সুশোভন মিত্র
‘নন্দিত নরকে’র হুমায়ুন আহমেদ তার ‘অয়োময়’ টিভি সিরিয়ালের লাঠিয়াল সর্দারের মুখে শুনিয়েছিলেন ‘আসমান ভাইঙ্গা জ্যোৎস্না পড়ে/আমার ঘরে জ্যোৎস্না কই/আমার ঘরে একহাঁটু জল পানিতে থই থই…’ কথাগুলো আজ এই সুনামগঞ্জ শহরের জন্য বড় বেশী সত্যি। কারণ যাকে দেখে এই শহরে জ্যোৎস্না আছড়ে পড়ত অপার সৌন্দর্য নিয়ে, সুরমা’র বুক রূপালী চাঁদের প্রতিফলনে জানান দিত আকাশে চাঁদ উঠেছে; শুরু হয়েছে শুক্লপক্ষ সেই পৌরপিতা মমিনুল মউজদিন আর আমাদের মাঝে নেই।
তিনি জ্যোৎস্নাকে বেশী ভালোবাসতেন বলেই কি তার সাথে আমার প্রথম ও শেষ কথা হয় এক জ্যোৎস্না রাতে? এই প্রশ্নটি আমার মনে বারবার এখন জাগে। কেননা এই শহরে কর্মের সুবাদে যখন বদলি হয়ে আসি তখন আমার অতি ঘনিষ্ঠ শুভানুধ্যায়ী কয়েকজন বলেছিলেন, সুনামগঞ্জে ‘সব সমস্যার সমাধান’ সকলের প্রিয় তিনবারের পৌর চেয়ারম্যান মমিনুল মউজদীন আছেন, বিপদ আপদে তার কাছে যেও। আমি নিজে বরাবর বাড়ীতে থেকেছি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় (জুলাই ১৯৯২-এপ্রিল ১৯৯৭) কেটেছে বাড়ীতে; অধ্যাপক পিতার ছায়ায়। যে কারণে নতুন কোন স্থানে যেতে হলে আগে থেকেই খোঁজ করি সেখানকার পরিচিতজনদের। এক যুগের বেশী সময় সাংবাদিকতা করার কারণে পরিচিতজন পেতে সমস্যা হয় না। যেমন দিনাজপুরে চাকরিকালীন সময়ে প্রথম দিনেই খুঁজে বের করেছিলাম ‘সংবাদ’-এর জেলা প্রতিনিধি চিত্ত দা’কে। তার সুবাদে প্রেসক্লাব-কেন্দ্রিক সুধী সমাজের ছায়ায় দিনাজপুরে কাটিয়েছি নিজের বাড়ীর মতই। তেমনি এখানে আসার আগে আমার পোষ্টিং হওয়ার কথা ছিল সিলেট বা মৌলভীবাজারে। কিন্তু সুনামগঞ্জের অন্ন-জল আমাকে যখন বলল তাদের ওপর আমার কিছুটা অধিকার আছে তখন স্বাভাবিকভাবেই সুনামগঞ্জে পরিচিতজন খুঁজি। এর মাঝে একদিন ফোনে কথা হয় সুলতান মনসুরের (সাবেক ডাকসু ভিপি ও সাবেক সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর) সাথে। তার সাথেও আমার সম্পর্ক ঐ সাংবাদিকতার সুবাদে। ১৯৯৮ শেষ থেকে ১৯৯৯ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত একটি স্বল্পায়ু জাতীয় দৈনিকের ষ্টাফ রিপোর্টার হিসাবে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় সংসদ কাভার করার দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সেই সম্পর্ক একটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল সুলতান ভাইয়ের স্বভাবসুলভ আন্তরিকতার ছোঁয়ায়। সুলতান ভাই বললেন, মমিনুল মউজদীনের ছোট বোনের সাথে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ। বলেছিলেন, সুনামগঞ্জে জয়েন করেই যাতে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে কথা বলি। আমার নিকটাত্মীয় কাকা নেত্রকোনা জেলার এক সময়ের ডাকসাইটে জাসদ নেতা নির্মল দাস বলেছিলেন, ‘পৌর চেয়ারম্যান আমার শিষ্য, গিয়েই দেখা করবি।’ আমার এই কাকা’র বোন অর্থাৎ আমার পিসিমা এবং নির্মল বাবুর স্ত্রীর বড় বোনও পরিণয় সূত্রে সুনামগঞ্জে। নির্মল বাবু তাদের বিষয়ে জোর দিয়ে কিছু বলেননি, ভরসা রেখেছিলেন তার শিষ্য মউজদীনের ওপর।
