ছাতক উপজেলা যুবলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান চৌধুরী নিজ পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরে যাওয়ার ঘটনা একেবারেই দুর্নিরীক্ষ্য। এরকম অবস্থায় সাইফুর রহমান চৌধুরীর পদত্যাগের ঘোষণাকে একটি ব্যতিক্রমি ঘটনাই বলতে হয়। তবে সবচাইতে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো তিনি নিজের পদত্যাগের সমর্থনে যেসব কারণ তুলে ধরেছেন সেগুলো। এই ধরনের বক্তব্যও আজকাল সচরাচর দেখা যায় না, এটিও ব্যতিক্রমি নিঃসন্দেহে। জনাব চৌধুরী বলেছেন, ‘‘এখানের নেতৃস্থানীয়রা গ্রুপিং রাজনীতির নামে গড়ে তুলেছেন স্ব স্ব লীগ। নেতা-কর্মীরা ব্যক্তিলীগে সম্পৃক্ত হয়ে আলাদা আলাদা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছেন। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে একে অন্যের প্রতি কুৎসা রটনা করে বেড়াচ্ছেন। প্রতিনিয়ত চলছে পরষ্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছুঁড়াছুঁড়ি। দল বড় করতে নয় নিজেদের পাল্লা ভারী করতেই দলের নাম ব্যবহার করছেন এসব নেতারা। …. আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম চৌধুরীর সরকারি গাড়ি ভাংচুড় করা হয় গোবিন্দগঞ্জে। ওই সময় এমপি মুহিবুর রহমান মানিককে ঘোষণা করা হয় অবাঞ্ছিত। প্রশাসনিক চত্ত্বরে দু’গ্রুপের জনপ্রতিনিধিরা জড়িয়ে পড়েন মুষ্টিযুদ্ধে। জনপ্রতিনিধির উপর দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করা হয়। …এসব ভেবেই এখানের নোংরা রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই উপজেলা যুবলীগের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছি।’’ উদ্ধৃত বাক্যগুলো গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। জনাব চৌধুরী রাজনীতি সম্পর্কে নিজের যে অভিমত প্রকাশ করেছেন, কে না জানে এর চাইতে নির্জলা সত্য আর কিছু নেই। কিন্তু এসব কথা এখন কেউ বলেন না। বরং সবকিছু সয়ে নিয়ে যে যার মতো উদ্দেশ্য সিদ্ধি করে চলেছেন। বলাবাহুল্য জনাব চৌধুরী ছাতক উপজেলার প্রেক্ষাপটে নিজ কথা বললেও সারা জেলায় এমনকি সারা দেশে এই কথাগুলো কমবেশি প্রযোজ্য। এরকম ব্যতিক্রমী ঘোষণা দিয়ে দল থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি তাদেরকে উৎসাহিত করবে যারা রাজনীতি থেকে যাবতীয় নোংরামীর অবসান চান।
বলা যেতে পারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অন্তর্কোন্দলে আজ ক্ষত-বিক্ষত। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, জেলার এমন কোন ইউনিট (মূল দল সহ অঙ্গসংগঠন) নেই যেখানে একাধিক গ্রুপ উপগ্রুপের অস্তিত্ব নেই। এই গ্রুপিং এর কারণে পরষ্পর হানাহানি, রেষারেষি এবং প্রতিযোগিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে অহরহ। এর ফলে দলীয় ঐক্য বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দলগুলো ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছে। অন্যদিকে আদর্শ চর্চার দিক থেকে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী এই দলটি আজ সময় দেয়ার অবকাশ পাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৃণমূলের দ্বন্দ্ব নিরসনে নানাবিধ পদক্ষেপ নিলেও এগুলো তেমন করে সফলতা পাচ্ছে না। আমাদের প্রশ্ন হলো দেশের প্রধান এই দলটির ভিতর আজ কেন এত কোন্দল? এই কোন্দলের কারণে আজ যে দেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা হুমকির সন্মুখিন হতে চলেছে সেটি কি তাদের অজানা? আমরা জানি সাইফুর রহমান চৌধুরীর মত করে এত স্পষ্ট করে এর উত্তর আর কোথাও পাওয়া যাবে না। জনাব চৌধুরী ঘটনার বর্ণনা করেছেন কিন্তু এর কারণ বলেন নি। রাজনীতিবিশ্লেষকরা মনে করেন রাজনীতি যখন বাণিজ্যিক উপকরণে পরিণত হয় তখন দলের ভিতরে এমন সমস্যাগুলোর উদ্ভব ঘটে। দেশের অন্য প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ভিতরকার অতীত ও বর্তমানের কোন্দলও অনুরূপ কারণেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
তবে দেশের নাগরিক সমাজ সর্বাবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভিতর গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য দেখতে চান। হতাশাবোধ থেকে জনাব চৌধুরী যে কথাগুলো বলেছেন, সকলেই চান রাজনীতি এই ধরনের অপপ্রপঞ্চ থেকে মুক্তি পাক।

