এলজিইডি ‘হাওর এলাকায় উড়াল সড়ক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন’ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার হাওরাঞ্চলকে ঘিরে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সড়কের গতিপথ (এলাইনম্যান্ট) নির্ধারণের কাজ শেষ হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে ৯৭ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার অল সিজন উপজেলা সড়ক সড়ক, ২০ দশমিক ২৭ কিলোমিটার অল সিজন ইউনিয়ন সড়ক, ১৬ দশমিক ৫৩ কিলোমিটার সাবমার্জিবল উপজেলা সড়ক, ২২ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার সাবমার্জিবল ইউনিয়ন সড়ক, ১০ দশমিক ৮১ কিলোমিটার উড়াল সড়ক (এলিভেটেড), ৫৭টি সেতু ও ১১৮টি কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। বর্ষায় নৌকা ও হেমন্তে হাঁটা ছাড়া হাওরাঞ্চলে একসময় বিকল্প কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলো না। ধারাবাহিক উন্নয়নকর্মের হাত ধরে এখন হাওরের জনপদগুলোতেও লেগেছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ছোঁয়া। অধিকাংশ উপজেলা সদরেই এখন সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারাক্রমে আলোচ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের পর দুর্গম হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুতরাং হাওরবাসী এই প্রকল্পটিকে আপাতত তাদের জন্য আশীর্বাদ হিসাবেই মনে করছেন।
হাওরাঞ্চল একটি ব্যতিক্রমী ভৌগোলিক অঞ্চল। বিশাল হাওরের জমিতে প্রধানত বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো ধান উৎপাদন করা যায়। এই ফসল উঠানোর আগে-পরে হাওরগুলো জলমগ্ন থাকে। হাওরের ভিতর রয়েছে অসংখ্য বিল যা মিঠা পানির মাছের প্রধান উৎস। হাওরের ফসল চাষ এখনও মূলত প্রকৃতি নির্ভর। অকাল বন্যা, পাহাড়ি ঢল, শিলাবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এমনসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েক বছর পরপরই হাওরের ধান বিনষ্ট হয়। সরকারিভাবে হাওরের ফসল রক্ষায় শত শত কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ নির্মাণ করলেও মাঝারী মানের অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢল মোকাবিলায় কখনও এসব বাঁধ কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি। ফলে বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারি টাকা খরচের বিষয়টি একটি বড় ধাঁধা হয়েই রয়ে গেছে হাওরবাসীর নিকট। অকাল বন্যা থেকে হাওরকে রক্ষার জন্য একটি কার্যকর স্থায়ী পদ্ধতির উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসা হলেও এরকম কোনো কাজ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। এছাড়া হাওরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোসহ মিঠাপানির মাছের উৎপাদন বাড়াতেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। এর উপর হাওরে যেসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে তা হাওরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট ও চরিত্র নষ্ট করে দিচ্ছে অনেকক্ষেত্রে। এরকম পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নকালে হাওরের বৈশিষ্ট বিবেচনায় রাখা উচিৎ। আলোচ্য প্রকল্প সম্পর্কে দায়িত্বশীল মহল অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, প্রকল্পের কারণে হাওরের পরিবেশ বিনষ্ট হবে না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও হাওরের চরিত্র বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই আশা করা যায়, হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নকল্পে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত হাওরবাসীর দুঃখের কোনো কারণ হয়ে উঠবে না। আমাদের অনুরোধ হলোÑ এই কাজে ধারাবাহিকভাবে হাওর ও পানি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত এবং হাওরের জন্য ক্ষতিকর কোনো বিষয় থাকলে তা সংশোধন করা হোক।
২০২৫ সনের জুন মাসের মধ্যে হাওরের এই বড় যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা আশা করব নির্ধারিত এই মেয়াদের মধ্যেই কাজটি শেষ করা সম্ভব হবে। চলতি সংস্কৃতি মতে যেন কোনোভাবেই এর মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়ানোর অপচর্চা করে টাকার অপচয় না করা হয়। আমরা আবারও স্মরণ করিয়ে দেই, হাওরের পরিবেশ, প্রতিবেশ, জলবায়ু, প্রাণবৈচিত্র সর্বোপরি উৎপাদনব্যবস্থার ক্ষতিকারক উপাদান সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। উন্নয়নের অর্থ হলোÑ আরও ভালোর দিকে ধাবিত হওয়া। হাওরবাসীর ভালোর অধিকাংশই হাওরকেন্দ্রিক। সুতরাং অন্যসব উন্নয়নের সাথে অবশ্যই এবং আবশ্যকীয়ভাবে হাওরকে ভালো রাখতে হবে।
- গুলিতে মৃত্যু/ ৮দিন পর সন্দেহজনক ১ জন গ্রেপ্তার
- হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা/ হাওরে ৭৫ কোটি টাকা সাশ্রয়