সুনামগঞ্জে যোগ দিয়ে পৌর পিতার মুঠোফোনের নম্বরটি জোগাড় করতে পেরেছিলাম ঠিকই কিন্তু তার মোবাইলে কয়েকদিন রিং করে ব্যর্থ হয়েছি। বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা আগে থেকে নির্ধারণ করে রেখেছিলেন চন্দ্রালোকেই কথা হবে তার সাথে।
হয়েছিলও তাই। কথা হওয়ার আগে তাকে দেখেছি প্রশাসনিক বিভিন্ন মিটিংয়ে (বাংলায় সভা বললে প্রশাসনিক বা অফিসিয়াল আমেজ আসে না)। দেখে মনে হয়েছে এত অল্প বয়সের পৌর চেয়ারম্যান! মৃত্যুর পর জেনেছি বয়স ৫২। ১৫ বছর ধরে পৌরপিতা! মানে পৌরপিতা হয়েছেন ৩০-এর কোটায়। পিতৃত্বের জন্য বয়সটা কম হলেও পৌরসভার মত বিশাল সংসারটিকে সামলে রেখেছেন অসাধারণ দক্ষতায়। তার অভিভাবকত্বে কোন পক্ষপাতিত্ব ছিল না বলেই জীবদ্দশায় তার স্থান কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। আর ‘বেসামাল বয়সে’ যে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তা অবশ্যই ঈর্ষণীয়। নৈতিক ও চারিত্রিক অসম্ভব এই অর্জনের অধিকারী তিনি কিভাবে হয়েছিলেন তা তার সমসাময়িকরাই বলতে পারবেন। এই সময়ে যেখানে সৎ মানুষের অভাব বড় বেশী তখন কিভাবে তিনি যাবতীয় লোভ থেকে নিজেকে দূরে রেখে সকলের সাথে মিশেছেন তা অবশ্যই কৌতুহলের। তার মত মানুষের জন্যই বোধ হয় বলা যায়Ñউত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে…
চন্দ্রালোকিত এই মানুষটির সাথে জ্যোৎস্নালোকিত রাতে প্রথম ও শেষ দেখার স্মৃতি বলতে গিয়ে অনেক বেশী বলা হয়ে গেছে। যাহোক, আমার চাকরির চারিত্রিক কারণে আড্ডা পেটানো সম্ভব না হলেও দীর্ঘ একযুগের বেশী সময়ের সাংবাদিকতা আমাকে আড্ডাবাজ বানিয়েছিল। আমার পূর্বতন কর্মস্থলে আমার এ রোগটি সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও এখানকার সকল সাংবাদিক কেমন করে যেন আমাকে খোলস থেকে বের করে এনেছেন। এদের টানে সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীর ঘরে না গিয়ে চলে যেত জালালাবাদ বেকারী কিংবা পিকক বেকারীর সামনে। ‘পিকক’-এর সামনে লক্ষী পূর্ণিমার পরদিন দেখা এবং কথা দুটোই হয় মউজদীন সাহেবের সাথে। কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল তিনি ‘মউজ’ করে চন্দ্রে ‘মজে’ আছেন। পঙ্কজ, খলিল, শাকির ছিল সাথে। আমিও বেরিয়ে ছিলাম জ্যোৎস্না খাওয়ার জন্য (হুমায়ুন আহমেদের ভাষায়)। তার সাথে দেখা হওয়ার পর বলি সুলতান ভাইর কথা, বলি আমার কাকাবাবুর কথা। আমার মোবাইল ফোন থেকে কথাও বলিয়ে দেই গুরু-শিষ্যের। স্বাভাবিক ভাবেই প্রসঙ্গ যায় চাঁদে। তিনি বলেন, লক্ষী পূর্ণিমার রাতে বিদ্যুৎ বিভাগকে বলে লোডশেডিং করিয়ে জ্যোৎস্না দেখেছেন রাতভর। আমি তাকে অনুরোধ করি, আজ রাতেও বন্ধ করা হোক কৃত্রিম আলো। বিধাতার রূপালী আলোয় তাকে নিয়ে দেখি এই শহর। তিনি বলেন শহরে এটা অসম্ভব। কিছু ঘটে গেলে জবাব দেবে কে? দেওয়ান মউজদীন সে রাতে ‘দেওয়ানা’ না হয়ে জবাব দেন দায়িত্বের। দায়িত্ববোধ আর সৌন্দর্যবোধের এক সমন্বয় দেখি তার মাঝে। অনেক রাতে ফেরার সময় পঙ্কজ বলে, দাদা লক্ষ্য করলেন খলিল কেটে পড়েছে আরো আগে। আপনার সুবাদে আমরাও ছুটতে পেরেছি। না হলে আজ সারারাত জ্যোৎস্নার সৌন্দর্য হয়ত দেখতাম কিন্তু বাসায় ফিরে, ভোরের আলোয় দেখতাম অমাবস্যার অমানিশা (বৌ সম্পর্কে পঙ্কজের সরল স্বীকারোক্তি।)
