ্রাম চন্দ্রপুর, ধনপুর ও সন্তোষপুর গ্রামের কৃষকদের ধান কেটে দিচ্ছেন। অন্যান্য বছর কৃষি শ্রমিকরা গৃহস্থের বাড়িতেই থাকতেন। এবার করোনার ভয়ে গ্রামের পাশেই শ্রমিকরা থাকার জন্য প্যাÐেল করা হয়েছে।
আব্দুস সাত্তার বললেন, ‘হাজার হাজার মাইনষে ধান কাটের। ব্যাপারী পার না ইকথা কেউ কইছে না।’
করচার হাওরপাড়ের রাজাপুর গ্রামের বড় গৃহস্থ কফিল উদ্দিন অবশ্য জানিয়েছেন, ধান কাটা শ্রমিকের সংকট রয়েছে তাদের এলাকায়। অনেকে করোনা ভয়ে আসছেনা ধান কাটতে।
তিনি জানালেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর কুমার বিশ^াস মঙ্গলবার হাওরে এসে সকলকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। সাবান ও গামছা হাতে তুলে নিয়ে নিরাপদ দুরত্বে থেকে কাজ করার কথাও বলে গেছেন।
জামালগঞ্জের পাগনার হাওরপাড়ের ফেনারবাকের কৃষক রফিক মিয়া জানালেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার মঙ্গলবার হাওরে গিয়ে অনেক ধান কাটা শ্রমিককে উৎসাহিত করেছেন। সাবান, গামছাও বিতরণ করেছেন।
কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য মোতাবেক সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার হাওরে এবার বোরো চাষাবাদ হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ লাখ টন।
হাওরাঞ্চলের একাধিক কৃষকদের দেওয়া তথ্য মোতাবেক এক হেক্টর বোরো জমির ধান একদিনে কাটতে ১৫ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। সেই হিসাবে ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির ধান একদিনে কাটতে শ্রমিক লাগবে ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭৫০ জন। বোরো ধান কাটার সময়কাল ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি পাওয়া যায় না। ২০ দিনে সুনামগঞ্জের উৎপাদিত ধান কাটতে প্রতিদিন শ্রমিক লাগবে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৮৭ জন।


জেলার শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী জানালেন, আমরা আশা করছি শ্রমিকের সংকট থাকবে না। এই উপজেলায় ৪ জনের মধ্যে ৩ জন কৃষকই নিজে ধান কাটে। উপজেলায় কৃষক আছেন ২৪ হাজার ৬০০ জন। এরমধ্যে ১৮ থেকে ১৯ হাজার কৃষক ধান কাটতে নেমেছেন। ৬ টি বাল্কহেডে নেত্রকোণা, ময়ময়সিংহের কিছু এলাকা থেকে শ্রমিক এসেছেন। শ্রমিকদের আরও ২৫-৩০ টি ট্রলার পথে আছে। গার্মেন্টস শ্রমিক এবং শিক্ষার্থীরাও ধান কাটতে নেমে গেছে। এই অবস্থায় ধান কাটা শ্রমিকের সংকট হবে বলে মনে করছি না আমরা। ভয় হচ্ছে বৃষ্টিপাতের এবং অকাল বন্যার। এবার ২০ দিন সময় পাওয়া যায় কী না, সেই দুশ্চিন্তা রয়েছে সকলের মাঝে।
করোনা সতর্কিকরণের বিষয়ে এই জনপ্রতিনিধি জানালেন, তাদের উপজেলায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাড়ি ফেরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের স্কুলে-মাদ্রসায় কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। একারণে ধান কাটা শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে নদীরপাড়ে তাবু করে। তাবু তৈরি করার ত্রিপাল অনেক শ্রমিকরা নিজেও নিয়ে এসেছে, আবার উপজেলা পরিষদ থেকেও ত্রিপাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দীপজয় গোপ বললেন, নবম-দশম শ্রেণি থেকে শুরু করে ডিগ্রি পড়–য়া শিক্ষার্থী মিলে এই উপজেলায় একাধিক গ্রæপ তৈরি হয়েছে। যারা ধান কাটার কাজে নেমেছে। খোঁজে খোঁজে যেসব কৃষক শ্রমিক সংকটে ভোগছে, তাদের ধান কেটে দিচ্ছে এরা অপেক্ষাকৃত কম পারিশ্রমিকও নিচ্ছে তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক সফর উদ্দিন জানালেন, কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প থেকে জানানো হয়েছে ১৭ এপ্রিল থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ২২০ মিলিটার বৃষ্টিপাত হবার কথা রয়েছে। এই অবস্থায় হাওরের জমিতে ৮০ ভাগ ধান হলেই কেটে আনতে হবে।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা এবং সিলেটের জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর থেকে ধান কাটা শ্রমিক গত বছর এসছিলেন। এবারও এসব জেলা থেকে শ্রমিক আনতে যোগাযোগ করা হয়েছে। স্ব স্ব উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার কাছ থেকে সনদ নিয়ে ইতিমধ্যে ৩২০০ শ্রমিক এসেছে। আরও ১২ হাজার ২৯৪ জন শ্রমিক আসবে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড’এর দায়িত্বশীলরা জানান, ২০১৭ সালে হাওর ডুবা শুরু হয়েছিল ২৯ মার্চ থেকে, ২০১৮ তে ৭ মে এবং ২০১৯’এ হাওরে পানি এসেছিল ২ মে থেকে। এসব বিবেচনায় নিয়ে ধান কাটা শেষ করতে হবে।
সিলেট আবহাওয়া বিভাগের আবহাওয়াবিদ আবু সাঈদ চৌধুরী জানালেন, মার্চ মাসে সুনামগঞ্জে ১৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হবার কথা ছিল। হয়েছে ২২ মিলিমিটার। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অন্যান্য বছর কমপক্ষে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, এখনো পর্যন্ত এই পরিমাণ বৃষ্টি হয় নি। শুস্ক আবহাওয়া বিরাজমান। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ঝড়-বৃষ্টি অকাল বন্যার শঙ্খা রয়েছে। এজন্য দ্রæত ধান কাটতে হবে। ধানে ৮০ ভাগ চাল হলেই জমি থেকে ধান কেটে আনতে হবে।