সেই প্রথম, সেই শেষ। ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’-তখন আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অঘটনের সংবাদ আমাকে প্রথম দেয় পিংকু। মুঠোফোনে জানতে চায় সঠিক খবর। আমি তখন দুপুরের খাবারের টেবিলে। স্তম্ভিত হয়ে রিং করি সুলতান ভাইকে। তার ছোট্ট জবাব ‘সব জানি।’ ও প্রান্ত থেকে কেটে যায় লাইন। যা বোঝার বুঝে নিই। পরেরবার পিংকুকে জানাই। ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’-এর আঘাতে দক্ষিণবঙ্গ লন্ডভন্ড হওয়ার আগে লন্ডভন্ড হয় সুনামগঞ্জ। কে জানত সাগর থেকে অনেক দূরের এই সুনামগঞ্জে আগাম কোন ঘোষণা বা সংকেত ছাড়াই আসবে এই ঝড়।
যে রাতে দেখা হলো তার ঠিক পরের প্রাকৃতিক চক্রে যখন আবার জ্যোৎস্না এলো তখন তার জন্য শোক পালন করছে পুরো সুনামগঞ্জ। আমিও বেরিয়েছিলাম পূর্ণিমার পরের রাতে। বেরিয়ে একটি কালো ব্যানারে লেখা দেখলাম,‘পৃথিবীর সকল জ্যোৎস্না আছড়ে পড়ে এই শহরে তোমার জন্য।’ আরেকটি ব্যানারে দেখলাম ‘এ শহর ছেড়ে তুমি পালাবে কোথায়?’ লেখা দুটো দেখে আকাশে তাকাই। আকাশ নীল ছিল ঠিকই, কিন্তু জ্যোৎস্নাটা মনে হয়েছে অনেক ম্লান। মনে হলো জ্যোৎস্নার সেই আভা নেই, সে আর গত জ্যোৎস্নার মত টানছেনা। তাহলে কি চাঁদ তার আলো দেখাতে এই শহরে যাকে খুঁজত, যাকে দেখতে না পেলে বা নিজের রূপ দেখাতে না পারলে মনে করত বৃথাই তার সাজগোজ তাকে না পেয়ে গোমড়ামুখো হয়ে গেছে? নাকি প্রিয় সখাকে তার একান্ত কাছে অনেক দিন পর পেয়ে ইচ্ছেমতো আলো দিচ্ছে, পৃথিবীর মানুষকে আর আলো দিয়ে কি হবে এই ভেবে ইচ্ছে করে আভা কম দিচ্ছে? বিধাতার অনেক রহস্যের মতো এটিও অজানা।
শেষে বলি তিনি হয়তো চাঁদের দেশে জ্যোৎস্না ভোগ করছেন কিন্তু সেই যে বলেছিলেন ‘এ শহর ছেড়ে পালাব কোথায়?’ কাউকে আগাম কোন নোটিশ না দিয়ে আপনার এই পলায়নের মাঝে তো আমরা আগের মউজদীনকে পাই না। আপনার তো এ রকম করার কথা না। বড় অসময়ে সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন আপনি। চাঁদের দেশে স্বার্থপরের মতো একা আপনি জ্যোৎস্না ভোগ করছেন বলেই হয়তো এই শহরে জ্যোৎস্নার আলো বড় বেশী ঝাপসা। কারণ চাঁদের তো আর আলো জ্বেলে আপনাকে খোঁজার তাড়া নেই। আপনি তো আছেন চাঁদের দেশে। ভালো থাকুন আপনি। আর এই পৌরবাসীর ঘরে যদি একহাঁটু জল থইথই করে তখন একটু আলো দেবেন তাদের। বরাবরের মতো কাছে থেকে না হলেও অন্তত: কিছু আলোয় দূর থেকে আলোকিত রাখবেন আপনার শহর। পৌরবাসী যাতে আলোবিহীন না হয় সেই চিন্তা করার দায়িত্ব তো আপনারই। (সুনামগঞ্জ, ২৬. ১১.২০০৭)


